শিশু হাসপাতাল
টিকিট কাটতেই কয়েক ঘণ্টা, আইসিইউ পেতে আরেক যুদ্ধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তখন গভীর রাত। অসুস্থ সন্তান কোলে নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার আগারগাঁওয়ের শিশু হাসপাতালে জুবায়ের রহমান। নিয়ম মেনে জরুরি বিভাগের টিকিট কেটে ভর্তি হতে পেরিয়ে গেছে তিন ঘণ্টা। এই পুরো সময় জ্বর-ঠান্ডা আর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুটি পেয়েছে কষ্ট। কারণ, ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত মেলেনি চিকিৎসা।
এই দৃশ্য শুধু একদিনের নয়; বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। অসুস্থ-রোগে ভোগা শিশুদের নিয়ে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের সামনে লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অভিভাবকদের।
শুধু লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটলেই যে সমস্যা মিটে গেল, বিষয়টি মোটেই ততটা সরল নয়। টিকিট কাটা অর্থ ভোগান্তির সবে শুরু। এরপর রোগ বা বিভাগ অনুযায়ী একেক জায়গায় পাঠানো হয় শিশুদের। সেখানেও বেশিরভাগ সময় থাকে দীর্ঘ লাইন। যত অসুস্থ শিশুই হোক না কেন, চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে লিখে দিলেও শয্যা খালি না হলে মেলে না তা-ও। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের টাকার বিনিময়ে কাজ করার বা সিট পাইয়ে দেওয়ার প্রবণতা, সে তো আছেই।
জুবায়ের রহমান বলছিলেন, ‘রাতে এসে দেখি, ইমার্জেন্সির সামনে বিশাল লাইন। টিকিট কাটতেই চলে যায় তিন ঘণ্টা। পরে বাড়তি টাকা দিয়ে ঢুকতে হয়েছে ভেতরে। দারোয়ান যাকে চেনে বা যিনি টাকা দিতে পারেন, তাকেই আগে ঢুকতে দেয়।’
বুধবার কথা হয় ঢাকার বাইরে থেকে আসা মর্জিনা বেগমের সঙ্গে।
তিনি জানালেন, ঠান্ডা-শ্বাসকষ্টে ভোগা নাতিকে নিয়ে সকালে এসেছেন। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন; পেয়েছেনও ব্যবস্থাপত্র। কিন্তু নাতির কী হয়েছে, সে সম্পর্কে তাকে কিছুই বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, করতে হবে ভর্তি।
কাউন্টারে গিয়ে মর্জিনা জানতে পেরেছেন, ৩ হাজার ৭৫০ টাকা প্রয়োজন হবে ভর্তি হতে।
আবার শুরুতে বলা হয়েছিল, দেড়টার পর গিয়ে করাতে হবে ভর্তি। তখন গেলে বলা হয় ২টার পর। ২টায় গিয়ে শুনতে হয়েছে, ভর্তি হবে না ৩টার আগে। কারণ সিট খালি নেই, খালি হলে তবেই করা যাবে ভর্তি।
অসুস্থ নাতিকে নিয়ে বিহ্বল হয়ে পড়েন মর্জিনা। সকাল থেকে সুযোগ পাননি কিছুই খাওয়ার।
তিনি বলছিলেন, ‘নাতির শারীরিক অবস্থা খারাপ। আবার ভর্তি করলে বাড়ি ফিরব কীভাবে, সেটাও ভেবে পাচ্ছি না।’
ভর্তির ক্ষেত্রে বা সিট পেতে যে অনিয়ম হয়, তার প্রমাণ মেলে কয়েকজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে আলাপে। অকপটেই তারা জানালেন অর্থের বিনিময়ে বা পরিচিত কারও মাধ্যমে সুবিধা পাওয়ার কথা।
টাঙ্গাইল থেকে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন শিহাব মিয়া (ছদ্মনাম)। তিনি জানালেন, মেয়ের শরীর বেশি খারাপ হওয়ায় তাকে ভর্তি করা হয়েছে আইসিইউতে। পরিচিত মানুষ থাকায় সহজেই পেয়েছেন সিট। কিন্তু যাদের পরিচিত কেউ নেই, তাদের জন্য সিট পাওয়া কষ্টের— জানালেন তিনি।
আইসিইউ পাওয়াও যে এক যুদ্ধ, তার প্রমাণও মিলল কিছুক্ষণের মধ্যে। সোমবার রাতে অসুস্থ মেয়ে সোফাইয়াকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করেছিলেন বাবা নাছির উদ্দীন আহমেদ। বুধবার সকাল থেকে অবনতি হতে শুরু করে শিশুটির শারীরিক অবস্থা। তার সঙ্গে যখন দেখা হয়, তখন তিনি কাউন্টারের সামনে অস্থির হয়ে করছিলেন দৌড়াদৌড়ি। আনসার সদস্যদের কাছে সিট খুঁজে দিতে করছিলেন অনুরোধ।
কী হয়েছে জানতে চাইলে বললেন, ‘আইসিইউ লাগবে ভাই, আইসিইউ লাগবে। ভর্তি করতে এত কষ্ট করলাম, এখন আবার কষ্ট হচ্ছে আইসিইউ নিয়েও। কেমনে যে পাব, জানি না!’
গোপালগঞ্জের রাশেদ খানও বলছিলেন অর্থের বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার কথা। তিনি বললেন, ‘ইমার্জেন্সিতে দাঁড়াতে হয় লাইনে। আবার দেখলাম, অনেকেই টাকা দিয়ে চলে যাচ্ছে ভেতরে। তখন মনে হয়, এখানের রোগীর চেয়ে টাকার মূল্য বেশি।’
এই হাসপাতালটিতে সবসময়ই রোগীর চাপ বেশি। কিন্তু দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে সেই চাপ বেড়েছে অনেক। হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, শুধু ছুটছেন সবাই। কেউ আইসিইউর সিটের জন্য, কেউ করাতে ভর্তি, কেউ বিলের হিসাব মেলাতে, আবার কেউ ছুটছেন টিকিটের লাইনে দাঁড়াতে।
জরুরি বিভাগের সামনে শিশু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল অসংখ্য অভিভাবককে। কারও শিশু কাঁদছে, কেউ কোল থেকে নেমে যেতে চাইছে, কোনো শিশু নির্জীব পড়ে আছে অভিভাবকের কাঁধে মাথা রেখে। জরুরি বিভাগের ভেতরেও ব্যস্ত চিকিৎসক ও নার্সরা। দুপুরের দিকে একজন চিকিৎসক ও চারজন নার্স সেখানে রোগীদের সেবা দিতে খাচ্ছিলেন হিমশিম।
জরুরি বিভাগে প্রতিদিন কতজন কর্মী কাজ করেন, কেন হাসপাতালটিতে এত অব্যবস্থাপনা, কেন এত সময় ব্যয় হয় রোগীদের— তা জানতে কথা বলতে চেষ্টা করি জনসংযোগ কর্মকর্তা বশির উদ্দিনের সঙ্গে। তবে তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। কথা বলতে রাজি হননি চিকিৎসকরাও।
ফলে হাসপাতাল নিয়ে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেল, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালের করিডোরের মেঝেতে শুয়েছিলেন মধ্যবয়সী জালাল উদ্দিন। সাংবাদিক শুনে উঠে এলেন। বললেন, ‘আমরা এমন অবস্থায় আছি, যেখানে যত টাকা লাগে তাই দিচ্ছি। কারণ সন্তানকে তো বাঁচাতে হবে! সন্তান অসুস্থ, এই দুর্বলতারই সুযোগ নিচ্ছে সবাই।’






