১০-১২ ঘণ্টায় পাকানো হচ্ছে কলা, পরিণতি ভয়ংকর

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার বাজারগুলোতে কলা পাকানো হচ্ছে কার্বাইডজাতীয় বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে। ফলে ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যেই কলা আকর্ষণীয় হলুদ রঙ ধারণ করে। তাড়াইল সদর বাজার, তালজাঙ্গা বাজার, পুরুড়া বাজার, সেকান্দরনগর বাজার, জাওয়ার বাজার ও দামিহা বাজারে এসব চিত্র সহসাই চোখে পড়ে।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বিভিন্ন বাজারে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে কলা। মৌসুমে পাকা কলার ব্যাপক চাহিদা থাকায় একশ্রেণির অসাধু কলা ব্যবসায়ী ও আড়তদার বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। উপজেলার বিভিন্ন কলার আড়তে বিষাক্ত কেমিক্যালের মাধ্যমে কলা পাকানো হচ্ছে।
কক্সবাজার শহরের কস্তুরাঘাটে সারি সারি আড়তগুলোতে গিয়ে দেখা যাবে, মোটা পলিথিনে ঢেকে রাখা কলার স্তূপে আগুন জ্বালিয়ে তাপ দেওয়া হচ্ছে। ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন শ্রমিক জানান, পোড়ানোর আগে কাঁচা কলার ছড়া রাইপেন বা ক্যালসিয়াম কার্বাইড-মিশ্রিত পানিতে ডোবানো হয়। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কলা পাকানো হয়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কলা পাকাতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। গাজীপুরের টঙ্গীতেও বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে কলা। চাহিদা থাকায় অসাধু আড়তদাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। টঙ্গীর খাঁপাড়া রোডের শরীফ কলার আড়ৎ ও চেরাগ আলী আড়তে বিষাক্ত কেমিক্যালের মাধ্যমে কলা পাকানো হচ্ছে।
ঢাকায়ও এই চিত্র নিয়মিতই চোখে পড়ে। সদরঘাট এলাকা, কারওয়ান বাজার, তেজতুরী বাজার ও যাত্রাবাড়ীতেও এমন দৃশ্য চোখের সামনেই দেখা যায়।
জানা গেছে, কাঁচা কলা অন্ধকার বদ্ধ ঘরে স্তূপ করে রাখা হয়। এরপর সেই স্তূপের ওপর রাসায়নিক মেশানো পানি ছিটিয়ে ত্রিপল বা মোটা চট দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়, যাতে বাতাস ঢুকতে না পারে। এতে এক রাতের মধ্যেই কলায় হলুদ রঙ চলে আসে।
কাঁচা কলা দ্রুত পাকাতে ও চকচকে হলুদ করতে পোকা মারার কীটনাশক ডিডিটিও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই নিষিদ্ধ কীটনাশক খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে এসিডিটি, বিপাকক্রিয়া এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন পরিবহনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি কলার আড়তে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে বাদামতলী, কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ীতে ইথোফেন ও রাইপেন দিয়ে ফল পাকানোর প্রমাণ পেয়েছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর।
কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খায়রুজ্জামান বলছেন, বিষাক্ত দাহ্য পদার্থ মেশানো কলা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া লিভার ও কিডনির ওপরও প্রভাব পড়ে। এসব খাদ্য গ্রহণের পর তা দাহ্যে পরিণত হওয়ার পর নিঃসরণ ঘটে লিভার ও কিডনির মাধ্যমে। ফলে কেমিক্যাল মেশানো খাদ্য শরীরের এই দুটি অংশের ওপর প্রভাব ফেললেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিডনিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একই কথা বলছেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তার ভাষ্য, কলায় ব্যবহৃত কপার সালফেট পেন্টাহাইড্রেট, প্রোমেটসহ অন্যান্য যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, সেগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব কেমিক্যাল মানবদেহে প্রবেশ করলে লিভার, কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত কলা খেলে অন্ত্র ও খাদ্যনালির ক্যানসার হতে পারে।
এ বিষয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দেশের একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী, মুনাফালোভী ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে ফল পাকিয়ে ফলের খাদ্যমান বিনষ্ট করছে। হরহামেশা ক্যালসিয়াম কার্বাইডসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে আম, কলা, কাঁঠাল, আনারসসহ অন্যান্য আকর্ষণীয় ফল পাকানো হচ্ছে। এতে ক্রেতাসাধারণ ও ভোক্তারা প্রতারিত হয়ে আর্থিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কেমিক্যাল মিশ্রিত ফল খেলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে বদহজম, পেটের পীড়া, পাতলা পায়খানা, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যানসারের মতো জটিল রোগ হতে পারে। এ ছাড়া নারীরা এর প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারেন। শিশুরা বিষাক্ত পদার্থের বিষক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।






