র্যাব থেকে এসআরবি : টিআইবির চোখে শুধু ‘খোলস বদল’

র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশে এসআরবি নামে যে ইউনিট গড়ে তুলতে যাচ্ছে সরকার, তাতে মানবাধিকার নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তার অবসান ঘটবে না বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি বলছে, জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি না করলে র্যাবের বদলে এসআরবি গঠন কেবলই পুরনো প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলানোর শামিলই হবে।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনা ছিল বহুদিন ধরে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায়ও পড়তে হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় এসে র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তা গঠনে সংসদে বিল উত্থাপনের তিন দিন পর আজ রবিবার এক বিবৃতিতে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে টিআইবি। তাতে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা না দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এসআরবি নিয়েও টিআবির উদ্বেগের কারণগুলো হচ্ছে- ‘এসআরবি’কে ব্যাপক ও অস্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, অস্ত্র ও বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষার উপস্থিতি নেই, সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের সুযোগ থাকছে, স্বার্থের দ্বন্দ্বযুক্ত অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও থাকছে, র্যাবের জনবলকে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের ঝুঁকি রয়েছে, প্রেষণে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগও বহাল থাকছে।
২০০৩ সালে চারদলীয় জোট সরকার আমলে র্যাব গঠিত হয়েছিল। এরপরই ‘ক্রসফায়ার’ নামে শব্দটি পরিচিত হয়ে ওঠে। এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা টিআইবিও জানাচ্ছিল।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বহু প্রতীক্ষিত এবং এটিকে আমরা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না।’
র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের যে গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা, বলপ্রয়োগের বিধান এবং জবাবদিহির ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেন তিনি।
‘অন্যথায় র্যাবের বদলে এসআরবি নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির একটি বাহিনী গড়ে উঠলে তা হবে কেবলই পুরনো প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলানোর শামিল,’ সতর্ক করেন ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি আরও বলেন, এমন একটি ‘কসমেটিক মেকওভার’-এর মাধ্যমে দেশের নাগরিক বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করা যাবে না।
উত্থাপিত এসআরবি বিলে একাধিক ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তার মধ্যে রয়েছে- পুলিশে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে নিয়োগ বন্ধ, র্যাবের জনবলকে ঢালাওভাবে এসআরবিতে স্থানান্তরের বিধান না রাখা, অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন বা গুমের মতো অপরাধে জড়িত কারও নতুন বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ না রাখা।
প্রস্তাবিত বিলে এসআরবিকে গোয়েন্দা নজরদারি থেকে শুরু করে অভিযান, তল্লাশি ও সাধারণ তদন্তের মতো যে বহুমুখী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা আগের মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দমনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে টিআইবির আশঙ্কা।
‘কেবল সন্দেহের বশে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং বাহিনীর নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন,’ যোগ করেন ইফতেখারুজ্জামান।
এসআরবির কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে এই ইউনিটকে দিয়ে তার তদন্তের প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করছে টিআইবি।
সংস্থাটি বলছে, র্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু নতুন বাহিনীর ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমারেখা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদারকি, স্বচ্ছ সদস্য যাচাই প্রক্রিয়া, বিচারিক সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে র্যাব বিলুপ্তির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
সংসদে উত্থাপিত বিল নিজেদের আপত্তির বিষয়গুলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।







