নিজেকে নিয়ে কতটা হাসব? উত্তরটা জটিল

সংগৃহীত ছবি
আমরা অনেকেই নিজের ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটি নিয়ে হালকা হাসাহাসি করতে পারি, আবার অনেকের কাছেই তা মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু নিজেকে নিয়ে হাসা কি সত্যিই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? নাকি এটি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি প্রকাশ করে?
বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে নিজের ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটি নিয়ে হাসতে পারা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে এর প্রয়োগের সঠিক নিয়ম বা সীমা না জানলে তা লাভের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশব থেকেই মানুষের ব্যক্তিত্ব ও ঠাট্টা সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি হয়। ১৯৯০-এর দশকের এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু বন্ধুদের ঠাট্টা-মজা সহজভাবে নিতে পারে না, তারা ধীরে ধীরে একা ও দলছুট হয়ে পড়ে। গবেষকেরা এমন একা হয়ে যাওয়া শিশুদের দুটি দলে ভাগ করেছেন:
প্রথম দল (আক্রমণাত্মক): এরা ঠাট্টার মুখে পড়ে রেগে যেত বা সহিংস আচরণ করত।
দ্বিতীয় দল (ভীতু ও অনুগত): এরা কষ্ট পেয়ে নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিত।
এ দুই দলই বন্ধুদের নির্দোষ ঠাট্টাকে অপমান হিসেবে ধরে নিত। অন্যদিকে, যেসব শিশু ঠাট্টাকে হেসেই উড়িয়ে দিতে পারত বা তা উপভোগ করত, তারা সামাজিক সম্পর্কের দিক থেকে বেশ সফল হতো। অর্থাৎ, শৈশবের এই মনোভাব সারাজীবনের মানসিক সুস্থতার ভিত্তি গড়ে দেয়।
প্রাচীনকালে দার্শনিক প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে, কৌতুক মূলত অন্যের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অনুভূতি থেকে আসে। অর্থাৎ, অন্যকে বোকা বা ছোট মনে করলেই মানুষ হাসে। প্লেটোর এক হাজার বছর পর দার্শনিক থমাস হব্সও এ ধারণার সমর্থন করেন। তবে তিনি একটি ব্যতিক্রম যোগ করেন— মানুষ শুধু তখনই নিজের অতীতের বোকামি দেখে হাসতে পারে, যখন সে বুঝতে পারে যে আগের চেয়ে সে এখন অনেক বুদ্ধিমান হয়ে উঠেছে।
পরে ১৮ শতকে আসে অসঙ্গতি তত্ত্ব, যা বলে যে সমাজিক নিয়মের বাইরের কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণেই মানুষ হাসে।
তবে মানুষ কি সত্যিই নিজেকে নিয়ে হাসতে পারে? এটি প্রমাণ করতে ২০১১ সালে ইউরোপীয় গবেষকরা একটি চমৎকার পরীক্ষা করেন। তারা গবেষণাগারে আসা মানুষের গোপনে ভিডিও করেন এবং পরে তাদের সামনে তাদেরই চেহারার বিকৃত ছবি তুলে ধরেন।
দেখা যায়, ৮০ শতাংশ মানুষ ছবিটি দেখে হেসেছেন এবং ৪০ শতাংশ মানুষ সশব্দে উচ্চস্বরে হেসে উঠেছেন। এটি প্রমাণ করে যে মানুষ সত্যিই নিজেকে দেখে হাসতে সক্ষম।
যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের প্রভাষক ও কৌতুক গবেষক সোনিয়া হাইন্টজের মতে, মানুষ যে নিজের ভুল বা বোকামি নিয়ে সত্যিই হাসতে পারে এবং এর অসংখ্য ইতিবাচক দিক রয়েছে— তা বিজ্ঞান এখন নিশ্চিত করেছে।
আমেরিকান গবেষক পল ম্যাকগি জানান, নিজেকে নিয়ে হাসতে শেখা হলো কৌতুকচর্চার অন্যতম কঠিন একটি ধাপ। তিনি মারাত্মক গম্ভীর মানুষদের জন্য ৭ ধাপের একটি কোর্স তৈরি করেন, যার শেষ ধাপের ঠিক আগের ধাপ ছিল নিজেকে নিয়ে হাসা।
