চুরি ঠেকিয়ে বাঁচল তিতাসের ১৮২৫ কোটি টাকা
- সিস্টেম লসের নামে ৭.৩৮ শতাংশ গ্যাস চুরি হয় বছরে
- সংকটকালে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে তিতাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক বছরে ১ লাখ ৪২ হাজারেরও বেশি অবৈধ গ্যাসের চুলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিশন পিএলসি। এ ছাড়া ২৪৫ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদসহ প্রায় ১ হাজার ৪০টি শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এতে দৈনিক সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এই গ্যাসের দাম ৫ কোটি টাকা হিসাবে বছরে এর আর্থিক অঙ্ক দাঁড়ায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বেশিরভাগই দেখানো সিস্টেম লস হিসেবে। এটি বন্ধ করা গেলে গ্যাস সংকট যেমন কমবে, তেমনি এলএনজি আমদানিতে সরকারের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকিও কমবে।
তিতাস গ্যাসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে গত এক বছরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধে ৪৫১টি মোবাইল কোর্ট, কোম্পানির নিজস্ব ৩ হাজার ১১৭টিসহ মোট অভিযান পরিচালনা করা হয় ৩ হাজার ৫৬৮টি। এসব অভিযানে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৩টি আবাসিক চুলা, ৫৪১টি বাণিজ্যিক ও ৪৯৮টি শিল্প সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এই সময়ে ২৪৫ কিলোমিটার গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহণের দায়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন থানায় ৪৫টি মামলা ও ৩১টি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড, অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগে জড়িত থাকার অভিযোগে কোম্পানির ১৭ জন কর্মকর্তা ও ১৮ জন কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি অবৈধ এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত পাঁচজন ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এর আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ৫৭৮টি অভিযানে প্রায় ২১০ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদের পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৪৫৯টি অবৈধ গ্যাস সংযোগের চুলা বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিভিন্ন ধরনের অসংগতির কারণে ৩৪১টি শিল্প, ৭৩টি ক্যাপটিভ, ১৫১টি বাণিজ্যিক ও ১১টি সিএনজি গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এসব অভিযানে।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে। কিন্তু সমস্যা হলো, একবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর নতুন করে আবার তা লাগানো হয়। এর সঙ্গে একটা চক্র রয়েছে। বাইরের লোকের পাশাপাশি তিতাসেরও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। অভিযোগ পেয়ে সম্প্রতি চার কর্মকর্তা এবং দুই কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এখন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
গ্যাস চুরির শাস্তি
দেশে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও অপচয় রোধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে গত ফেব্রুয়ারিতে ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। নতুন অধ্যাদেশে গ্যাস চুরির অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা অন্তত ৫৫০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সংযোগ অনুযায়ী চাহিদা বিবেচনা করা হয় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে কমবেশি ১০০ কোটি ঘনফুট আসে আমদানিকৃত উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে।
বর্তমানে গ্যাসের মোট সিস্টেম লস ৯.৩৮ শতাংশ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস অনুমোদন করে। গ্যাসের মোট সিস্টেম লস থেকে অনুমোদিত সিস্টেম লস বাদ দিলে দাঁড়ায় ৭.৩৮ শতাংশ। যার প্রায় পুরোটাই চুরি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য তিতাসের পুরনো ও জরাজীর্ণ লাইনের কারণে গ্যাস লিকেজ হওয়ায় কিছু সিস্টেম লস হয়।
চুরি যাওয়া দৈনিক গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের সরকার নির্ধারিত গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭০০ টাকা বিবেচনায় এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে বছরে ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে।







