সাইবার অপরাধ বেড়েছে, বাড়েনি দমনের সক্ষমতা
- চার বছরে ৯৪৩ মামলা, অভিযোগের পাহাড়
- সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে মুখ খুলছেন না ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী
- প্রতি পাঁচ কিশোরী-তরুণীর তিনজন সাইবার বুলিংয়ের শিকার
- আক্রমণের শিকার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থা থেকে শুরু করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান

দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে অনলাইনকেন্দ্রিক সাইবার অপরাধ। ছবি: সংগৃহীত
একটি খুদে বার্তা। একটি ওয়েবসাইটের লিংক। একটি ক্লিক। এরপরই ব্যাংক হিসাব থেকে উধাও লাখ টাকা। আবার কখনো ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব করে একান্ত আলাপচারিতার স্ক্রিনশট দিয়ে ব্ল্যাকমেইল। কখনো চাকরির প্রলোভন কিংবা বিনিয়োগের নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অর্থ। সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া সাইট বানিয়েও চুরি করা হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য।
দিন যত যাচ্ছে, অনলাইনকেন্দ্রিক এসব অপরাধও তত বাড়ছে। ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-সংস্থাও এখন সাইবার অপরাধীদের কবলে। এমনকি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংস্থাও সম্প্রতি শিকার হয়েছে সাইবার হামলার। সংস্থাটিতে হওয়া ‘জিরো ডে অ্যাটাক’ (কম্পিউটারে এমন একটি সাইবার আক্রমণ, যা সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের এমন অজানা ত্রুটি বা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে করা হয়, যার সমাধান প্রস্তুতকারক কোম্পানি জানে না) আতঙ্ক এখন রাষ্ট্র ও সরকারের সংস্থা ও মহলে। ‘জিরো ডে অ্যাটাক’ ছাড়াও মাঝেমধ্যেই হ্যাকিংয়ের কবলে পড়ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা। তবে সেগুলো দমনে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে ৯৪৩টি সাইবার মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ সময়ে ৩৮টি। ২০২৪ সালে ১৮৮টি। ২০২৫ সালে ৫০৭টি। আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই হয়েছে ২১০টি মামলা। অর্থাৎ বছরের প্রথম তিন মাসেই গত বছরের মোট মামলার প্রায় অর্ধেক হয়েছে।
তবে মামলার সংখ্যা দিয়ে সাইবার অপরাধের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাচ্ছে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তাদের ভাষ্য, সাইবার আক্রমণের শিকার বড় একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাচ্ছেই না।
খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে প্রায় ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। বিশেষ করে, নারী ও কিশোরীরা প্রায়ই এমন অপরাধের শিকার হলেও তাদের অনেকেই বিষয়টি গোপন রাখেন। আবার অভিযোগ করলেও সব ক্ষেত্রে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার। পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে প্রায় ৭২ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তিহীন থেকে যায় বা খারিজ হয়ে যায়। ফলে অপরাধী থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্যদিকে আরও গভীর হচ্ছে ভুক্তভোগীর ক্ষত।
এমন পরিস্থিতি ডিজিটাল নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামও বলছিলেন সে কথা। গত ২০ জুলাই মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) এক অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, ‘তথ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দেশীয় প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন।’
অভিযোগের চাপ সিআইডি-ডিবিতে
সাইবার অপরাধের ভয়াবহতার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে জমা পড়া অভিযোগে। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে গত এক বছরে প্রায় ১১ হাজার ৫৭০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ধরনের অভিযোগের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৫২ শতাংশই অনলাইন প্রতারণা। এর বাইরে অনলাইন হয়রানির হার ২৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। অভিযোগের প্রায় ৮০ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এরপরও বর্তমানে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে এখনো ২৫৮টি মামলা তদন্তাধীন। এ ছাড়া রয়েছে ৬৫১টি সাধারণ ডায়েরি ও ৭২০টি অভিযোগ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিট উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগও সামলাচ্ছে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ। প্রায় চার হাজার সাইবার-সংক্রান্ত জিডি তদন্ত করছে ইউনিট দুটি।
নতুন আতঙ্ক ‘জিরো ডে অ্যাটাক’
চলতি মাসের শুরুতে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় ‘জিরো ডে অ্যাটাক’-এর শিকার হয়। ওই সংস্থাটিতে যে লিংক পাঠানো হয়েছিল, সেটি পাঠানো হয় আরও কয়েকটি সংস্থায়। সে বিষয়ে গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর আইসিটি ভবনে দিনভর বৈঠক করেন সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা। সেখানে আলোচনা হয় এমন আক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকার নানা উপায় নিয়ে।
