স্ত্রীর বায়নায় কুমির হয়েছিলেন ‘নদের চাঁদ’

ছবি : এআই
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার পশ্চিম সীমান্ত ছুঁয়ে বয়ে চলেছে মধুমতি নদী। এই নদীর একটি ঘাটের নাম নদের চাঁদ।
নদের চাঁদ ছিলেন জাদুবিদ্যায় পারদর্শী। ভারতের কামরূপ-কামাখ্যায় দীর্ঘ ১০ বছর সাধনা করে তিনি অর্জন করেছিলেন মানুষ থেকে কুমিরে রূপান্তরিত হওয়ার দুর্লভ জাদুবিদ্যা।
তার মানুষ থেকে কুমির হয়ে যাওয়ার করুণ ও রোমাঞ্চকর লোককাহিনী শত বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে। তার এই ট্র্যাজিক জীবনকাহিনী নিয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে বহু যাত্রাপালা, নাটক ও সিনেমা।
বহু বছর আগের কথা। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার পাঁচুড়িয়া গ্রামে অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন ‘নদের চাঁদ’। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন তার বাবা। ‘নদের চাঁদের’ জন্মের আগেই বাবা গদাধর পদ্মা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে মারা যান।
স্বামীহীন একমাত্র সন্তানকে বুকে নিয়ে দিন কাটে মায়ের। নদের চাঁদ একসময় যৌবনে পা রাখেন। মা চান না বাবার মতো মাছ ধরতে নদীতে যাক ছেলে। তার চাওয়া ছেলে বিয়ে করে সংসারী হোক, ক্ষেতখামারে কাজ করুক। কিন্তু সংসার বিবাগী নদের চাঁদের ঘরে মন বসে না। গভীর রাতে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়েন অজানায়। ১০ বছর পর যখন বাড়ি ফেরেন ততদিনে মা বৃদ্ধা।
এবার মা তাকে বিয়ে দিলেন। স্ত্রীর ভালোবাসা ঘরে আটকে রাখল চাঁদকে। এভাবে সুখ আর আনন্দে দিন কেটে যাচ্ছিল।
একদিন নিজের দীর্ঘ ১০ বছর অন্তর্ধানের রহস্য খুলে বলেন স্ত্রী সরলার কাছে। ১০ বছর কামরূপ-কামাখ্যায় (আসাম) ছিলেন। সেখানে এক নারীর কাছে জাদুবিদ্যা শিখেছেন। এই জাদুর বলে তিনি কুমির হতে পারেন। এ কথা শুনে স্ত্রী সরলার মনে শখ জাগে; স্বামীকে কুমির হতে দেখবেন। তিনি ধরলেন বায়না।
স্ত্রীর শখ পূরণের জন্য গভীর রাতে দুটি পাত্রের পানিতে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন চাঁদ। এরপর স্ত্রী সরলাকে বলেন, একটি পাত্রের পানি তাঁর গায়ে ছিটিয়ে দিলে তিনি কুমিরে রুপান্তরিত হবেন, অন্য পাত্রের পানি ছিটালে আবার মানুষ হয়ে ফিরবেন।
কথামতো স্ত্রী সরলা একটি পাত্রের পানি তার শরীরে ছিটালে কুমির হয়ে যায় নদের চাঁদ। কিন্তু স্বামীকে কুমির হতে দেখে ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে দৌঁড় দেন সরলা। এ সময় তার পায়ের ধাক্কায় অন্য পাত্রের পানি মাটিতে পড়ে যায়।
চাঁদের কুমির হওয়ার বিষয়টি শাশুড়িকে জানান পুত্রবধূ। মা এসে দেখেন কুমির হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছেন চাঁদ। স্ত্রী সরলার দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলেন তিনি। ঘটনার তিনদিন পর কুমির ‘নদের চাঁদ’ নেমে পড়লেন মধুমতির পানিতে। প্রতিদিন মা নদীর ঘাটে বসে চোখের জল ফেলেন।
কয়েকদিন পর কামরূপ-কামাখ্যা থেকে চাঁদের নারী উস্তাদকে খবর দিয়ে আনা হলো। তিনি মধুমতি নদীর পাড়ে এসে নদের চাঁদ বলে ডাক দিলেন। তখন মুখে ইলিশ মাছ নিয়ে ডাঙায় উঠেন চাঁদ। এ অবস্থা দেখে নারী উস্তাদ জানিয়ে দিলেন, নদের চাঁদকে আর মানুষ রূপে ফেরানো যাবে না। কারণ ইতোমধ্যে তিনি নদীর মাছ আহার করে ফেলেছেন।
এরপর মা ডাকলেই নদের চাঁদ ঘাটে চলে আসতেন। মায়ের হাতের খাবার খেয়ে আবার নদীতে ফিরে যেতেন। কিছুদিন পর নদী দিয়ে একদল বণিক জাহাজযোগে যাওয়ার সময় চরে বিরাট একটি কুমির দেখতে পান। তারা কুমিরটিকে মেরে ফেলেন। পরে জানাজানি হলে লোকজন মৃত কুমিরটি উদ্ধার করে সনাতন রীতি অনুযায়ী সৎকার করেন।
স্ত্রীর শখ পূরণে নদের চাঁদের কুমির হওয়ার বেদনাবিধূর ঘটনাটি আজও বোয়ালমারী তথা আশপাশের উপজেলার মানুষের মুখে মুখে ভেসে বেড়ায়। বোয়ালমারী উপজেলা গুনবহা ইউনিয়নে অবস্থিত নদের চাঁদ ঘাটটি এর জন্যই সবার কাছে পরিচিত।
একসময় মধুমতি নদীর এই ঘাটে নিয়মিত স্টিমার ভিড়ত। ঘাটের পাশেই ‘নদের চাঁদ’ নামে একটি গ্রাম রয়েছে। ‘নদের চাঁদ’ বাজার, ‘নদের চাঁদ’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ‘নদের চাঁদ’ পি সি দাস একাডেমি নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এমন কাহিনীর জন্য দূর-দুরন্ত থেকে অনেক মানুষ ছুটে আসেন ‘নদের চাঁদ ঘাট’ দেখতে।



