বাস রুট রেশনালাইজেশন
পুরনো ব্যর্থতার বৃত্তে নতুন জোড়াতালির শুরু
- পাঁচ বছর পর ১ নভেম্বর থেকে আবার নতুন পরীক্ষা
- সড়কশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

সংগৃহীত ছবি
বাসের নাম বদলাবে, বদলাবে কোম্পানির পরিচয়। কিন্তু বাসগুলো থাকবে সেই পুরনোই। ভাড়া আদায়ে ই-টিকেটিংয়ের বদলে চলতে থাকবে প্রচলিত অবৈধ ওয়েবিল। চালকদের বেতনভিত্তিক নিয়োগ ও মালিকদের লভ্যাংশ বণ্টনের ব্যবস্থাও হচ্ছে না কার্যকর। অথচ এসব পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছিল বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ। পাঁচ বছর আগে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ পরীক্ষামূলক চলাচল ব্যর্থ হওয়ার পর এবার নতুন নামে আসছে ‘সিটি পরিবহন’। কিন্তু আগের উদ্যোগের ব্যর্থতার কারণগুলো দূর না করেই শুরু হচ্ছে জোড়াতালির নতুন পরীক্ষা।
ছয়টি রুটে আগামী ১ নভেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চলবে ৮১৬টি বাস। পুরনো এই বাসগুলোকে কয়েকটি কোম্পানির অধীনে এনে দেওয়া হচ্ছে নতুন নাম। যেমন– মিরপুর থেকে কেরানীগঞ্জ রুটের দিশারী, তানজিল ও মেট্রোলিংক পরিবহনের বাস এক হয়ে চলবে ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ নামে। অর্থাৎ কোম্পানির পরিচয় বদলালেও বাসের মান, ভাড়া আদায়ের পদ্ধতি ও শ্রমিকদের কর্মপরিবেশে আসছে না পরিবর্তন।
ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এই উদ্যোগের শুরু। পরিকল্পনা ছিল, ব্যক্তিমালিকানায় বিচ্ছিন্নভাবে বাস চালানোর পরিবর্তে কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর। নির্দিষ্ট রুটে চলবে নির্দিষ্ট বাস। যাত্রীরা নির্ধারিত স্টপেজে উঠবেন ও নামবেন। ভাড়া নেওয়া হবে ই-টিকেটিংয়ের মাধ্যমে। চালকরা পাবেন নির্দিষ্ট বেতন। মালিকরা বিনিয়োগের বিপরীতে পাবেন লভ্যাংশ। এতে কমবে বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা। বন্ধ হবে যত্রতত্র বাস থামানোর প্রবণতা। উন্নত হবে যাত্রীসেবা।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, বিদ্যমান সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখে উদ্যোগটি এবারও সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ই-টিকেটিং চালু না হলে ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকবে। যাত্রীর ভাড়া আদায় যদি শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কোনো কিছুই সফল করা সম্ভব নয়। রেশনালাইজেশনের মূল ভাবনার অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পুরনো, ভাঙাচোরা বাস চলার সুযোগ থাকলে লাভ কী?
যদিও আশাবাদী ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম। তার ভাষ্য, ‘এবার সফল না হওয়ার কোনো কারণ নেই। আগে মালিকদের লোকসান হয়েছে, এবার হবে না। প্রাথমিক লক্ষ্য বাসগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। বাকিটা সময়ের সঙ্গে ঠিক হবে। আপাতত ওয়েবিলে ভাড়া আদায় করা হবে। দুই মাস পর ই-টিকেটিং চালু হলে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে মালিকরা লভ্যাংশ পাবেন।’
পাঁচ বছরেও বদল আসেনি মূল সমস্যায়
২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ‘ঢাকা নগর পরিবহন’। পরিকল্পনা ছিল ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর রুটে ১৫৫টি বাস চালানোর। কিন্তু উপযুক্ত বাসের অভাবে শেষ পর্যন্ত ট্রান্সসিলভা পরিবহনের ২০টি এবং বিআরটিসির ৩০টি দোতলা বাস দিয়ে যাত্রা শুরু হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই রুটে নগর পরিবহনের বাইরে অন্য কোম্পানির বাস চলার কথা ছিল না। বাস্তবে তা কার্যকর করা যায়নি। একই পথে অন্য কোম্পানির বাস চলতে থাকে। ফলে নতুন বাস যুক্ত হলেও পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়নি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যাত্রীছাউনি ও বাস ডিপো নিয়েও জটিলতা ছিল। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের এই ব্যবধান শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটিকে দুর্বল করে দেয়। লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে যায় নগর পরিবহন।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নতুন উদ্যোগে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে? ছয়টি রুটে বাস চলবে, কিন্তু সেগুলো পুরনো। ই-টিকেটিং শুরুতেই থাকছে না। অর্থাৎ আগের উদ্যোগের প্রধান সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়াই নতুন নামে শুরু হচ্ছে কার্যক্রম। এখানেই নতুন উদ্যোগ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্দেশ্য ছিল পুরো পরিচালনব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান পরিবর্তন মূলত কয়েকটি কোম্পানির বাসকে একক নামে পরিচালনা। এতে প্রশাসনিক পরিচয় বদলাবে। কিন্তু বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা, ভাড়া আদায়ের পদ্ধতি ও যাত্রীসেবার মান না বদলালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
৪১৮ রুটের শহরে সক্রিয় মাত্র ৯৮
