র্যাট থেকে র্যাব হয়ে এবার এসআরবি

ফাইল ছবি
দুই দশকের বেশি সময় আগে গঠনের পর থেকে আলোচিত-সমালোচিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), এখন তা বিলুপ্ত করে নতুন একটি ইউনিট গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। পুলিশের এই বিশেষায়িত ইউটিনটি নতুন নাম পাচ্ছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে র্যাব অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে এসআরবির যাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়; অনুমোদন হয় ‘এসআরবি আইন, ২০২৬’-এর খসড়া।
র্যাব গঠনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, পুলিশের এ ইউনিটের যাত্রা শুরুর সময় নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ)। কিন্তু ভারতে এই নামে বাহিনী থাকায় সেই নাম আর হয়নি। এরপর র্যাপিড অ্যাকশন টিম (র্যাট) নামে যাত্রা শুরু করেছিল এই ইউনিট। সে নামও টেকেনি, পরে নামকরণ হয় র্যাব।
২০২১ সালে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর সন্ত্রাস দমনে সেনাবাহিনী দিয়ে অপারেশন ক্লিট হার্ট পরিচালনা করার পর এই অভিযান অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে চিতা, কোবরা ইত্যাদি নামে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট বানিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। তখনই বিশেষায়িত নতুন একটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা হয়।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বর্তমান আজকের পত্রিকার সম্পাদক কামরুল হাসান তখন বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘বিএনপি জোট সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশে অনেকগুলো পেশাদার সন্ত্রাসী বাহিনী ছিল এবং তাদের কর্মকাণ্ড ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খুব অবনতি হয়েছিল। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ অঞ্চলে বামপন্থীদের কর্মকাণ্ড ছিল, আবার জেএমবিও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ঢাকায় তখন অনেকগুলো ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যেখানে সেখানে গোলাগুলি হতো। পেশাদার অপরাধীদের হাতে বিদেশি অস্ত্র দেখা যেত।’
এই প্রেক্ষাপটে বড় বড় অভিযান পরিচালনা করার জন্য ২০০৩ সালে পুলিশের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় র্যাপিড অ্যাকশন টিম বা র্যাট। এর প্রধান ছিলেন একজন উপ-পুলিশ কমিশনার। তখনকার অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকত হোসেনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই বাহিনী আলোচনায় উঠে আসে।
কিন্তু ‘র্যাট' এর বাংলা অর্থ ইঁদুর হওয়ায় এ নিয়ে খানিকটা আলোচনা শুরু হয়। আবার তখনকার পুলিশের অন্যান্য বাহিনীর তুলনায় তারা খুব আলাদা ভূমিকাও রাখতে পারছিল না বলেই নতুন ইউনিট গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
বিবিসি বাংলার সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সরকার ভাবতে শুরু করল, র্যাট দিয়ে হচ্ছে না, বড় একটা বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে, যারা দেশ জুড়ে শুধু বড় বড় অভিযান চালাবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থেকে এই বাহিনী অনেকটা এফবিআইয়ের আদলে কাজ করবে, তখন ব্যাটালিয়ন গড়ার কথা ভাবা হয়নি।
কামরুল হাসানের ভাষ্যে, ‘র্যাট ছিল র্যাবের টেস্ট কেস বলা যায়। কিন্তু র্যাটের নাম নিয়ে অনেক ধরনের কথাবার্তা শুরু হলে তখন এটাকে বড় বাহিনী করে, সব বাহিনী মিলে পেশাদার অপরাধী দমনে একটি বিশেষ বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা করা হলো। প্রথমে ব্যাটালিয়নের কথা ভাবা হয়নি, তখন চিন্তা করা হয়েছিল অনেকটা এফবিআইয়ের আদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় এই বাহিনী থাকবে। তারা সারা দেশে বড় বড় অপারেশন করবে, এই চিন্তা থেকে র্যাব গঠনের পরিকল্পনা করা হলো।’
