‘হুমায়ূন স্যার প্রচণ্ড রেগে আমাকে শুটিং থেকে বের করে দিলেন’

অভিনেতা এজাজুল হক এজাজ
হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ ডা. এজাজুল ইসলাম। গুণী নির্মাতার হাত ধরে যে কটি চরিত্র বেশ জনপ্রিয় হয়, তাদের মধ্যে একজন ডা. এজাজ। এই এজাজকেই একবার হুমায়ূন আহমেদ প্রচণ্ড রেগে শুটিং সেট থেকে বের করে দেন। পরে অবশ্য এ ঘটনায় হুমায়ূন আহমেদ ও ডা. এজাজ—দুজনই চোখের জল ফেলেছিলেন।
আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে সে কথাই স্মরণ করলেন অভিনেতা। এজাজ বললেন, ‘‘তখন নুহাশপল্লীর পাশে একটা নদীতে শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রের শুটিং চলছিল। শুটিং চলাকালীন খাবারের বিরতির পর স্যার (হুমায়ূন আহমেদ) আমাকে ডাকলেন। দেখলাম, স্যার প্রচণ্ড রেগে আছেন। আমাকে বললেন, ‘ডাক্তার, তুমি এখান থেকে এখনই চলে যাও।’ আমি অবাক হয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম না, কী ঘটনা ঘটেছে। স্যার এতোটাই রেগে ছিলেন, আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী করব। পরে আমি স্যারের রাগের ধরন দেখেই চলে এলাম।’’
স্যার, নাটকের তো শুটিং শুরু হবে। ডাক্তারের পার্ট আছে, উনি কি আসবেন?’ স্যার তখন অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন আসবেন না?
বাসায় চলে আসার পরে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকলেন অভিনেতা এজাজ। তিনি ভাবতে লাগলেন, তার চলে আসাটা ঠিক হয়েছে কি না। ডা. এজাজ বললেন, ‘‘আমি বাসায় এসে বুঝলাম, স্যার রেগে গেছেন। কিন্তু আমার আসাটাও মনে হয় ঠিক হয়নি। সহকারী পরিচালক শামীমার সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে বললাম যে, ‘স্যার রাগ করে আমাকে চলে যেতে বলেছেন, তাই আমি চলে এসেছি। আমি বুঝতে পারছি না, এটা ঠিক হয়েছে কি না। শামীমা তখন বললেন, ‘আপনি আপাতত চলে যান, আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলব।’ এরপর ‘মিতু তোমাকে ভালোবাসি’ নাটকের শুটিং শুরু হবে। তখন শামীমা স্যারকে বললেন, ‘স্যার, নাটকের তো শুটিং শুরু হবে। ডাক্তারের পার্ট আছে, উনি কি আসবেন?’ স্যার তখন অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন আসবেন না?’’
এরপর স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমিও স্যারকে জড়িয়ে ধরলাম। স্যার কাঁদছেন, আমি কাঁদছি। দুজনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে
এরপর এজাজ শুটিংয়ে অংশ নিলেন। পুরো শুটিং শেষ করলেন। সেই ঘটনার বিবরণ দিলেন এভাবে, ‘‘আমি শুটিং করছি খুবই স্বাভাবিকভাবে। দুদিন ধরে শুটিং হলো। শুটিং শেষ হওয়ার পরে স্যার বললেন, ‘সবাই বসো। সবার সঙ্গে কথা বলব।’ আমি তখন ভয় পেয়ে গেলাম। স্যার কি আবারও আমাকে বকবেন? কিন্তু স্যার আমাকে ডেকে নিলেন। আমাকে বকলেন, হ্যাঁ বকলেন। তবে এই বকা হলো কেন চলে গিয়েছি, সে জন্য। স্যার বললেন, ‘ডাক্তার, আমি রাগ করে বললেই কি তুমি চলে যাবে? তুমি আমাকে চেনো না?’ এরপর স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমিও স্যারকে জড়িয়ে ধরলাম। স্যার কাঁদছেন, আমি কাঁদছি। দুজনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি স্যারের পায়ের কাছে যেতে চাইছিলাম, তিনি আরও জড়িয়ে ধরলেন। যেতে দিলেন না।’’
এজাজের ভাষ্য, রাগ করা তারই সাজে, সোহাগ যে করে। কেন রাগ করেছিলেন হুমায়ূন? সেটা বলতে গিয়ে এজাজ আহমেদ বললেন, ‘একটা পাঙ্গাস মাছের কারণে রাগ করেছিলেন। এজাজ বর্ণনা দিলেন এভাবেই, ‘আমার ওপর দায়িত্ব ছিল বাজার থেকে মাছ কিনে আনার। আমি মাছ কিনে এনেছি। তখন চাষের মাছ পাওয়া যেত না। নদীর একটা বড় পাঙ্গাস মাছ কিনে আনলাম। খুবই ভালো রান্না হয়েছে। সবাই খাচ্ছি বেশ আনন্দ নিয়ে। একজন সে সময় বলে উঠলেন, ‘এত তেল?’ এই কথা স্যারের কানে গেল। স্যার বাবুর্চিকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেন তেল দেওয়া হয়েছে। বাবুর্চি জানালেন, পাঙ্গাস মাছে তেল দিতে হয় না। এই মাছে এমনিতেই তেল বেশি থাকে। এ কারণেই স্যার রেগে গেলেন।’’
আজ এসব মনে পড়ছে। আমি তিনটা বই লিখেছি। কিন্তু কোনো বইয়ে এই ঘটনা উল্লেখ করিনি। আমার মনেও ছিল না। আগামীর সময়ের প্রশ্নেই আমার এসব কথা মনে পড়ল
হুমায়ূন আহমেদ সবচেয়ে বেশি রেগেছেন যে ব্যক্তির ওপর, তিনি হলেন ডা. এজাজ। এজাজ বললেন, ‘শুটিং সেটে হুমায়ূন স্যার সবচেয়ে বেশি রাগ করতেন সম্ভবত আমার ওপর। আমার মনে হয়, আমার চেয়ে বেশি কারও ওপর রাগ করতেন না। এটাকে আমি রাগ বলি না, বলি শাসন। তবে আমাকেই আবার খুবই সোহাগ করতেন। আজ এসব মনে পড়ছে। আমি তিনটা বই লিখেছি। কিন্তু কোনো বইয়ে এই ঘটনা উল্লেখ করিনি। আমার মনেও ছিল না। আগামীর সময়ের প্রশ্নেই আমার এসব কথা মনে পড়ল।’




