উচ্ছেদের পর কার্ডে দখল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জনগণের ভোগান্তি, দীর্ঘ যানজট, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও রাতে চুরি-ছিনতাইকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ফুটপাতে উচ্ছেদের অভিযান শুরু করেছিল। অভিযানে ফুটপাতের দোকানপাট কিছুদিনের জন্য বন্ধও হয়। পরে সরকারের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনের আওতায় চালু হয় ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’। এখন নীতিমালাভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন করে ‘হকার কার্ড’র মাধ্যমে ফুটপাত বৈধভাবে দখল করে ব্যবসা শুরু করেছেন হকাররা। ফলে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে সুফলের চেয়ে ফের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্ছেদ অভিযানের পর হকার কার্ডের মাধ্যমে ফুটপাত বৈধভাবে দখলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে উচ্ছেদ অভিযান, হকার কার্ড ও নীতিমালা করে কোনো সমাধান আসবে না। আর ডিএমপি বলছে, পুলিশের একার পক্ষে ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব নয়, সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে ঢাকার হকারদের একাংশকে বসতে বায়তুল মোকাররম মসজিদ-লাগোয়া যে এরশাদ রোডকে নির্বাচিত করেছিল সিটি করপোরেশন, সেখানে এখন বাস পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। জায়গাটির বিভিন্ন অংশে ছিন্নমূল মানুষের বসবাস, কোথাও জমেছে ময়লার স্তূপ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বায়তুল মোকাররম ঘিরে ফুটপাত জুড়ে আবারও জমজমাট হকারদের বেচাকেনা। অস্থায়ী ছাউনি টানিয়ে পুরো ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। এ কারণে পথচারীদের চলাচলের জায়গা সরু হয়ে এসেছে। একই চিত্র দেখা গেছে আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে (সাবেক বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন এলাকায়। হকারদের জন্য স্থান চিহ্নিত থাকলেও বাস্তবে সেই সীমারেখা মানার কোনো চিহ্ন নেই। যে যার সুবিধামতো জায়গা দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এমন চিত্র শুধু বায়তুল মোকাররম বা গুলিস্তানে নয়, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট কিংবা মিরপুরসহ যেকোনো প্রধান সড়কের ফুটপাতের চিত্র এখন একই। ফুটপাত জুড়ে চৌকি, ফুটপাত লাগোয়া সড়কে ভ্যান আর প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে বসানো হচ্ছে শত শত দোকান। হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের কোনো মিল নেই।
উচ্ছেদের পর আবার ফুটপাতে একই চিত্র, তাহলে এই উচ্ছেদের সুফল কোথায়— এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে তারা (হকার) বসতে না পারেন। প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে ফুটপাত উচ্ছেদের অংশ হিসেবে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কাজ করছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে সবকিছু সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
উচ্ছেদ অভিযানকে লোকদেখানো বলে মন্তব্য করে গুলিস্তানে চৌকি বসিয়ে কাপড়ের ব্যবসা করা আবদুর রশিদ বলেছেন, ‘পুলিশের অভিযানে দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এখন আমাদের কাছে কার্ড আছে, নিরিবিলি ব্যবসা করছি।’
আবার হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ যে আশা জাগিয়েছিল, তা নিয়ে এখন হতাশা ব্যক্ত করছেন পথচারীরা। গুলিস্তান এলাকায় আবদুল্লাহ আল মামুন নামের এক পথচারী বললেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে হচ্ছে, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং যানজটও তীব্র হচ্ছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেছেন, পথচারীর অধিকার পথচারীকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। ঢাকার মতো শহরে ফুটপাত দখল করে হকার বসানো বা রাস্তার অংশ ব্যবহার করতে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। একজনকে বসতে দিলে আরও ১০ জন এসে বসবে। তাই পরিকল্পনা করে হকার মুক্ত শহর তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের মতে, রাজধানীতে প্রায়
পাঁচ লাখ হকার রয়েছেন। হকার নেতারা বলছেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকারদের উচ্ছেদ ও গ্রেপ্তার করা অন্যায়। উচ্ছেদ অভিযানের আড়ালে নতুন করে চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।




