থামছে না খুনোখুনি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনোভাবেই থামছে না খুনোখুনি। রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশ। ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার ৮৩০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৬ জন, আহত ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি।
চলতি মাসেও সারা দেশে ১০টির বেশি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে গত দেড় বছরে সারা দেশে অন্তত ৭৪৮টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১৫৭ জন, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৮১ জন। অভিযোগ, অপরাধীদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে গেলেও নানা ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের।
অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্বের চেয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই এখন রাজনৈতিক সহিংসতার প্রধান কারণ।
অনুসন্ধান বলছে, গত দেড় বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে ৮৬ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, যাদের বড় অংশই দলীয় অন্তঃকোন্দলে শিকার। গত মঙ্গলবার রাজধানীর সবুজবাগে পূর্বশত্রুতার জেরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে মো. পলাশ (৩৬) নামে এক ওয়ার্ড বিএনপির কর্মীকে।
সবশেষ গত শুক্রবার রাতে কাফরুল থানা বিএনপির সদস্য সচিব মো. হাফিজুল ইসলাম বাবুকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এলোপাতাড়ি গুলিতে সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও পথচারী মো. মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় সূত্র এবং তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এই হত্যাকাণ্ড। আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচন, জমির ব্যবসাসহ পূর্বশত্রুতাও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ।
এর আগে গত ৮ জুলাই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সিজুকে ফলপট্টি এলাকায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা অস্ত্রসহ শান্ত ভূঁইয়া নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশে দেয়। পায়ে ও কোমরে গুলিবিদ্ধ সিজু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক নিয়ন্ত্রণে। গত ১ মে থেকে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চলছে। কিছু দুর্বৃত্ত দীর্ঘদিন পালিয়ে ছিল। বর্তমানে তারা দেশে ফিরে এসে পৃষ্ঠপোষকতা করছে নানা অপরাধের। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার।’
গত ৯ জুন রাতে বাগেরহাটের ফকিরহাটে ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আহত হন স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল্লাহ মোড়ল। এর এক দিন আগে রাজধানীর মৌচাক এলাকায় ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন। হত্যাকাণ্ডে যাদের নাম এসেছে, তারা যুবদলের নেতাকর্মী।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১ মে থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত চলা বিশেষ অভিযানে ২৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৩১৭ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ৮৮টি ম্যাগাজিন, ৪৩টি হাতবোমা এবং সোয়া ২ কেজি গানপাউডার উদ্ধার হয়। তবে গতকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬২৫ জন অবৈধ অস্ত্রধারী। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ১৯১ জন। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল এবং থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া থেকে দেশে ঢুকছে একের পর এক অস্ত্রের চালান। স্থল ও বঙ্গোপসাগরের অরক্ষিত অন্তত ১৫টি রুটে আসা চালানের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে ক্রিপ্টো কারেন্সিতে। এর বাইরেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে থেকে বড় বড় অস্ত্রের চালান নিয়ে এসেছেন অস্ত্র কারবারিরা। এরই মধ্যে এসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দেড় বছরে সংঘটিত ৭৪৮টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫৭ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৩৮১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন ৮৬ জন। গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১০২ জন এবং আহত হন ৪ হাজার ৭৪৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭০ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৯২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও অন্তত ২ হাজার ৩৮০ জন আহত হন। এ ছাড়া যুবদলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিএনপি-যুবদল, কৃষক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের পারস্পরিক সংঘর্ষেও একাধিক প্রাণহানি ঘটে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ৭৯টি ঘটনায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৪৫ জন আহত হন।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৮৩০টি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে ৫২৯টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৭৯ জন এবং আহত হন ৪ হাজার ১২৪ জন।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ৫৬ জনের মধ্যে ৩৭ জন বিএনপির, ছয়জন জামায়াতে ইসলামীর, তিনজন আওয়ামী লীগের, আটজন অন্যান্য দলের, একজন চরমপন্থী এবং একজন সাধারণ নারী।
সংস্থাটি বলছে, ৮৩০টি সহিংস ঘটনার মধ্যে ৬৭৩টি বা প্রায় ৮১ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলের ২৭৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৯২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ২৯০টি ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৮৫২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ৭৭টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ৪৬৪ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপি, আওয়ামী লীগ-এনসিপি এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের সংঘর্ষেও কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ছয় মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত ৬৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ৩৮ জন নিহত এবং ৯০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে ৯ শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দল ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে পদ, প্রভাব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সেখান থেকেই সংঘাতের জন্ম নেয়। অনেক সময় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত হয়। তবে আধিপত্য বিস্তার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
তার মতে, সরকার ও রাজনৈতিক দলকে আলাদা রাখতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তবে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখে র্যাব।




