পুরনো জটে আটকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার
- সব নিয়ন্ত্রণে নিতে শতকোটি টাকার তহবিল গঠনের অভিযোগ
- প্রধান বাধা ২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক
- প্রশ্নবিদ্ধ ধারাগুলো সংশোধন না হলে সম্ভব না অবাধে কর্মী পাঠানো

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালুর ঘোষণা এলেও বাংলাদেশ থেকে দ্রুত কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ। প্রধান বাধা ২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। এ স্মারকের প্রশ্নবিদ্ধ ধারাগুলো সংশোধন করা না হলে অবাধে কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকরা। একই সঙ্গে অতীতে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার আবার চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়। সফরের সময় বাংলাদেশ বিদ্যমান এমওইউ সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। তবে মালয়েশিয়া বিদ্যমান স্মারক পর্যালোচনা করে নতুন সমঝোতা স্মারক তৈরির প্রক্রিয়ায় এগোতে চায়। দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এজন্য একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
জনশক্তি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন এমওইউ করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। আগের সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করতেই প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। তাই নতুন চুক্তির পথে হাঁটলে শিগগিরই শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হবে না। তাদের মতে, বিদ্যমান এমওইউ সংশোধনই সবচেয়ে দ্রুত সমাধান হতে পারে।
বর্তমান এমওইউর সবচেয়ে বড় বিতর্ক এজেন্সি নির্বাচন পদ্ধতি। চুক্তির ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়াকে পাঠাবে। এরপর মালয়েশিয়া ঠিক করবে কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ প্রায় দেড় হাজার বৈধ এজেন্সির তালিকা পাঠালেও শেষ পর্যন্ত সীমিতসংখ্যক এজেন্সি সুযোগ পায়। জনশক্তি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ ব্যবস্থাই সিন্ডিকেট তৈরির পথ খুলে দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) এবং এর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেটকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ার নাগরিক আমিনুল ইসলাম নুরের মালিকানাধীন বেস্টিনেটের সঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে কর্মী পাঠানোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ অংশে এ সমন্বয়ের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন। প্রথমে ২৫ এবং পরে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ১০১টি এজেন্সি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।
এই সিন্ডিকেটের কারণে কর্মী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সরকারিভাবে একজন কর্মীর অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু মালয়েশিয়ার শ্রমিক ইউনিয়নের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাস্তবে অনেক কর্মীর কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। হাজারো কর্মী বিপুল অর্থ ব্যয় করেও প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ভুয়া চাহিদাপত্র দেখিয়ে কর্মী নেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটভুক্ত এজেন্সিগুলোকে প্রত্যেক কর্মীর জন্য বেস্টিনেটকে দিতে হতো প্রায় দেড় লাখ টাকা। মালয়েশিয়ার মধ্যস্বত্বভোগীদের কর্মীপ্রতি ৬ হাজার রিংগিত (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা) দেওয়া হতো। ঢাকায় সিন্ডিকেটে যুক্ত হওয়ার জন্য কর্মীপ্রতি আরও ১ লাখ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে এফডব্লিউসিএমএসের অটো রোটেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে চাহিদাপত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রির।
এ কারণে জনশক্তি ব্যবসায়ীদের দাবি, বিদ্যমান এমওইউ সংশোধন করে এজেন্সি বাছাইয়ের বর্তমান ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। অটো রোটেশন পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে হবে। সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সিন্ডিকেটের প্রভাব কমবে এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এদিকে চলতি মাসের শেষদিকে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর. রামানান ঢাকা সফরে আসতে পারেন। এ সফরে শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, শোষণ, বৈষম্য ও আর্থিক অনিয়মমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া। সুশাসন, শ্রমিকের কল্যাণ এবং নৈতিক নিয়োগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, বিদ্যমান এমওইউ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো সম্ভব নয়। নতুন এমওইউ করতে গেলে আরও সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে দ্রুত শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ মিলবে হবে না।
বায়রার নির্বাহী সদস্য ও পলি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ম্যানেজিং পার্টনার মো. কামাল উদ্দিন দিলু বললেন, দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এবার অবশ্যই সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ ও সমান সুযোগভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ: এদিকে অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের দাবি, আবারও শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে পুরনো চক্রটি।
এক এজেন্সির মালিক বললেন, বিগত সরকারের সময় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট চেষ্টা করছে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে প্রভাবিত করতে তারা বড় অঙ্কের একটি তহবিল গঠন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, এ তহবিলের পরিমাণ শতকোটি টাকা। মালয়েশিয়ায় বসেই এ অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি ১০-১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। তার ভাষ্য, মালয়েশিয়ার একটি প্রভাবশালী চক্রও যুক্ত রয়েছে এ উদ্যোগের সঙ্গে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জনশক্তি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অতীত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে এমওইউ সংশোধনের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও আগের সংকটে ফিরে যেতে পারে।




