প্রেমে-বিপ্লবে চে গুয়েভারা

একটি রণাঙ্গন কি ভালোবাসার জন্মকে আটকে দিতে পারে? নির্মম যুদ্ধ কি দূরে সরিয়ে দিতে পারে প্রেমের বিস্তার? পারে না বোধ হয়। আর তাই এলিয়েদা মার্চ আর চে গুয়েভারা একে-অপরের হৃদয়ের কাছে এসেছিলেন কিউবা যুদ্ধের দিনগুলোতে। চে গুয়েভারার জন্ম আর্জেন্টিনায় ১৯২৮ সালের ১৪ জুন। আজও পৃথিবীতে আলোচিত এই মার্ক্সবাদী গেরিলা যোদ্ধা তার ৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে পা রাখলেন। তাদের প্রথম দেখা ১৯৫৮ সালের নভেম্বর মাসের এক তীব্র শীতের রাতে।
চে তখন কিউবার এসকামবারি পাহাড়ে তার অধীনে থাকা গেরিলা বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছেন। চলছে কিউবার মুক্তিসংগ্রাম। এলিয়েদা গেরিলা বাহিনীর জন্য টাকার বড় একটি চালান পৌঁছে দিতে সেই পাহাড়ে গিয়েছিলেন। স্কুলশিক্ষিকা এলিয়েদা কিউবার সান্তা ক্লারা শহরে গেরিলাদের গোপন কার্যক্রমের সঙ্গে আগে থেকেই জড়িত ছিলেন। সেবারই প্রথম তাকে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে পাহাড়ে পাঠানো হয়। কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তার সেনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে, বহুপথ ঘুরে এলিয়েদা ঠিকই পৌঁছে যান পাহাড়ে। কৌশলে সেনাদের দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পারলেও ভালোবাসার দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পারেননি তিনি। প্রথম দর্শনেই পাহাড়ের গোপন ঘাঁটিতে বসে থাকা কমান্ডার চে গুয়েভারাকে দেখে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট? অনেকটা তাই। চে গুয়েভারার মৃত্যুর ৪৫ বছর পর ২০১২ সালে প্রকাশিত তার স্মৃতিকাহিনি ‘রিমেমবারিং চে’ বইয়ে এভাবেই তাদের প্রেমপর্বের বিবরণ দিয়েছেন তিনি। চে গুয়েভারাও প্রথম দর্শনেই এলিয়েদার প্রেমে পড়েছিলেন। আট বছর পর কঙ্গোর মুক্তিসংগ্রামে যুদ্ধরত চে এক চিঠিতে এলিয়েদাকে সেসব কথা জানিয়েছিলেন।
প্রথম দর্শনের আগে এলিয়েদার কাছে চে গুয়েভারা ছিলেন বহুল আলোচিত এক গেরিলা যোদ্ধা। কিউবার গোপন বিপ্লবী রেডিওতে প্রতিদিন এলিয়েদা বিভিন্ন যুদ্ধে তার সাফল্যের কাহিনি শুনতেন। কিন্তু পাহাড়ের ঘাঁটিতে চে-কে কাছ থেকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এলিয়েদা। সে মুগ্ধতার জেরে তিনি থেকে যেতে চেয়েছিলেন গেরিলা দলের সঙ্গে; কিন্তু চে রাজি হননি। পরে তিনি জানতে পেরেছিলেন চে তাকে একটি ডানপন্থী দলের গুপ্তচর ভেবে সন্দেহ করেছিলেন। ফলে সমতলে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না তার সামনে।
কিন্তু ভালোবাসা তো আকস্মিকের খেলা। রণাঙ্গন অথবা যুদ্ধ তাকে আটকে রাখতে পারে না। কিছুদিন পর আল পাদেরেরো শহরে আবারও দেখা হয়ে যায় দুজনের। সেই মুক্তাঞ্চলের রাস্তার পাশে আচমকা দেখা হয়ে যায় তাদের আবার। এলিয়েদা রাস্তার পাশে তার ব্যাগ নিয়ে বসে ছিলেন। হঠাৎ চে গুয়েভারাকে বহন করা একটি জিপ এসে থামে তার পাশে। চে তাকে জিপে উঠে বসার আহ্বান জানান। এলিয়েদা দেরি করেননি এক মুহূর্তও। তার ভাষায়, ‘সেই জিপ থেকে এক জীবনে আর নামতে পারিনি আমি।’
এলিয়েদা তার বইয়ে লিখেছেন, এক যুদ্ধের ঝড় যেমন তাদের উড়িয়ে হৃদয়ের কাছে নিয়ে এসেছিল, তেমনি সেই ঝড় তাকে অনেক কিছু শিখিয়েওছিল। যুদ্ধের মাঠে ফুটেছিল ভালোবাসার তারাফুল। চে গুয়েভারা তার একটি লেখায় লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, একজন বিপ্লবী সবসময় ভালোবাসার অনুভূতিতে পরিচালিত হয়। একজন প্রকৃত বিপ্লবী কখনোই প্রেম থেকে দূরে থাকতে পারে না।’


