ভিসা নীতি ২০২৬
বাংলাদেশে ১ লাখ ডলার বিনিয়োগকারীরা পাবেন ভিসামুক্ত যাতায়াত সুবিধা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ টেনে আনা, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের আসার পথ সহজ করতে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত আধুনিকায়ন এনেছে সরকার। কোনো বিদেশি উদ্যোক্তা ১ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সপরিবারে ভিসামুক্ত নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবেন। এ ছাড়াও নীতিমালায় বিনিয়োগকারীদের জন্য রাখা হয়েছে আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইমিগ্রেশন উইং থেকে প্রকাশিত ‘ভিসা নীতি ২০২৬’ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালের সংশোধিত নীতিমালার তুলনায় নতুন নীতিতে ব্যবসায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও বিদেশি দক্ষ বিশেষজ্ঞদের জন্য ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত স্পষ্ট, সমন্বিত ও নিয়মকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আসা-যাওয়া সহজ করার পাশাপাশি তাদের কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট পরিসীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। যারা মূলত বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিচালনা পর্ষদের সভা, ট্রেড ফেয়ারে অংশগ্রহণ কিংবা পণ্যের গুণগত মান যাচাই ও দরকষাকষির কাজে আসেন, তাদের জন্য ‘বি’ (বিজনেস) ক্যাটাগরির ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে। ১ বছর মেয়াদের বহুমাত্রিক প্রবেশের এই ভিসায় আসা ব্যবসায়ীরা প্রতিবারে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারবেন। তবে এই ভিসায় স্থানীয়ভাবে বেতনভুক্ত কোনো কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতে সরাসরি অর্থ বিনিয়োগ করা বিদেশি নাগরিকদের জন্য ‘পিআই’ (প্রাইভেট ইনভেস্টর) ভিসার প্রক্রিয়ায় গতি আনা হয়েছে। আগে মেয়াদ নবায়নে যে দীর্ঘ প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তা দূর করে এখন কাজের অনুমোদনের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে একবারে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে যদি কোনো বিদেশি উদ্যোক্তা দেশে ভারী শিল্প বা দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায় অন্তত ১ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেন, তবে তিনি ও তার পরিবার দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার জন্য ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ সুবিধা বা ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জিসিসি ভুক্ত দেশসমূহ থেকে আসা পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা দেশের যেকোনো আন্তর্জাতিক বন্দরে এসে সরাসরি ৩০ দিনের একক প্রবেশের অন-অ্যারাইভাল ভিসা গ্রহণ করতে পারবেন।
নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তনটি এসেছে ভিসার ক্যাটাগরি পরিবর্তনের সুযোগে। আগের নিয়মে একবার দেশে প্রবেশ করলে ভিসা ক্যাটাগরি পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব ছিল এবং অনেককে এজন্য নিজ দেশে ফিরে গিয়ে নতুন ভিসায় আসতে হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের নীতি অনুযায়ী, কেউ যদি অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর বাণিজ্য কিংবা শিল্প খাতে নিয়োজিত হতে চান, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বা বেপজার সুপারিশক্রমে ২০০ মার্কিন ডলার ফি প্রদান করে তা সরাসরি বিনিয়োগকারী (পিআই) বা কর্মসংস্থান (ই) ক্যাটাগরিতে রূপান্তর করে নিতে পারবেন।
কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কোনো বিদেশি নাগরিককে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য গোপন করে বা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বিধান রাখা হয়েছে। প্রথমবার নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ টাকা এবং পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের জন্য ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড গুণতে হবে।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান বন্ধে একটি নির্দিষ্ট জরিমানা কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম ১৫ দিন অবস্থানের জন্য দৈনিক ১,০০০ টাকা, ১৬ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত অবস্থানের জন্য দৈনিক ২,০০০ টাকা এবং ৯০ দিনের বেশি অতিক্রম করলে দৈনিক ৩,০০০ টাকা হারে জরিমানা দিতে হবে। তবে কেউ যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আকস্মিক দুর্ঘটনা কিংবা ফ্লাইট বাতিলের মতো অনিবার্য কারণে সাময়িকভাবে আটকে পড়েন, তবে অতিরিক্ত সেই অবস্থানকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। এ ছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে ওভারস্টে হলে সিভিল সার্জন বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে জরিপানা মওকুফের সুনির্দিষ্ট সুযোগও রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন এই সমন্বিত নীতিমালা একদিকে যেমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আগমনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করবে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







