তিস্তার চর
গরিবের জীবিকায় প্যারাগনের চোখ!
- তিস্তার চরের ১১১৮ একর জমি ইজারা চায় প্যারাগন
- ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী

সংগৃহীত ছবি
নদীভাঙনে প্রতি বছরই ঠিকানা বদলাতে হয় তিস্তার চরের বাসিন্দাদের। শত কষ্টেও নদীপাড়েই পড়ে থাকে তারা। স্বপ্ন দেখে, শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা চরে ফলাবে ফসল, ঘুরবে সংসারের চাকা। তা ছাড়া বিকল্প জায়গায় বসতি গড়বে তেমন সামর্থ্যও নেই তাদের। শুকনো মৌসুমে তারা জেগে ওঠা নিজেদের জমিতে (চর) চাষাবাদ করে যুগের পর যুগ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু সেই জমিতে এবার চোখ পড়েছে প্যারাগন গ্রুপের।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের দুটি মৌজার ১ হাজার ১১৮ দশমিক ৬৭ একর জমি ইজারা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছে প্যারাগন গ্রুপ। সেখানে দুগ্ধ খামার এবং গবাদি পশুর খাদ্য উৎপাদনের জন্য ঘাস ও ভুট্টা চাষ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ খবরে ক্ষোভে ফুঁসছে তিস্তার চরের মানুষ। এরই মধ্যে তারা জমি ইজারা নেওয়ার চক্রান্তের প্রতিবাদে নদীপাড়ে মানববন্ধন করেছে এবং স্মারকলিপি দিয়েছে।
জানা গেছে, প্যারাগন গ্রুপের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান দুগ্ধ খামার ও গবাদি পশুর খাদ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে খাসজমি লিজ চেয়ে গত ৫ মে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন করেন। এতে গঙ্গাচড়ার দুটি মৌজার একটিতে ৪৮২ একর এবং অন্যটিতে ৬৩৬ দশমিক ৬৭ একর খাস কৃষিজমি প্যারাগন অ্যাগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের অনুকূলে ইজারা চেয়ে যথাযথ দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের লোকজন লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ওই দুটি মৌজায় মাপজোখ শুরু করলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে চরবাসী। কৃষিজমি ও বসতভিটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়ার পাঁয়তারা বন্ধ করা এবং জনস্বার্থ রক্ষার দাবিতে তারা গত ৬ জুন নদীপাড়ে মানববন্ধন ও ৮ জুন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকার কৃষিজমি ‘প্যারাগন কোম্পানি’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া একটি আত্মঘাতী উদ্যোগ। প্রস্তাবিত এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছে। এলাকাটিতে সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৫টি মসজিদ, সাতটি মাদ্রাসা, তিনটি মন্দির ও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার রয়েছে। এই বিশাল এলাকার অভাবী মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হাজার হাজার মানুষ তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইসহ একমাত্র জীবিকার উৎস কৃষিজমি হারিয়ে রাতারাতি উদ্বাস্তু হবে। এ ছাড়া একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কারণে চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, অবিলম্বে প্যারাগন কোম্পানির কাছে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিশাল এলাকা লিজ দেওয়ার পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে, স্থানীয় সাড়ে ৪ হাজার পরিবারের বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে, ইজারা-প্রক্রিয়ার নেপথ্যের অনিয়ম তদন্তে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। উন্নয়ন বা শিল্পায়নের নামে স্থানীয় জনগণের মতামত ও জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না বলে স্মারকলিপিতে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর এলাকার বাসিন্দা ওয়াহেদুজ্জামান মাবুর অভিযোগ, স্থানীয় জনসাধারণের মতামত না নিয়ে গোপনে ও একতরফাভাবে এই ইজারার পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ইছলী এলাকার হায়দার আলী মনে করেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এখানকার জমি লিজ দেওয়া মানেই চরের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া। প্রয়োজনে চরবাসী জীবন দেবে, তবুও জমি দেবে না।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী জানিয়েছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জমি ইজারা দেওয়া হলে চরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে পথে বসতে হবে। তিনি দাবি করেন, জমিগুলো খাস খতিয়ানভুক্ত নয়। নদীতে ভেঙে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অন্যত্র সরে যায়নি। শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা চরে চাষবাস করে কোনোমতে বেঁচে আছে তারা।
এ ব্যাপারে গঙ্গাচড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হামিদুল ইসলামের ভাষ্য, ‘প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্যারাগন গ্রুপের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে আমরা বিষয়টি যাচাই করেছি মাত্র। সংশ্লিষ্ট এলাকায় খাসজমির পরিমাণ, প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতার বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।’ প্রতিবেদনে কী আছে, তা স্পষ্ট না করলেও তিনি জানিয়েছেন, চাহিদার বেশিরভাগ জমিই তিস্তা নদীর মধ্যে রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বললেন, ‘চরবাসীর অভিযোগ ঠিক না। এখানে কাউকে জমি লিজ দিতে ‘পাঁয়তারা’ শব্দটি আসার কথা নয়। প্যারাগন গ্রুপ খাসজমি উল্লেখ করে নির্দিষ্ট এলাকায় জমি চেয়ে আবেদন করেছে। আমরা শুধু সেই জমির বর্তমান অবস্থান পর্যবেক্ষণ করেছি।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেছেন, ‘প্যারাগন গ্রুপ জমি লিজ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছে। আমরা জমির অবস্থান ও প্রকৃতি জেনে প্রতিবেদন দিয়েছি শুধু। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ চরবাসী মানববন্ধন করেছে ও স্মারকলিপি দিয়েছে। আমরা সে বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’


