অন্তর্বর্তীর গাফিলতিতে ব্যয় বাড়ছে ১ লাখ কোটি

ছবি: এআই
ঋণ পেতে প্রায় সোয়া লাখ কোটির বাড়তি ব্যয়। অতিরিক্ত এ ব্যয় হতো না— যদি অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো কাজটা শুরু করত। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার অতিরিক্ত খরচ ধরেছিল— এ অজুহাতে তারা ঝুলিয়ে রাখে। িনর্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে— বলে বলটা ঠেলে দেয় নতুন সরকারের দিকে।
মেট্রোরেলের এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পে সময়ের কাজ সময়ে শুরু না করায় এখন সবকিছুতেই তাড়াহুড়া। জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি করার সময় শেষ হবে ৩০ সেপ্টেম্বর। ঋণচুক্তির বাইরে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে করতে হবে ঠিকাদারের চুক্তিও। এ পরিস্থিতিতে সরকার ‘বাধ্য’ হয়েই একনেকে প্রকল্প দুটি অনুমোদন করতে যাচ্ছে যাতে চুক্তিগুলো করা যায়। যদি একনেক অনুমোদন না করে তাহলে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। নতুন করে ঋণ খুঁজতে হবে। এখন শুরু করলেও চালু হবে নির্ধারিত সময়ের সাত বছর পর। আর নতুন করে ঋণচুক্তি করে কাজ শুরু করতে হলে তা পেছাবে অনির্দিষ্টকালে।
মেট্রোরেলের বেশিরভাগ প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা জাপানের সঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প শুরু না হওয়ায় জাইকার কর্মকর্তারা বিরক্ত। এর মধ্যে জাপানি ঠিকাদার কাজিমা করপোরেশন কাজ ছেড়ে চলে গেছে। আরও কয়েক ঠিকাদার চলে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ অবস্থায় জাইকাও চাচ্ছে কাজটি দ্রুত শুরু হোক। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান সরকারকেও তাগাদা দিয়েছে। এরপরই সরকার প্রকল্পগুলো দ্রুত শুরুর সিদ্ধান্ত েনয়।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় কমানোর জন্য কমিটি গঠন করেছিল। তারা পুনরায় টেন্ডার করারও অনুমোদন চেয়েছিল জাইকার কাছে। তারা সে অনুমোদন দেয়নি। সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে যে চুক্তি করার কথা ছিল, তাও করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় প্রথম পাতাল মেট্রোরেল লাইন-১-এর নির্মাণকাজ। কথা ছিল বিমানবন্দর-কমলাপুর-পূর্বাচল রুটের কাজ ২০২৬ সালে শেষ হবে। কিন্তু সাত বছর পর এসে নতুন করে সাত বছর সময় বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ প্রকল্পের খরচ বাড়তে যাচ্ছে ৬২ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা, যা মূল প্রস্তাবের চেয়ে ১১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে শুরু হওয়া আরেকটি পাতাল মেট্রোরেল হলো লাইন-৫ (উত্তর)। এটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। নতুন প্রস্তাবে সময় ঠেকছে ২০৩২ সালে। অর্থাৎ বাড়তে যাচ্ছে আরও ছয় বছর। পাল্লা দিয়ে বাড়বে খরচও। আগের চেয়ে ৪৯ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা খরচ বেশি হবে, যা কি না মূল প্রস্তাবের চেয়ে ১২১ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি।
এ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এ সময়ের মধ্যে ঋণচুক্তি না হলে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর)-এর ঋণ দেওয়া থেকে সরে যাবে জাইকা। তারপর নতুন করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে ঋণ খুঁজতে হবে। তিনি মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতির শতভাগ দায় অন্তর্বর্তী সরকারের। অন্তর্বর্তী যদি চলতে থাকা কাজ বন্ধ না করত তাহলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এত বেশি খরচে মেট্রো নির্মাণ করা ঠিক হবে কি না, সে প্রশ্নও তখন বারবার সামনে আনা হচ্ছিল। ব্যয় কমানোর মাশুল দিতে গিয়ে এখন ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে গেছে। কাজ চলমান থাকলে খরচ এত বাড়ত না।
