খেলাপি-দুর্নীতিবাজদের পথ বন্ধ
- রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের এমডি নিয়োগে নীতিমালা জারি

ঋণখেলাপি, করখেলাপি, জালিয়াতি, দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি লঙ্ঘনের অভিযুক্তরা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ পাবেন না। এমনকি আদালতের বিরূপ পর্যবেক্ষণ, দেউলিয়া ঘোষণা, চাকরি থেকে অপসারণের মতো নেতিবাচক রেকর্ড থাকলেও সেই ব্যক্তির জন্য ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। উল্লিখিত কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করে নীতিমালা জারি করেছে সরকার। এর নাম ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন/নিয়োগ/পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা, ২০২৬’। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ২৬ জুলাই এটি জারি করেছে।
এ নিয়ে তিন বছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান তিনবার এমন নীতিমালা জারি করেছে। ২০২৩ সালের পর এ বছরের ১৮ জানুয়ারি ছিল সর্বশেষ নীতিমালা। নতুন নীতিমালা জারির পর আগেরগুলো বাতিল করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী সোনালী, জনতাসহ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য শুধু মনোনয়ন দেবে সরকার। নিয়োগ দেবে মূলত ব্যাংকগুলোর পর্ষদ। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হবে। কৃষি ব্যাংক, রাকাবসহ ছয় বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) এমডিদের অবশ্য সরকারই নিয়োগ দেবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানেরই উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি, পদায়ন এবং আন্তঃবদলি করবে সরকার।
যোগ্যতা হিসেবে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রার্থীর ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে জ্ঞান এবং নির্ভেজাল পেশাগত সুনাম বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান, পরিচালক, এমডি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অপসারণ, বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অব্যাহতির রেকর্ড থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এমডির জন্য বিবেচিত হবেন না। এ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে বা অবসায়িত হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকাও প্রার্থীর জন্য নেতিবাচক বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকতে পারবে না এবং দায়িত্ব পালনকালে অন্য কোনো ব্যবসা বা পেশায় নিয়োজিত থাকার সুযোগও থাকবে না।
নতুন নীতিমালায় গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনও বাধ্যতামূলক যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ কাঠামো কার্যকর হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যে কারণে পদোন্নতি আটকে যাবে
কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে। তদন্তাধীন গুরুতর অভিযোগ, আদালতে বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ মামলা কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষেধাজ্ঞাও পদোন্নতির পথে বাধা হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়া, অর্থ পাচারবিরোধী বিধি লঙ্ঘন বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে ব্যর্থতার মতো বিষয়ও মূল্যায়নে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে।
যেসব যোগ্যতা লাগবে
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় বাণিজ্যিকের এমডি হতে গেলে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা হবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা অথবা ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না। বয়স হবে সর্বনিম্ন ৪৫ বছর ও সর্বোচ্চ ৬৫ বছর। আর চুক্তি হবে তিন বছরের।
নেতৃত্ব ও কর্মদক্ষতায় গুরুত্ব
নীতিমালায় বলা হয়েছে, শুধু অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা নয়; নেতৃত্বের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে অবদানও বিবেচনায় নেওয়া হবে। ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, আমানত সংগ্রহ, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা মূল্যায়নের সময় গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ শাখা, করপোরেট শাখা, প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, নিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ প্রশাসন, বৈদেশিক বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়নের অংশ করা হয়েছে।
১০০ নম্বরের মূল্যায়ন
পদোন্নতির জন্য মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়নপদ্ধতি চালু করা হয়েছে। প্রতিটি সূচকের জন্য আলাদা নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে মূল্যায়নপ্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। সবচেয়ে বেশি ৪০ নম্বর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর)। এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতায় ১৫, চাকরির অভিজ্ঞতায় ১৫, চাকরির রেকর্ডে ১০, ব্যাংকিং প্রফেশনাল পরীক্ষায় ৫ এবং সাক্ষাৎকারে ১০ নম্বর।




