‘আগে ২০ টাকায় যেতাম আজকে চাইছে ২৫’ বাসে বাগ্বিতণ্ডা

ফাইল ছবি
শাহাবুদ্দীন। চাকরি করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তার অফিস মতিঝিলের মৎস্য ভবনে। টেকনিক্যাল থেকে যাতায়াত করেন তিনি। অফিসে বাসযোগে যাচ্ছিলেন আজও। প্রতিদিনের ন্যায় বাসের হেল্পারকে ২০ টাকা দেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হেল্পার চাইলেন ২৫ টাকা। এরপরই শুরু দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা। কিছুক্ষণ ধরে চলে তর্ক। একপর্যায়ে আর কথা না বাড়িয়ে পাঁচ টাকা হেল্পারের হাতে দিলেন তিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর টেকনিক্যাল থেকে মতিঝিলগামী ‘ওয়েলকাম’ বাসে এমন চিত্র দেখা যায়। শুধু শাহাবুদ্দীনের সঙ্গেই নয়, বাসের অধিকাংশ যাত্রীর সঙ্গেই ভাড়া নিয়ে চালক ও হেল্পারদের বাগ্বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায়। বাড়তি ভাড়া দাবি করাকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের সঙ্গে বারবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল।
শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের। বললেন, কোনো ধরনের বার্তা ছাড়াই হঠাৎ তেলের দাম বৃদ্ধি খুবই অনৈতিক কাজ। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে বাসমালিকরা। এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের মতো যাত্রীদের। আয় না বাড়লেও এখন দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাবে।
শুধু ওয়েলকাম বাসে নয়, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাস ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে হেল্পার ও কাউন্টারকর্মীদের কথা-কাটাকাটির চিত্র দেখা গেছে।
নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। অন্যদিকে বাসের হেল্পারদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, অথচ আগের ভাড়াই অনেকে দিতে চান না।
বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে অভিযোগ অস্বীকার করলেন গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে রাজধানীর মতিঝিল পর্যন্ত চলা লোকাল বাস ওয়েলকামের এক হেল্পার। ‘যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া চাচ্ছি না, বরং আগের ভাড়াটাই অনেক যাত্রীরা দিতে চাচ্ছেন না।’
তার দাবি, ‘সাভার থেকে গুলিস্তানের ভাড়া হয় ৭৫ টাকা কিন্তু আমি চাইছি ৭০ টাকা। সেই ৭০ টাকাও দিতে চান না। এর ওপর এখন আবার তেলের দামও বাড়তি।
‘যাত্রীরা শুধু আমগো লগেই চেইতা কথা কইতে পারে। সরকাররে কিছু কইতে পারে না, যে দাম এত বাড়ায় কেন?’—যোগ করেন এই হেল্পার।
তবে যাত্রীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাসের ভাড়া আগেই বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেক পরিবহনকর্মী।
ভাড়া নিয়ে তর্কের সময় আরেক যাত্রী বললেন, কোনো নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা ছাড়াই বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো চার্ট ছাড়াই ভাড়া বেশি চাচ্ছে। সরকার তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাসের ভাড়া বাড়ানোর একটা নির্দিষ্ট তালিকাও কইরা দিক। ৫ টাকা বাড়লে ১০ টাকা বেশি রাখে, এইটা সবার আগে বন্ধ করতে হবে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর আজ ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে দূরপাল্লা ও মহানগরের বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে দূরপাল্লার কয়েকটি বাসের ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে সরেজমিনে দেখা যায়, ভাড়া নিয়ে টিকিট কাউন্টারের কর্মীদের সঙ্গে যাত্রীদের প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হচ্ছে। বাড়তি ভাড়া শুনে অনেক যাত্রী কাউন্টার থেকে চলে গিয়ে অন্য বাসের খোঁজ করছেন। একটি কাউন্টারে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানে থাকা দুজন জানান, ভাড়া ৫০ টাকা বেড়েছে। তবে সব বাসের ভাড়া বাড়েনি বলেও জানান তারা।
বাসভাড়া বাড়বে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর মহানগর ও দূরপাল্লার উভয় ক্ষেত্রে বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি বিশ্বস্ত।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গতকাল বাস মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
বৈঠক থেকে মহানগর এলাকার বাসে ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে আজ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির হার কমিয়ে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।
ফলে বর্তমানে দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা ভাড়া থাকলে তা বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা ভাড়া রয়েছে। ১৭ পয়সা বাড়লে তা দাঁড়াবে ২ টাকা ৭০ পয়সা।
তবে নতুন ভাড়ার হার ও কোন কোন শ্রেণির বাসে তা কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হবে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি
চলতি বছরের এপ্রিলে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। পরে বিভিন্ন ধাপে দাম বাড়তে বাড়তে বর্তমানে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
পেট্রলের দামও কয়েক দফায় বেড়েছে। গত এপ্রিলে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা। জুনে তা বেড়ে হয় ১৪০। সেপ্টেম্বরে ঠেকে ১৬০ টাকায়।
একই সময়ে অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে এপ্রিলে ১৪০ টাকা, জুনে ১৪৫ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে হয় ১৬৫ টাকা।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ৮৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছিল। পরে কয়েক দফা কমার পর প্রায় দুই বছর পেট্রল ও অকটেনের দাম স্থিতিশীল ছিল যথাক্রমে ১১৬ ও ১২০ টাকায়।



