গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি
- প্রশাসনিক ও গবেষণাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব
- আটকে আছে জরুরি কেনাকাটা
- কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা
- ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)। কৃষি গবেষণার অন্যতম প্রধান এই প্রতিষ্ঠানে মহাপরিচালকসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে শূন্য। এ অবস্থায় গবেষণা, প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা।
বিএআরআই সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালকের পদ রয়েছে সাতটি। এর মধ্যে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি অবসরজনিত কারণে শূন্য হয়ে যায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। এসব পদের মধ্যে রয়েছে গবেষণা উইং, পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন উইং, সেবা ও সরবরাহ উইং এবং কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক। এরপর ২৭ মে অবসরে যান প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. আতাউর রহমান। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদটিও শূন্য হয়ে পড়ে।
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় স্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় বিভিন্ন প্রশাসনিক ও গবেষণাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিলম্বে।
এক কর্মকর্তা বললেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না সময়মতো। ফলে গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়নেও তৈরি হয়েছে ধীরগতি।’
বিজ্ঞানীদের মতে, কৃষি গবেষণা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। গবেষণা, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা, সম্প্রসারণ এবং কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিটি ধাপে সময়মতো সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়। শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলো দীর্ঘদিন খালি থাকলে ঝুঁকি থাকে পুরো প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার।
বিএআরআইয়ের হিসাব শাখা বলছে, মহাপরিচালকের পদ শূন্য থাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিল পরিশোধে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
ওই শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কয়েকটি চলমান প্রকল্পের ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অভাবে। একই সঙ্গে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও হচ্ছে বিলম্ব।
তার ভাষায়, ‘অনেক ক্ষেত্রে আটকে আছে জরুরি কেনাকাটাও। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্থবিরতা।’
এদিকে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে কৃষি গবেষণা অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানী অভিযোগ করেছেন, জ্যেষ্ঠ ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটি পক্ষ তৎপর।
তাদের আশঙ্কা, জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সৃষ্টি হতে পারে অসন্তোষ।
বিএআরআইয়ের কয়েকজন বিজ্ঞানীর দাবি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পরিচালক ড. মো. ছাইফুল্লাহ সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় আলোচনায় রয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ড. ছাইফুল্লাহ ১৯৯৫ সালে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৯৭ সালে আবার পরীক্ষার মাধ্যমে একই পদে রাজস্ব খাতে যোগ দেন।
তাদের দাবি, তার সঙ্গে যোগদানকারী অনেক কর্মকর্তা এখনো প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে কর্মরত থাকলেও তিনি তুলনামূলক দ্রুত উচ্চপদে উন্নীত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ড. মো. ছাইফুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে যে প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।’
তিনি দাবি করেন, ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনের দায়িত্বও পালন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু স্থিরচিত্র প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, চাকরি জীবনে বিভিন্ন সময়ে পরিস্থিতির কারণে অংশ নিতে হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচিতে।
‘চাকরি টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনেই অনেক কিছু করতে হয়েছে’— বলেন তিনি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, গবেষণাগারে উদ্ভাবিত নতুন জাত, প্রযুক্তি কিংবা চাষাবাদ পদ্ধতি সময়মতো কৃষকের কাছে পৌঁছাতে না পারলে ব্যাহত হয় গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।
এক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেছেন, ‘গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষকের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সিদ্ধান্ত না হলে সেই সমন্বয়ে তৈরি হয় ঘাটতি।’
তার মতে, এর ফলে শুধু গবেষণা কার্যক্রম নয়, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিএআরআইয়ের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে সরকারের।
তাদের ভাষ্য, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনা করেই শেষ করা হবে নিয়োগ প্রক্রিয়া। তবে কবে নাগাদ নিয়োগ সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেননি।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিএআরআই পালন করে আসছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির গবেষণার ওপর নির্ভরশীল দেশের লাখো কৃষক। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পাঁচটি পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা শুধু প্রশাসনিক সংকট নয়, বরং দেশের কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ গতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, দ্রুত নেতৃত্ব সংকট নিরসন না হলে গবেষণা কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কৃষকের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হতে পারে আরও বাধাগ্রস্ত।