কীভাবে আক্রান্ত হয়
জিরো ডে অ্যাটাকে সবসময়ই বড় কোনো হ্যাকার গ্রুপ কিংবা রাষ্ট্র সরাসরি জড়িত থাকে। কোনো সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, সার্ভার বা নেটওয়ার্কে থাকা অজানা নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে চালানো হয় এ হামলা। একটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সেটি থেকে প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মেইলে বিশেষ ফিশিং মেইল পাঠানো হয়। গ্রাহক ডাবল ক্লিক করলেই তার কম্পিউটারসহ সার্ভার বা নেটওয়ার্ক— সবকিছু হ্যাকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নির্দিষ্ট সময় পরপর হোস্ট সার্ভারে তা সংযুক্ত হয়। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যাকএন্ডে কমান্ড কাজ করায় ভিকটিম প্রতিষ্ঠানেরই কেউই তা টের পায় না। এরপর তথ্য চুরি, অ্যাকাউন্ট দখল, নজরদারি, ম্যালওয়্যার ছড়ানো বা গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
সাইবার বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলছিলেন, ‘সাইবার-সচেতনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের আরও বিশেষায়িত উদ্যোগের প্রয়োজন। তার ভাষ্য, সমরাস্ত্রের যুদ্ধের চেয়ে সাইবার যুদ্ধ অনেক বেশি ভয়াবহ। এ অপরাধ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। তবে গত এক দশকে যেভাবে বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধ বেড়েছে, সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।’
গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটও ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পোর্টাল ও ওয়েবসাইট একের পর এক হ্যাক হওয়ার ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতিতে এসব অপরাধ মোকাবিলা কঠিন। প্রয়োজন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। প্রয়োজন দক্ষ জনবল। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা। আবার নতুন প্রযুক্তি বা নতুন ডিজিটাল সেবা চালু হলেই সেটিকে ঘিরে প্রতারণার নতুন ফাঁদ তৈরি করছে অপরাধীরা। এরই একটি উদাহরণ চিকিৎসক জিয়ারত ইসলামের ঘটনা। গত ২৫ মে তার মোবাইল ফোনে আসে বিআরটিএর নামে একটি বার্তা। বলা হয়, অতিরিক্ত গতির কারণে তার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা না দিলে বাড়তি অর্থ দিতে হবে। বার্তার সঙ্গে দেওয়া হয় একটি ওয়েবসাইটের সংযোগ। দেখতে সেটি ছিল বিআরটিএর আসল ওয়েবসাইটের মতোই। ওয়েবসাইটে ঢুকে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দেন জিয়ারত ইসলাম। এরপরই ঘটে বিপত্তি। মুহূর্তের মধ্যে তার হিসাব থেকে ১ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। টাকা চলে যায় দুটি বাংলাদেশি নম্বরে।
মন্ত্রীদের নামেও জালিয়াতি
সাইবার অপরাধীরা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়ও ব্যবহার করছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নামে জাল সিল, স্বাক্ষর ও দাপ্তরিক প্যাড তৈরির ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তাদের কাছ থেকে আটটি মোবাইল ফোন, দুটি কম্পিউটার ও একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় ৪১টি জাল সিল। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের সচিবদের দাপ্তরিক প্যাডের ছয় বান্ডিল। তদন্তে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির একটি জাল সুপারিশপত্র ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার ও প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।
ফিশিংয়ে সর্বনাশ
সিআইডির সাইবার ইউনিটের তথ্য বলছে, বর্তমানে ফিশিং, ভুয়া অনলাইন কেনাবেচা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, বিনিয়োগ প্রতারণা, লটারি ও পুরস্কারের নামে প্রতারণা এবং প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদ বাড়ছে। অভিযোগের ৪৫ দশমিক ৫২ শতাংশই অনলাইন প্রতারণাসংক্রান্ত। অনলাইন হয়রানির হার ২৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। অপরাধের ধরনও বদলে যাচ্ছে দ্রুত। আজ যে কৌশল নতুন, কাল সেটিই পুরনো। অপরাধীরা নতুন প্রযুক্তি হাতে নিয়ে নতুন ফাঁদ তৈরি করছে।
অনলাইন জুয়ায় টাকার স্রোত
ডিবির সাইবার মনিটরিংয়ে শনাক্ত হয়েছে একাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের সব অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। চক্রের সদস্যরা জুয়ার পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান ও অ্যাপ পরিচালনার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ।
আলাদা সাইবার পুলিশ ইউনিটের উদ্যোগ
চলমান বাস্তবতায় পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১১ মে ডিজিটাল অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবিলায় এ পরিকল্পনার কথা জানায় সরকার। বাংলাদেশ পুলিশ এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও দিয়েছে। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাইবার অপরাধ, অনলাইন গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হবে।