ঢাকার যানজট কমাতে পাতাল মেট্রোরেলের যে ছবি আঁকা হয়েছিল, সেই ছবি বাস্তবায়নে অপেক্ষা যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে আর্থিক বোঝাও। দুই পথ মিলে মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ব্যয় দাঁড়াবে ২ লাখ ৫ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। বাড়বে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
কথা হলে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মোকছেদ আলী আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় একনেকে এটি ওঠার সম্ভাবনা বেশি। আশা করি এটি অনুমোদন পাবে।’
ডলারের দাম ও নকশা বদলে বেশি খরচ: মেট্রোর লাইন-১-এ ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে আসছে নকশায় পরিবর্তন। গুলশান-২ ও নতুন বাজার স্টেশনের গভীরতা বাড়ায় খনন, ডায়াফ্রাম ওয়াল এবং ভূগর্ভস্থ পূর্তকাজের পরিমাণ ও ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি প্রায় ২০ কিলোমিটার ডিটুর সড়ক এবং ৩ দশমিক ৯১ কিলোমিটার অতিরিক্ত ট্র্যাকের বিষয়ও নতুন প্রস্তাবে এসেছে। এ ছাড়া পাতাল রেল নির্মাণের ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণ ও অতিরিক্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। ডিপো এলাকার আয়তন বাড়ার কারণেও ভূমি উন্নয়ন, ভরাট, ড্রেনেজ, ইউটিলিটি, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ডিপো অবকাঠামোর ব্যয় বাড়বে।
আরেকটি কারণ বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার। মূল ডিপিপিতে ডলারপ্রতি ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে তা ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব পড়েছে প্রকল্পের আমদানি ব্যয়ে। কভিড-১৯, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের মূল্যস্ফীতিকেও ব্যয় বাড়ার কারণের খরচ বাড়ছে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মনে করেন, ‘ঢাকার জন্য মেট্রো জরুরি হয়ে উঠেছে। এটি করতেই হতো। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা ঠিক হয়নি। সময়ের কাজ সময়ে হতে থাকলে খরচ এতটা বাড়ার সুযোগ ছিল না।’
ঋণের টাকায় বাড়ছে চাপ, ঠিকাদার নিয়োগে কাটছে সময়: ২০১৯ সালে প্রকল্প অনুমোদনের পর কভিড-১৯-এর কারণে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস কনসালট্যান্টের সাইটে মোবিলাইজেশন সম্ভব হয়নি। এতে বিস্তারিত নকশা ও দরপত্র নথি তৈরিতে বিলম্ব হয়। আবার ভূগর্ভস্থ নির্মাণ প্যাকেজের জন্য প্রাকযোগ্যতাসম্পন্ন দরদাতা না পাওয়ায় দরপত্র পুনরায় আহ্বান করতে হয়েছে। পরে জাইকার কনকারেন্স (অনুমোদন) নেওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় সময় লেগেছে। এসব কারণে নির্মাণকাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
নতুন বাজার সংযোগস্থল
লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। আর লাইন-৫ (উত্তর) হেমায়েতপুর থেকে বালিয়ারপুর, আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর, বনানী, গুলশান-২, নতুন বাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ জুড়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। লাইন-১-এর বিমানবন্দর-কমলাপুর অংশটি ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার পুরোপুরি পাতাল এবং এতে ১২টি স্টেশন থাকবে। নতুন বাজার-পূর্বাচল অংশটি ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার। এর বেশিরভাগই উড়াল। নদ্দা ও নতুন বাজারে থাকবে পাতাল স্টেশন। লাইন-৫ (উত্তর)-এর ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়াল। মোট স্টেশন ১৪টি। ৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল। পাতাল স্টেশনগুলো হবে— গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২ ও নতুন বাজারে। উড়াল স্টেশন থাকবে— হেমায়েতপুর, বালিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারায়। দুই লাইনের মধ্যে নতুন বাজার হবে সংযোগস্থল। দুই পথের যাত্রীরা এখানে আন্তঃসংযোগের সুবিধা পাবেন।