র্যাটে শুধু পুলিশই ছিল, কিন্তু নতুন বাহিনী সাজানোর সময় ভাবা হলো, যেহেতু বিশেষায়িত বাহিনী হবে এবং বড় বড় অভিযান চালাবে, তাই এই বাহিনীতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে লেখা হয়, প্রথমে এই বাহিনীকে আলাদা বা স্বতন্ত্র একটি বাহিনী হিসাবে গঠন করার কথা ভাবা হলেও পরবর্তীকালে পুলিশের আপত্তির মুখে সেটাকে পুলিশের একটি বিশেষ বাহিনী হিসাবে গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়।
সেজন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন অ্যাক্ট আইন খানিকটা সংশোধন করে এই বাহিনীকে গ্রেপ্তার ও তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়। ফলে বাহিনীটি থাকবে পুলিশ মহাপরিদর্শকের আওতায়।
এরপর ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব গঠন করা হয়। বাহিনীটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে সেই বছরের জুন মাসে।
র্যাবে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, তখনকার বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি), কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার থেকে সদস্য নিয়োগ দেয়া হতো। বাহিনীর মহাপরিচালক পুলিশ থেকে আসেন, তবে অতিরিক্ত মহাপরিচালকরা সবসময়ে এসেছেন সেনাবাহিনী থেকে।
র্যাবের প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন আনোয়ারুল ইকবাল। তিনি পরে পুলিম মহাপরিদর্শক হয়েছিলেন। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বিবিসি বাংলাকে তখন বলেছিলেন, ‘র্যাব আসলে একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল। গতানুগতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ যেভাবে কাজ করে, পুলিশের যেভাবে গঠন, এটা ঠিক সেরকম গঠন ছিল না।
‘বিভিন্ন বাহিনী থেকে আসা সদস্যদের নিয়ে মিশ্র একটি বাহিনী। তারা পুলিশের লোগো ব্যবহার করে, কেতাবি অর্থে তারা পুলিশের একটি শাখা, কিন্তু গণমানুষের মধ্যে এই ধারণাই প্রচলিত আছে যে, এটা একটা সামরিক বাহিনী।’
ক্রসফায়ার বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
র্যাব গঠনের পর থেকে আলোচনায় আসে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি। বাংলাদেশে পুলিশের সঙ্গে এর আগেও বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসীদের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে র্যাবের সঙ্গে ‘ক্রসফায়ার’ অনেকটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
বিবিসি বাংলার তথ্য অনুসারে, র্যাবের বন্দুকযুদ্ধের সূচনা হয় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানের ক্রসফায়ারের মধ্য দিয়ে। তখন আরো সন্ত্রাসীর এভাবে মৃত্যু র্যাবকে অনেকটা জনপ্রিয় করে তুললেও বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ ছিল দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।
মোখলেসুর রহমান বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ গতানুগতিক ধারায় পুলিশিং করে আসতো। গুলি ছোড়া পুলিশের একেবারেই স্বভাববিরুদ্ধে কাজ ছিল। র্যাব আসার আগে পর্যন্ত ট্রিগার হ্যাপি পুলিশিং দেখা যায়নি।’
র্যাবের সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে হত্যা, ঘুষ নেয়া, চাঁদা আদায় করা, ডাকাতির অভিযোগও উঠতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় নারায়ণগঞ্জে সাত খুন।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। র্যাব-১১ এর তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তা এতে জড়িত ছিলেন বলে পরে প্রমাণ পাওয়া যায়।
এরপর বড় ধাক্কা আসে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। গুরুতর মানবাধিকার লংঘনে জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাব এবং বাহিনীর ছয়জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়।
তখন মানবাধিকার সংস্থাগুলো র্যাব বিলোপের দাবি জোরেশোরে তোলে। বিএনপি সরকারের সময় র্যাব গঠন করা হলেও এই দলটিও র্যাবকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ আমলে।
এখন বিএনপি সরকার গঠনের পর র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের সিদ্ধান্ত হলো।
নতুন আইনে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ এসআরবির কাছে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ ও ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।







