ঢাবির হল ক্যান্টিনে গ্যাসের বদলে লাকড়ি বাড়ছে খাবারের খরচ

দুপুরের খাবারের অপেক্ষায় ক্যান্টিনে বসে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও আসছে না খাবার। কোথাও আবার আগের মতো মিলছে না পছন্দের পদ, থাকছে না নাশতার আইটেমও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ক্যান্টিনে গ্যাস সংকটের কারণে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে লাকড়ি। ফলে খাবারের মান, পদসংখ্যা ও পরিবেশনের সময়— সবকিছুর ওপর পড়েছে গ্যাস সংকটের প্রভাব। বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ার আশঙ্কা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ক্যান্টিন ও ডাইনিং ঘুরে এবং ক্যান্টিন পরিচালক, শিক্ষার্থী ও ডাকসু নেতাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক ক্যান্টিনে রান্না করা যাচ্ছে না স্বাভাবিকভাবে।
প্রতিদিন দুই-তিন মণ লাকড়ি: বিজয় একাত্তর ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক তৌহিদ জানালেন, প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন রান্না করতে লাগছে দুই থেকে তিন মণ লাকড়ি। এতে মাসে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা।
তৌহিদ বলছিলেন, ‘মাসে অতিরিক্ত যে টাকা লাকড়ি কিনতে ব্যয় হচ্ছে, তা খাবারের মান উন্নয়নে ব্যয় করা গেলে খাবারের মান আরও ভালো করা সম্ভব হতো। লাকড়িতে রান্নার কারণে খাবার পরিবেশনেও দেরি হচ্ছে। গ্যাস দিয়ে যে ভাত আধা ঘণ্টায় রান্না করা যেত, লাকড়ি দিয়ে এখন তিন থেকে চার ঘণ্টা লাগছে।’
একাধিক ক্যান্টিন পরিচালকের আশঙ্কা, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে আরও বাড়বে পরিচালন ব্যয়। বর্তমানে লাকড়ি কিনতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বহন করা তাদের জন্য কঠিন। ফলে খাবারের দাম সমন্বয় করতে হতে পারে। অন্যথায় ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও দাবি তাদের।
বাড়তি খরচের চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর: ক্যান্টিন পরিচালকদের বাড়তি জ্বালানি খরচের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরাও। তাদের অভিযোগ, লাকড়িতে রান্নার কারণে খাবারের মান নেই আগের মতো। রান্নায় বেশি সময় লাগায় নির্ধারিত সময়েও পাওয়া যাচ্ছে না খাবার।
গ্যাসের অপ্রতুলতায় ক্যান্টিনগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে লাকড়ি কিনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ ক্যান্টিন মালিকরা নিজেদের পকেট থেকে দেবেন না উল্লেখ করে জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেনের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত খাবারের দাম বাড়িয়ে এর চাপ পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপরই।
এই হলের ভিপি মাহবুব তালুকদারের মতে, জ্বালানি সংকটের পুরো চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর না দিয়ে সংকটকালীন ক্যান্টিনগুলোকে সাময়িক জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়া উচিত প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এভাবে চললে ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারবেন না তারা।
ভর্তুকির দাবি ডাকসুর: গ্যাস সংকটের কারণে ক্যান্টিনগুলোর বাড়তি ব্যয় নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। জিএস এসএম ফরহাদ বলছিলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে ক্যান্টিনগুলোতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। আমরা প্রশাসনকে বলেছি, এই সংকটের সময়ে ক্যান্টিনগুলোকে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো একটি মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবে জানিয়েছে। তার ভাষ্য, উপাচার্য ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি সমাধানে চেষ্টা করছেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
‘এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে আমাদের ভিন্ন কোনো কর্মসূচিতে যেতে হতে পারে। এই সংকটময় পরিস্থিতি আমরা আর চলতে দিতে পারি না’— যোগ করলেন তিনি।
তিতাসকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী কাজী আকরাম হোসেন জানালেন, সংকটের বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষকে। এর আগেও একাধিকবার বিষয়টি জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানালেন, এটি জাতীয় সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই সমস্যা সমাধানের মতো তেমন কিছু নেই। এর সমাধান জাতীয় পর্যায়েই করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানালেন, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে হলগুলোর ক্যান্টিনে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যোগাযোগ করা হয়েছে প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে। সংকট আরও বাড়লে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটও: গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ও অ্যাকাডেমিক ভবনে বেড়েছে বিদ্যুৎবিভ্রাট। তীব্র গরমের মধ্যে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
আবাসিক হলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হলভেদে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে না বিদ্যুৎ। নিয়মিত বিদ্যুৎবিভ্রাটের কথা জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, স্যার এ এফ রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থীরা।
শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. মাসুদুজ্জামান স্মৃতিচারণ করে জানালেন, গত পাঁচ বছরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন লোডশেডিং দেখিনি। আগে বিদ্যুৎ গেলে বুঝতাম কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছে। এখন প্রতিদিন কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রিডিং রুমে বসে পড়া যায় না, রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে।
একই বাস্তবতা তুলে ধরলেন শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী তাসফিয়া সুলতানা। ‘আমি প্রায় তিন বছর ধরে হলে আছি। এই সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া পাঁচ মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে।’
বিদ্যুৎবিভ্রাটের প্রভাব সীমাবদ্ধ নেই শুধু আবাসিক হলেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অ্যাকাডেমিক ভবনেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ক্লাস চলাকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ও স্মার্ট ক্লাসের বিভিন্ন উপকরণ। তীব্র গরমে ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীদের।
সমাধানের আশ্বাস প্রশাসনের: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যুৎ ফেজের আওতায় থাকায় সব এলাকায় একই ধরনের লোডশেডিং হচ্ছে না।
লোডশেডিংয়ের বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রো-ভিসি বলছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও চলমান পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যতটা সম্ভব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’



