৬০ মায়ের ‘সন্তান’ সাখাওয়াত

আশ্রমের বাসিন্দা এক বৃদ্ধার সঙ্গে সাখাওয়াত। ছবি: আগামীর সময়
বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে দেখা মিলবে ৬০ অসহায় বৃদ্ধ মায়ের, যাদের আপনজন কেউ নেই, কিন্তু আছেন একজন ‘সন্তান’। তিনি সাখাওয়াত হোসেন। পথে পথে মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা জোগাড় করে এই বৃদ্ধাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। ভিক্ষা করতে গিয়ে শিকার হয়েছেন পিটুনির, যেতে হয়েছে জেলে। কিন্তু তিনি মানুষের জন্য কাজ করতে হননি পিছপা। ১১ বছর ধরে চলছে তার এ লড়াই।
বৃদ্ধাশ্রম গড়ার চিন্তা: সাখাওয়াতরা পাঁচ ভাইবোন। তিনি ঢাকায় চাকরি করতেন। মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে দেখেছেন তিন বড় ভাই কীভাবে অমানুষিক নির্যাতন চালাতেন মা-বাবার ওপর। ওই সময় মা-বাবাকে ভালো রাখার যে প্রতিজ্ঞা তিনি করেছিলেন, আজ তা ছড়িয়ে আছে ৬০ অসহায় বৃদ্ধ নারীর মধ্যে।
২০০৫ সালে সাখাওয়াত ঢাকার মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিসে সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন। ওই সাল থেকে একই পদে কাজ করেন বিএএফ শাহীন কলেজ, সেগুনবাগিচা হাই স্কুল, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুল এবং সবশেষ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউবিটি)। ২০১৫ সালে চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন নিজ বাড়ি বাকেরগঞ্জের আউলিয়াপুর গ্রামে। মা-বাবাকে নিয়ে ওই গ্রামে চালু করেন বৃদ্ধাশ্রম। বরিশাল নগরে বৃদ্ধাশ্রম স্থানান্তর করেন ২০১৯ সালে। নগরীর কাউনিয়া এলাকার পাঁচটি ভবনে চলছে এই বৃদ্ধাশ্রমের কার্যক্রম।
১৩ কর্মচারী আছেন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের দেখভালে। রয়েছেন একজন নার্স ও একজন থেরাপিস্ট। বাসিন্দাদের দেওয়া হয় তিনবেলা খাবার। ঈদ, পূজা ও পয়লা বৈশাখে থাকে নানা অনুষ্ঠান। সাখাওয়াতের (৫২) বাবা ইস্কান্দার আলী খলিফাও থাকেন এ বৃদ্ধাশ্রমে। আর মা ২০২২ সালে মারা গেছেন এখানেই। বৃদ্ধাশ্রমে আছে দুই শিশুও। ৯ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধীকে এখানে রেখে গেছেন তার দাদি। অন্য শিশুটির এখানে থাকার পাশাপাশি সুযোগ হয়েছে পড়াশোনার। ৬০ বৃদ্ধার মধ্যে পাঁচজন অন্ধ। শারীরিক প্রতিবন্ধী ১০ জনের চিকিৎসা চলে নিয়মিত। অনেক সময় মন পরিবর্তন হলে পরিবারের সদস্যরা বৃদ্ধ মায়েদের ফিরিয়ে নেন ঘরে। সাখাওয়াতের কথায়, ‘চাকরি করলে হয়তো আজ নিজের পরিবার নিয়ে খুব সুখে থাকতাম; কিন্তু এই মায়েদের মুখে যখন খাবার তুলে দিই, তখন যে শান্তি পাই, তা টাকায় কেনা সম্ভব নয়। আমার মা মারা গেছেন। এখন এরাই আমার মা। এখানে যারা বৃদ্ধা রয়েছেন, তারা আমাকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন’— যোগ করেন তিনি।
বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনায় প্রতি মাসে লাগে অন্তত ৫ লাখ টাকা। এখানে অর্থসাহায্য আসে খুবই কম। পরিচয় গোপন রেখে কিছু মানুষ প্রতি মাসে চাল-ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য কিনে দেন। প্রথমদিকে চাকরিকালে জমানো টাকা দিয়েই বৃদ্ধাশ্রম চালাতেন সাখাওয়াত, পরে চালিয়েছেন ভিক্ষার টাকায়। একটি বাক্স নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পার্কে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে চেয়ে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে চালিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রম। সাখাওয়াতের স্ত্রী ঢাকায় আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কর্মচারী। মেয়ে পড়ছেন রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কলেজে ও ছেলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সাখাওয়াতের মেয়ে ফারজানা আক্তার বললেন, ‘মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসি। এখানে আমার অনেক দাদু-নানু আছেন। তারা আমাকে দেখলে জড়িয়ে ধরেন, খুব ভালোবাসেন আমাকে।’ ‘বেড়াতে এসে বাবার কাজেও সহযোগিতা করি। বাবা আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকলেও এমন মানবিক কাজে নিয়োজিত থাকায় অনেক গর্ববোধ করি’— যোগ করেন ফারজানা।
বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দারা যা বললেন: কুমিল্লার অঞ্জলী রানী দে ও ঢাকার আসমা বেগম বলেছেন, ‘সাখাওয়াত যেভাবে দেখে রাখে, সেভাবে কোনো আপনজনও রাখে না। নিজেদের সন্তানের কথা তো বাদই দিলাম, ওরা তো তাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের যখন যা খেতে ইচ্ছা করে, তাই এনে দেয়। আমরা প্রতিটি রুমে ৯ জন করে থাকি। সব রুমে আমাদের জন্য টিভি লাগিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যায় আনন্দ দেওয়ার জন্য একেক সময় একেক ব্যবস্থা রাখে। নিজেদের বাড়ির কথা মনেও পড়ে না।’


