বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের তারুণ্য কখনই আপস করেনি : প্রধানমন্ত্রী

আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও
বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে দেশের তারুণ্য কখনো আপস করেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে শুরু করে ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনায় তরুণরা দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে।
আজ শনিবার সকালে ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), রোভার স্কাউট ও বাংলাদেশ স্কাউটসের বিশেষ ডিসপ্লে প্রদর্শনী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান গ্যালারি থেকে ডিসপ্লে উপভোগ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভবিষ্যতে যাতে কেউ দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে, দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই হোক এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনসিসি ক্যাডেট ও স্কাউটদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেছেন, ৭ নভেম্বর দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের মানুষকে বাংলাদেশি পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছিল।
তিনি উল্লেখ করেছেন, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর বাংলাদেশি পরিচয় নির্ধারণের ভিত্তিভূমিও রচনা করেছিল। তাই যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব ও তাৎপর্য প্রাসঙ্গিক থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ৭ নভেম্বরের নায়ক ছিলেন দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা।
তার ভাষ্য, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ১৯৭১ সালেও একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রণাঙ্গনে সম্মুখসমরে লড়াই করেছিলেন।
এ সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রদর্শনী নিয়ে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একটি জাতির ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। সত্য ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা।
তিনি বলেন, এ আয়োজনের বিশেষত্ব হলো হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী নির্মোহভাবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে।
প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাস, ইতিহাস সচেতন এই প্রজন্ম ৭ নভেম্বরের প্রেরণায় উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ আর পথ হারাবে না।
অনুষ্ঠানে বিশেষ ডিসপ্লেতে মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামল এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হয়।
স্কাউট ও শিশু-কিশোররা এসব ঘটনা উপস্থাপন করে। এরপর ‘একসঙ্গে গড়ব, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই বার্তার মধ্য দিয়ে সুরের মূর্ছনায় ডিসপ্লেটির সমাপ্তি হয়। পরে গ্যালারি থেকে মঞ্চে এসে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইতিহাস সাক্ষী, যতবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, ততবার ৭ নভেম্বরের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের চেতনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক দিনে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।দেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের শত্রু ও মিত্র চিহ্নিত করার দিন বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চরম আকার ধারণ করেছিল। এই চক্রান্তের পথ ধরেই ২ নভেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দি করা হয়েছিল।স্বাধীনতার ঘোষককে কারাবন্দি রেখে দেশের স্বার্থবিরোধী যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।‘এ কারণেই দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের চেতনার বাতিঘর’, যোগ করেন তারেক রহমান।প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ৭ নভেম্বরের পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র কখনোই থেমে থাকেনি।তিনি অভিযোগ করেন, ষড়যন্ত্রের পথ ধরে তারা মহাজোটের নামে একজোট হয়ে দেশকে পুনরায় তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল।ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে হতাহত এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের অবদানও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর ২০২৪ ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার।তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় রাজপথে নেমে এসেছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও প্রায় একইভাবে সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের সঙ্গে প্রমাণিত হয়েছে, দেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ণয়ের দিন।তিনি আরও বলেন, যতবার বাংলাদেশ ৭ নভেম্বরের পথরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ততবার দেশ ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী তার সহধর্মিণীকে নিয়ে মাঠ ঘুরে গ্যালারিতে বসে থাকা শিক্ষার্থী ও অতিথিদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান এবং নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল খোন্দকার মেজবাহউল আজীমসহ তিন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



