যদি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিছানায় বসে চা খাচ্ছি। চা হালকা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কড়া লিকারের রঙ চা। চায়ের সঙ্গে আবার লেবু দেওয়া হয়েছে। লেবু চা আমি খাই না। তবু স্ত্রী কেন দিল বুঝতে পারছি না। বিরক্ত লাগছে খুব। আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। টিক টিক করে এগিয়ে যাচ্ছে কাঁটা। তবু কেন যেন মনে হচ্ছে সময় স্থির।
আমার পাশে সাত মাসের মেয়েটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। সে হামাগুড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। দু-পা পেছনে ঠেলে শরীরটা সামনে নিতে গিয়ে বারবার পড়ে যাচ্ছে। পড়ে গিয়ে সে হতাশ। আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলছে, ‘বা বা বা। ইদানীং মেয়েটা সুন্দর করে বা বা বা ডাকছে।’
মেয়ের সামনের দিকে দুটো দাঁত উঠেছে। দাঁত ছোট হলেও হাসির সময় দেখা যায়। তার এখন অপেক্ষা— কবে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। কবে বাড়ি মাথায় তুলে ছুটোছুটি করবে।
পড়ার টেবিলে খাতা ছড়িয়ে বসে আছে ছেলেটা। সে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। পড়াশোনায় মন দিচ্ছে না। নজর জানালার বাইরে। একটু পরপর জিজ্ঞেস করছে, ‘বাবা, সাড়ে ৪টা বাজতে আর কতক্ষণ বাকি?’
ছেলের অপেক্ষা— কখন সাড়ে ৪টা বাজবে, কখন সে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলবে। আরও একটা গোপন অপেক্ষা তার মনে আছে। কবে সে আমার মতো বড় হবে। কবে তাকে আর পড়ালেখা করতে হবে না।
আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হাসি। আমারও তো ঠিক এই অপেক্ষাটাই ছিল একসময়। কবে স্কুল শেষ হবে, কবে বড় হব। তারপর কলেজে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষা। কলেজ পার হতেই চাকরির অপেক্ষা। চাকরি হলো তো বিয়ের অপেক্ষা। বিয়ের পর সন্তানের অপেক্ষা।
ছেলে কোলে এলো। এর পরের অপেক্ষা— কবে সে হাঁটবে, কবে স্কুলে যাবে। এখন সে ক্লাস থ্রিতে পড়ছে। আমার নতুন অপেক্ষা মেয়েকে নিয়ে— মেয়েটা কবে পরিষ্কার ‘বাবা’ বলে ডাকবে।
হঠাৎ মনে হলো, মানুষের জীবনটা আর কিছুই না। শুধু একটার পর একটা অপেক্ষা। একটা ট্রেন এসে চলে যায়, আমরা পরের ট্রেনের টিকিট কেটে বসে থাকি। অথচ এই যে বিকাল গড়াচ্ছে, সামনে ঠান্ডা চা, বিছানায় মেয়ের হামাগুড়ি, ছেলের খেলার আকুতি— সবকিছুই যেন হাত গলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
ছেলেটা আবার এসে জামা টেনে বলল, ‘বাবা, ৪টা কিন্তু বেজে গেছে!’
আমি চায়ের কাপটা একপাশে সরিয়ে রাখলাম। মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘চল। সাড়ে ৪টা বাজতে এখনো আধা ঘণ্টা বাকি। কিন্তু অপেক্ষা করে লাভ নেই, আজ ৪টাতেই মাঠে যাব।’
ছেলেটা লাফিয়ে উঠে চিৎকার করল। ছেলের আনন্দে মেয়েও খুব খুশি। মেয়েটা কোলে থেকেই মিষ্টি হেসে ডাকল, ‘বা বা বা!’
বাইরে থেকে এক চিলতে রোদ এসে ঘরে ঢুকেছে। মনে হলো, অপেক্ষার ট্রেনটা একটু দেরিতে আসাই ভালো। এখনকার সময়টা বরঞ্চ ওদের সঙ্গেই পার করা যাক।