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমোদিত রুট ৪১৮টি। এর মধ্যে সক্রিয় মাত্র ৯৮টি। এসব রুটে প্রতিদিন আনুমানিক সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার বাস চলে। যাতায়াত করেন প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ যাত্রী।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের মতে, শুধু বাসের কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে এই পরিস্থিতি বদলানো যাবে না। কোন বাস কোন রুটে চলবে, যানবাহনের মান ও ফিটনেস কীভাবে নিশ্চিত হবে— এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। চালকদের নির্দিষ্ট বেতন, কর্মঘণ্টা ও নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। তা না হলে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা বন্ধ করা কঠিন হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাসগুলো চলবে নির্দিষ্ট রঙ ও পরিচয়ে। নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া ওঠানামা করাতে পারবেন না যাত্রী। মালিকরা বিনিয়োগের বিপরীতে লভ্যাংশ পাবেন। চালকরা কাজ করবেন নির্দিষ্ট বেতনে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হলে কোম্পানির নাম এক করেও বাস পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনা যাবে না।
৬ রুটে যেভাবে চলবে সিটি পরিবহন
ডিটিসিএর দেওয়া রুটভিত্তিক বিবরণী অনুযায়ী, পাঁচটি রুটে সাধারণ বাস এবং একটি রুটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস চলার কথা বলা হয়েছে। রুটগুলো হলো— গাজীপুর-মতিঝিল-নিউ মার্কেট রুট: গাজীপুর, চৌরাস্তা ও টঙ্গী এলাকা থেকে শুরু হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পেরিয়ে নিউ মার্কেট এলাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২৬ দশমিক ৪৭ কিলোমিটারের এই পথে বাস চলবে ২৫৩টি। ভিআইপি ও বিকাশ মিলিয়ে নাম হবে ভিআইপি পরিবহন। মিরপুর-কেরানীগঞ্জ রুট: মিরপুর, দিয়াবাড়ি, কাজীপাড়া, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদগেট, সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান, সদরঘাট ও বাবুবাজার সেতু হয়ে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত রুটটি। এ পথে বর্তমানে দিশারী, তানজিল ও মেট্রোলিংক পরিবহনের বাস চলে। নতুন ব্যবস্থায় এসব বাস একত্র হয়ে ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ নামে চলবে। ১৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার এই পথে বাস চলবে ১৩৩টি।
ঘাটারচর-মোহাম্মদপুর-বাসাবো রুট: ঘাটারচর থেকে বসিলা ও মোহাম্মদপুর হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে বাসাবো ও আশপাশের এলাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ডেমড়া পর্যন্ত ২৪ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার এই পথে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ নামে চলবে ৭০টি বাস। ঘাটারচর-কাঁচপুর রুট: ঘাটারচর, বসিলা, মোহাম্মদপুর, সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী ও মাতুয়াইল হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত ২৫ দশমিক শূন্য ৫ কিলোমিটার বিস্তৃত এই রুট। রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময় ও মিডলাইন পরিবহন মিলিয়ে ফোর স্টার বাস লাইন নামে চলবে ১৫০টি বাস।
আর ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, শ্যামলী, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১ ও মিরপুর-১০ হয়ে পল্লবী, কালশী ও ইসিবি চত্বর পেরিয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত সংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০ কিলোমিটার এই পথে পিএনপি সিটি সার্ভিস নামে ১৯০টি বাস চলবে। টঙ্গী থেকে কলেজগেট, আবদুল্লাহপুর, এয়ারপোর্ট, এয়ারপোর্টসংলগ্ন এলাকা, খিলক্ষেত, বসুন্ধরা ও আশপাশের এলাকা হয়ে ঢাকেশ্বরী পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার পথে চলবে ঢাকা চাকা নামে ২০টি বাস।
পুরনো বাসে নতুন সেবা কতটা
বিদ্যমান বাস একত্র করে চালানোর ফলে বাসের বয়স, ফিটনেস ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অবশ্য পুরনো হলেই সব বাস অনুপযোগী— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। তবে বাসের ফিটনেস, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের মান যাচাই জরুরি। কোন বাস নতুন ব্যবস্থায় চলতে পারবে, তার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। অনুপযোগী বাস বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে কোম্পানির নাম বদলে যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করা যাবে না।
রুট রেশনালাইজেশনের লক্ষ্য ছিল শুধু বাসের রঙ বা নাম এক করা নয়। লক্ষ্য ছিল সড়ক থেকে অনুপযোগী যানবাহন সরানো, যাত্রী ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন না এলে যাত্রীরা নতুন নামের বাসে উঠেও পুরনো ভোগান্তির মুখে পড়বেন।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান জানালেন, বেশি পুরনো, মেয়াদোত্তীর্ণ বাস চলার অনুমতি দেওয়া হবে না। কার্যক্রমের প্রথম দিন থেকেই এগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনায় চালকদের নির্দিষ্ট বেতনে নিয়োগ এবং মালিকদের ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা ছিল। এতে চালকদের আয় যাত্রী তোলার ওপর নির্ভর করবে না। ফলে বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে। মালিকরাও কোম্পানির আয় অনুযায়ী লভ্যাংশ পাবেন। কিন্তু নতুন উদ্যোগে শুরু থেকেই কার্যকর হচ্ছে না এই ব্যবস্থা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান আগামীর সময়কে বলছিলেন, পাঁচ বছর আগের উদ্যোগের অভিজ্ঞতা বলছে, বাস নামানোই সাফল্য নয়। সাফল্য হলো, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে কি না— যাত্রীসেবা উন্নত হয়েছে কি না এবং পুরনো সমস্যাগুলো দূর হয়েছে কি না। সেই পরিবর্তন নিশ্চিত না হলে ‘সিটি পরিবহন’ও পুরনো ব্যর্থতার বৃত্তে নতুন জোড়াতালি হয়েই থাকবে।



