কাঁটাবনে আগুন
‘ভাই যেভাবে পারেন আমাদের বাঁচান’ জনি-সালামের শেষ আর্তনাদ

এই কক্ষেই থাকতেন জনি ও সালাম- আগামীর সময়
‘ভাই, আমাদের যেভাবে পারেন বাঁচান। বাসায় আগুন লাগছে।’ পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নাজমুলকে ফোনকলে শেষবার এভাবে আকুতি জানিয়েছিলেন জনি ও সালাম। শুক্রবার রাত পৌনে ১টায় রাজধানীর কাঁটাবনের আল বারাকা টাওয়ারের ১৩ ও ১৪ তলায় আগুন লাগে। এই আগুনেই প্রাণ হারিয়েছেন মো. জনি (২৪) ও আবদুস সালাম (২০)।
নাজমুলের মামা মো. নবীর হোসেন গত ২৪ বছর ধরে ওই ভবনে বাস করছেন। আগুন লাগার মাত্র ৩০ মিনিট আগেও তিনি, তার ভাগ্নে নাজমুল এবং নিহত জনি ও আবদুস সালাম একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছেন। গল্প করেছেন। এরপর জনি ও সালাম মোবাইলে বিশ্বকাপ খেলা দেখার কথা বলে নিজেদের ফ্ল্যাটে দরজা আটকে শুয়ে পড়েন।
নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নবীর হোসেন। এর কিছুক্ষণ পরই ভাগ্নে নাজমুল চিৎকার করতে করতে তাকে এসে ডেকে তোলেন। নাজমুল জানান, ওপাশ থেকে জনি ও সালাম ফোন করে বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছে।
জনি ও সালাম দুজনেই ওই ভবনে অবস্থিত আইনজীবীদের চেম্বারের কর্মচারী ছিলেন। আইনজীবী সরোয়ার জানান, সালাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমানের এবং জনি ব্যারিস্টার মোয়াজের ক্লার্ক ছিলেন।
দরজা ভেঙেও শেষ রক্ষা হয়নি
‘দরজা খুলে বের হয়ে দেখি পুরো ফ্ল্যাটে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। আমি আর ভাগ্নে দুজন মিলে ওদের ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙেছি। দরজা ভাঙতেই আগুনের ফুলকি বের হয়ে এলো। পানি এনে ঢালছিলাম। কিন্তু আগুন কমছিল না। ধোঁয়ায় কিছু দেখতেও পারছিলাম না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপরও তাদের উদ্ধার করতে আগুনের মাঝে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পরিবার আমাকে টেনে সরিয়ে নেয়, আগামীর সময়কে বলছিলেন নবীর হোসেন।
আর্তনাদ করে তিনি আরও বললেন, ‘তাদের বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারলাম না। ফায়ার সার্ভিস যদি আর একটু আগে আসত, তাহলে হয়তো তাদের বাঁচানো যেত।’
অসুস্থ বোনকে নিয়ে ১৪ তলা থেকে নামেন আসিফ
ভবনটির ১৪ তলায় নিজের অসুস্থ বোনের বাসায় ছিলেন মো. আসিফ। তিনি জানালেন, হঠাৎ প্রচুর ধোঁয়া দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন রান্নাঘরে আগুন লেগেছে। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে দেখেন নিচের তলা (১৩ তলা) থেকে আগুন ওপরের দিকে উঠছে।
‘সম্প্রতি আমার বোনের টিউমার অপারেশন হয়। ওই অবস্থাতেই তাড়াহুড়ো করে, তাকে ধরাধরি করে ভবন থেকে বের করি। নিচে নেমেই ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে জানাই,’ আগামীর সময়কে বলছিলেন আসিফ।
আসিফের অভিযোগ, আনুমানিক রাত পৌনে ১টার দিকে আগুন লাগলেও ফায়ার সার্ভিস আসতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় নেয়। প্রথমে মাত্র একটি ইউনিট আসে। এ ছাড়া এত ওপরে পানির পাইপ তুলতেও তাদের বেগ পেতে হচ্ছিল। পানি দেওয়ার সময় দেখা গেছে ফায়ার সার্ভিসের পাইপটিও ফাটা। পানি বের হয়ে যাচ্ছিল।
প্রাণ বাঁচাতে বাথরুমে আশ্রয় নেন জনি ও সালাম
ভবনটির গার্ড মো. শরীফ জানান, আগুন থেকে বাঁচতে জনি ও সালাম বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হয়ে ভেতরেই তারা মারা যান। ফায়ার সার্ভিস যখন তাদের উদ্ধার করে, শরীফ তখন সঙ্গে ছিলেন। তিনি দাবি করেন, দুজনের শরীরে আগুনের কোনো ক্ষত ছিল না। মূলত ধোঁয়ার কারণেই দম আটকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
১৪ তলার বাসিন্দা জারিনের ভাষ্য, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন লাগার খবর জানতেনই না। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ফোন করে জানানোর পর তারা হুড়মুড় করে সবাইকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন। একই তলার বাসিন্দা মো. মহীউদ্দীন। তিনি জানান, চিৎকার শুনে দরজা খুলেই দেখেন চারদিকে শুধু ধোঁয়া। কোনো রকমে নিজেকে বাঁচাতে নিচে নেমে আসেন তিনি।
জানা যায়নি আগুনের সূত্রপাত
আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন ভবনটির বাসিন্দারা। মহীউদ্দীনের মতে, আগুনের উৎপত্তি নিচের তলার গ্যাসের চুলা থেকে হতে পারে। তবে আগুন লাগা ফ্ল্যাটের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সেখানে গ্যাসের লাইন দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। তাই জনি ও সালাম বাইরে থেকে খাবার এনে খেতেন। তাদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এই আগুন লাগতে পারে। কক্ষগুলোতে কাঠের ইন্টেরিয়র থাকায় দ্রুত ও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে আগুন।
এদিকে, কীভাবে আগুনের সূত্রপাত— এখনো জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক।
‘আমি থাকলে হয়তো আমিও মারা যেতাম’
নিহত দুজনের সঙ্গে একই চেম্বারে কাজ করতেন মো. রাজু। সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্র ও শনিবার) থাকায় ঘটনার রাতে তিনি সেখানে ছিলেন না। সকালে আগুনের খবর শুনে ফ্ল্যাটে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে রাজু বললেন, ‘আজ ভবনে থাকলে হয়তো আমিও মারা যেতাম। আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। গত বৃহস্পতিবারও কথা বলে গেলাম। তাদের আমি কীভাবে ভুলব!’
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ১৪ তলা আবাসিক ভবনটির ১৩ ও ১৪ তলার দুটি ফ্ল্যাটে এই অগ্নিকাণ্ড। রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে আগুন লাগার খবর পান তারা। পরে ৬টি ইউনিটের প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৩টা ৮ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে দুই যুবকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক। তিনি জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেকের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকেও জানানো হয়েছে।











