২১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি ঘোচাতে মাস্টারপ্ল্যান
- পরিকল্পনায় দেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন, ইউয়ানে লেনদেন ও এফটিএ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৮২০ মিলিয়ন ডলারে আটকে থাকায় সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়সমান বাণিজ্য ঘাটতি। এ কাঠামোগত অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে দৃশ্যপটে এসেছে যুগান্তকারী মাস্টারপ্ল্যান। বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন, ইউয়ানে লেনদেন চালু, ১২ হাজার কোটি টাকার নন-কটন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা দূর করার তাগিদ দিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। পাশাপাশি কাঁচামাল ও প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত চীন-নির্ভরতার ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প সোর্সিং, চীনের তত্ত্বাবধায়নে পলিটেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করছে।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও সাম্প্রতিক বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে শুধু পারস্পরিক শুভেচ্ছা যথেষ্ট নয়; বরং কুনমিংয়ের স্থায়ী আউটলেট ও প্রস্তাবিত চীনা ব্যাংকের মতো কাঠামোগত পদক্ষেপগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, কৃষি ও পর্যটন খাতের সম্পৃক্ততা এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর চালুর উদ্যোগ— দুই দেশের অংশীদারত্বকে আঞ্চলিক উন্নয়নের মঞ্চে উন্নীত করেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম আগামীর সময়কে বলেছেন, বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে চীনা ব্যাংক স্থাপন, ইউয়ানে লেনদেনসহ সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছি। ‘বর্জ্য ও সৌরবিদ্যুৎ’ প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি সংকট সমাধানে চীনের প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারে সরকার।
ইলেকট্রো মার্ট গ্রুপ উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে চীনা পণ্যের প্রতি বিরূপ ধারণা থাকা সত্ত্বেও মানসম্মত পণ্য ও গ্রাহক সন্তুষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের শহর থেকে গ্রামগঞ্জে পণ্য পৌঁছে দিয়েছে। প্রায় সাত হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই গ্রুপটি প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প খাতের এক অনন্য সংযোগ সৃষ্টি করেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও বহুমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখা: বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ঘাটতি কমাতে প্রধান চাবিকাঠি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজার উন্মুক্ত করা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও চীন ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা করছে। কিন্তু নানাবিধ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার সম্ভব হয়নি। এই স্থবিরতা ভাঙতে বিসিসিসিআইর পক্ষ থেকে চীনের প্রধান ২০টি শহরে বাংলাদেশের জন্য ডিপার্টমেন্টাল স্টোর স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। সূত্রমতে, এরই মধ্যে কুনমিং শহরে দুই হাজার বর্গমিটারের স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং পণ্যের মজুদের জন্য গুদাম বরাদ্দ দিয়েছে চীন। সেখানে পাট, চামড়া, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিপণ্য চীনা ক্রেতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিপ্লব ঘটাবে।
এ ছাড়া দুই দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যৌথ অ্যাকশন প্ল্যানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ যৌথ কমিটি (জেআরটি) বেশ কিছু বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার সহজীকরণ এবং অপ্রচলিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ।
ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ও চীনা ব্যাংক: দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এ বিশাল অবয়বের বিপরীতে দেশে চীনের কোনো ব্যাংক না থাকাটা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের ব্যাংক বাংলাদেশে পরিচালনা করছে। কিন্তু চীনের সঙ্গে বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যাংক না থাকায় ব্যবসায়ীদের নানা জটিলতার মুখে পড়ছে। এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ চীনা ব্যাংক চালুর প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই ধরনের কৌশলগত সুবিধা অর্জিত হতে পারে; প্রথমত, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় অর্থের সংকট আছে। বহু মিলকারখানা তহবিলের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। চীনা ব্যাংকগুলো মূলধন নিয়ে স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করে, তবে রুগ্ন ও পুঁজি সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, ইউয়ানে লেনদেন ও ডলারের ওপর চাপ হ্রাস পাবে। ব্যবসায়ীরা ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও ঝুঁকি এড়াতে ইউয়ান ও টাকা এলসি খোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। চেম্বারের হিসাবে এই উদ্যোগের ফলে এলসি খরচ অন্তত ১ শতাংশ কমানো সম্ভব। জানা গেছে, চীনা ব্যাংকগুলোর শাখা বাংলাদেশে খোলার ব্যাপারেও ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ব্যয় কমিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন: উৎপাদন খরচ কমানো ও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছে বিসিসিসিআই। চীনা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সাশ্রয়ী উৎপাদন কৌশল, স্পিনিং ও ডায়িং প্রশিক্ষণ দিতে দেশে অন্তত ২০টি আধুনিক পলিটেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, বস্ত্র খাতে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে মূল্য সংযোজন বাড়াতে চট্টগ্রামের ৩০০ বিঘা জমিতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ‘ম্যানমেড ফাইবার’ বা ‘নন-কটন’ (লায়োসেল) কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের টেক্সটাইল খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দেশেই উৎপাদিত হবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই বিনিয়োগ সহযোগিতা: সোলার প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন বিশ্ব জুড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তির প্রস্তাব বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে— তা হলো মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের বর্জ্য বা ময়লা পুড়িয়ে তা থেকে সরাসরি তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি। ঐতিহ্যগত সোলার প্যানেলের মাধ্যমে যেখানে সীমিত সময়ের আলো পাওয়া যায়, সেখানে বর্জ্যভিত্তিক এই হিট-জেনারেটেড প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর পাশাপাশি উইন্ড পাওয়ার (বায়ু বিদ্যুৎ) এবং সাশ্রয়ী লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যাকআপ সিস্টেম শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে।
বিনিয়োগ ও শিল্প স্থানান্তর: শ্রমবাজারের পরিবর্তিত গতিশীলতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চীনের অনেক উৎপাদনমুখী শিল্প এখন বিশ্ব জুড়ে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনসহ দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মতো ক্ষেত্রগুলোয় চীনা বিনিয়োগ দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশের মতো আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি— উভয় দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় মেগা প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি টেকসই শিল্পায়ন ও গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও প্রত্যাশা: এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধার ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আসবে, তা মোকাবিলায় মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এ চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যেন স্থানীয় শিল্পগুলো সুরক্ষা পায় এবং রপ্তানি পণ্যের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।



