ব্লাড ক্যানসার সচেতনতা মাস
লিম্ফোমা চিকিৎসা ও আমাদের করণীয়

ল্যাবে মাইক্রোস্কোপে ক্যানসারের সেল পরীক্ষা করছেন লেখিকা
বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি যে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হোন তা হলো লিম্ফোমা। এই রোগ নিয়ে লিখেছেন ডা. ইসমত আরা ইসলাম
রক্ত কিংবা অস্থিমজ্জার কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকে সহজ কথায় ব্লাড ক্যানসার বা রক্তের ক্যানসার বলা হয়। ব্লাড ক্যানসার মূলত তিন ধরনের— লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ও মাল্টিপল মায়লোমা। প্রতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব লিম্ফোমা সচেতনতা দিবস’। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে পালিত হয় ‘ব্লাড ক্যানসার সচেতনতা মাস’।
লিম্ফোমা মূলত এমন একধরনের ক্যানসার, যা আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার শ্বেত রক্তকণিকা বা লিম্ফোসাইটে দেখা দেয়। ডিএনএতে মিউটেশন বা ত্রুটির কারণে কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করলে এই রোগ হয়।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি অনুযায়ী লিম্ফোমার চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অধীন ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার’ (আইএআরসি) এবং GLOBOCAN-এর রেজিস্ট্রি তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে ক্যানসারে আক্রান্তের তালিকায় নন-হজকিন্স লিম্ফোমা (NHL) ১১তম স্থানে রয়েছে (মোট ক্যানসারের প্রায় ৩%)। প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নন-হজকিন্স এবং ৮৫ হাজার মানুষ হজকিন্স লিম্ফোমায় (HL) নতুন করে আক্রান্ত হন।
বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NICRH) এবং বিশেষায়িত কেন্দ্রগুলোর হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে:
- দেশে হেমাটোলজিক্যাল বা রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে লিম্ফোমার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি (মোট ক্যানসার রোগীর প্রায় ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ)।
- শনাক্ত হওয়া লিম্ফোমার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নন-হজকিন্স এবং ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হজকিন্স লিম্ফোমা। নারীর তুলনায় পুরুষরা এতে তুলনামূলক বেশি আক্রান্ত হন।
- জাতীয় তথ্যে দেখা যায়, অসচেতনতা ও প্যাথলজিক্যাল ঘাটতির কারণে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে হাসপাতালে যান, যা চিকিৎসাকে জটিল করে তোলে।
লিম্ফোমা হওয়ার প্রধান কারণ ও ঝুঁকি
দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা: শরীরে রোগপ্রতিরোধ করার ক্ষমতা কমে গেলে, যেমন— এইচআইভি সংক্রমণ হলে কিংবা শরীরের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমানোর ওষুধ খেলে এই ঝুঁকি বাড়ে।
কিছু নির্দিষ্ট সংক্রমণ: এপস্টেইন-বার ভাইরাস (EBV) অথবা পেটের ইনফেকশনের জন্য দায়ী এইচ. পাইলোরি (H. pylori) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দীর্ঘকাল ধরে শরীরে থাকলে।
বিষাক্ত পরিবেশ ও রাসায়নিক: কৃষি বা কারখানায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর কীটনাশক, বেঞ্জিন বা তেজস্ক্রিয় পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শে এলে।
বয়স ও জিনগত কারণ: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে ‘নন-হজকিন্স লিম্ফোমা’-তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
প্রধান লক্ষণ
লিম্ফোমার লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ভাইরাসের মতো মনে হতে পারে, যার ফলে অনেকে শুরুতেই ভুল করেন। এ ছাড়া-
- ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে বিনা ব্যথায় মার্বেলের মতো মাংসপিণ্ড বড় হওয়া
- অনবরত জ্বর আসা এবং রাতে শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া
- খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ছাড়াই শরীরের ১০ শতাংশ বা তার বেশি ওজন কমা এবং অবসন্ন লাগা
- সারা শরীরে অস্বাভাবিক চুলকানি বা বুকে চাপ লাগা
চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিকার
লিম্ফোমা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু নয়। প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক নির্ণয় হলে অন্যান্য ক্যানসারের তুলনায় লিম্ফোমা চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বায়োপসি, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, বোন ম্যারো টেস্ট ও পেট স্ক্যানের মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর, যথাযথ স্টেজিং ও শারীরিক সক্ষমতা নির্ণয়ের পর আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেমন-
- কেমোথেরাপি: প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ক্যানসার কোষ ধ্বংসের ওষুধ ব্যবহার।
- ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি: নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি দিয়ে শুধু ক্যানসার কোষকে আক্রমণ করা, যাতে সাধারণ কোষের ক্ষতি কম হয়।
- রেডিওথেরাপি: টিউমারের আকার ছোট করতে তেজস্ক্রিয় রশ্মির ব্যবহার।
- অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (BMT): জটিল বা পুনরায় ফিরে আসা রোগের ক্ষেত্রে সুস্থ অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন।
আমাদের করণীয় ও সচেতনতা
- বিশ্ব লিম্ফোমা দিবসের থিম মেনে লিম্ফোমা রোগী ও পরিবারকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া নিশ্চিত করা।
- লিম্ফোমা ছোঁয়াচে নয় এবং সঠিক চিকিৎসায় এটি ভালো হয়— এই সত্য প্রচার করা।
- শরীরের যেকোনো ব্যথাহীন ফোলাকে অবহেলা না করে দ্রুত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
- জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রাথমিক বায়োপসি ও রক্তের পরীক্ষার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
লিম্ফোমা মোকাবিলায় ভয় না পেয়ে সচেতনতা তৈরি ও প্রাথমিক পর্যায়ে যত দ্রুত সম্ভব রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ বা হেমাটোলজিস্টের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা শুরু করাই হতে পারে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার।
লেখক: রেজিস্ট্রার, রক্তরোগ ও রক্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।




