যদি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফোনটার নাম আইফোন। আমি এসব দামি ফোনের কেরামতি বুঝি না। আমার কাছে সব ফোনই এক। যার এক মাথায় কথা বললে অন্য মাথায় শোনা যায়। কিন্তু অপ্রতিম ছেলেটা বোধহয় বুঝত। ১৩ বছর বয়সের একটা ছেলের কাছে আইফোনের মূল্য মহাবিশ্বের চেয়েও বড়। এই বয়সের ছেলেদের আরও একটা বড় সমস্যা আছে। তারা নিজেদের আর ছোট মনে করে না। মায়ের ফোন নিয়ে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে তাদের কোনো অপরাধবোধ হয় না। অপ্রতিমেরও হয়নি।
গত শুক্রবার বিকালে সে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়েছিল। সম্ভবত তার ধারণা ছিল, কিছু ছবি তুলবে, বন্ধুদের সঙ্গে একটু ঘুরবে, তারপর সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবে। মায়ের কাছে হয়তো বলেওনি ঠিক কোথায় যাচ্ছে। অথবা বলেছিল। মা হয়তো এখন আর মনে করতে পারছেন না।
সন্ধ্যা হলো। অপ্রতিম ফিরল না। প্রথমে মা চিন্তা করলেন না। ছেলেরা দেরি করে। তারপর ফোন করলেন। বন্ধু-বান্ধবের কাছে খোঁজ নিলেন। কোথাও নেই।
রাত বাড়তে থাকল। একসময় মা ফেসবুকে ছেলের ছবি দিয়ে লিখলেন, ‘আমার ছেলেকে বিকাল ৩টা থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা যে যেখান থেকে পারেন সহায়তা করেন। আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি। আমার ছেলেকে বাঁচান।’ এরপর আরেকটি পোস্ট, ‘আমার ছেলেরে আমি কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে।’
পরদিন বাঁশ কাটতে যাওয়া শ্রমিকরা ছেলেটাকে খুঁজে পেল। জঙ্গলে, ঝোপঝাড়ের মাঝখানে সে চুপচাপ শুয়ে ছিল। গায়ে সেই চেনা পাঞ্জাবি। তবে যার জন্য সে বের হয়েছিল— সেই ফোনটা আর তার কাছে নেই।
পুলিশ বলছে, ফোনটার জন্যই নাকি এই হত্যাকাণ্ড। সামান্য ওজনের একটা প্লাস্টিক আর কাচের টুকরোর জন্য ১৩ বছরের একটা ছেলেকে নিভে যেতে হলো। অপ্রতিমের মা এখন বিলাপ করে বলছেন, ‘এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে?’
পৃথিবীর সবকিছুই এখন অর্থহীন। অপ্রতিমের ছবির দিকে তাকালেই নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ে। আমার ছেলেটাও তো ঠিক এই রকম দুরন্ত। তবে আমি তাকে কোথাও একা যেতে দিই না। খাঁচায় বন্ধ পাখির মতো আটকে রাখি। সে হয়তো মনে মনে রাগ করে। কিন্তু মানুষের প্রতি যে অবিশ্বাস আমার ভেতরে জন্মেছে, তার কোনো চিকিৎসা নেই। বাইরে যখন রাত বাড়ে, আমি ছেলেটার মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি। এই শব্দটুকু ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো কিছুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।