গবেষণায় হাসিসংক্রান্ত দুটি বিশেষ মানসিক অবস্থা জেলোটোফোবিয়া ও জেলোটোফিলিয়া উঠে এসেছে।
জেলোটোফোবিয়া হলো এমন এক ধরনের অনুভূতি, যেখানে মানুষ মনে করে সবাই তাকে নিয়েই হাসাহাসি বা কটাক্ষ করছে। ক্যাফেতে বসে অন্যরা হাসলেও এরা মনে করে তাদের উদ্দেশ্য করেই হাসা হচ্ছে। অতিরিক্ত কড়া শাসন, শৈশবে স্কুলে প্রচণ্ড অপমানিত হওয়া বা অটিজম এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
পূর্ব এশীয় দেশগুলোয় এটি বেশি দেখা যায়, কারণ সেখানে কৌতুককে পেশাদার কৌতুক অভিনেতাদের কাজ মনে করা হয় এবং যৌথ পরিবারে একা নিজেকে তুলে ধরা অপছন্দ করা হয়।
অন্যদিকে জেলোটোফিলিয়া হলো অন্যদের কাছে নিজের হাস্যাস্পদ হওয়াকে উপভোগ করা। এরা যেকোনো বিরক্তিকর কাজ বা কঠিন পরিস্থিতিকেও খেলার ছলে হালকা ও মজাদার করে তুলতে পারেন। এদের আত্মসম্মান ও সম্পর্কের সন্তুষ্টি অনেক বেশি থাকে।
২০০৩ সালে কানাডিয়ান গবেষকদের মতে, মানুষের কৌতুকবোধকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো অ্যাফিলিয়েটিভ বা সামাজিক সংহতিমূলক কৌতুকবোধ, যা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বাড়াতে এবং নতুন সম্পর্ক মজবুত করতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয়টি হলো সেলফ-এনহ্যান্সিং বা আত্ম-উন্নয়নমূলক কৌতুকবোধ, যেখানে কঠিন বা খারাপ পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে এবং মন ভালো করতে হাসির উপাদান খুঁজে নেওয়া হয়।
তৃতীয় প্রকারটি হলো এগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্মক কৌতুকবোধ, যার মাধ্যমে অন্যকে ছোট, উপহাস বা কটাক্ষ করে আনন্দ পাওয়া হয়।
আর চতুর্থটি হলো সেলফ-ডিফিটিং বা আত্ম-পরাজিত কৌতুকবোধ, যেখানে নিজের নানা ভুল, কমতি বা দুর্বলতা নিয়ে অতিরিক্ত ঠাট্টা-মজা করে অন্যদের মন জয় করার বা নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
দীর্ঘদিন মনে করা হতো যে আত্ম-পরাজিত কৌতুকপ্রিয় মানুষেরা বিষণ্নতা ও কম আত্মসম্মানে ভোগেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানী সোনিয়া হাইন্টজের গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। নিজের দুর্বলতা নিয়ে হালকা মজা করা বাস্তবে মানসিক চাপ সামলানোর একটি ভালো কৌশল হতে পারে।
তবে গবেষক ক্লেয়ার ফক্সের মতে, যারা শুধুই নিজেকে ছোট করে কৌতুক করেন, তারা একাকীত্বে ভোগেন। কিন্তু যারা অন্যসব কৌতুকের পাশাপাশি নিজের দুর্বলতা নিয়েও হাসতে পারেন, তাদের কোনো মানসিক বা সামাজিক ক্ষতি হয় না।
নিজেকে নিয়ে হালকা রসিকতা করা বা নিজের ভুলগুলো সহজভাবে মেনে নেওয়া পেশাগত জীবন ও সামাজিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে অত্যন্ত ভূমিকা রাখে। নতুন কোনো পরিবেশে অচেনা মানুষের সঙ্গে দ্রুত মেলামেশা করতে এবং সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে এটি এক চমৎকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
পাশাপাশি, শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা যদি নিজেদের ছোটখাটো ভুলগুলোকে জটিলভাবে না দেখে হেসে মেনে নিতে পারেন, তবে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাদের আরও বেশি আন্তরিক, গ্রহণযোগ্য এবং যোগ্য বলে মনে করেন। তাছাড়া, যেকোনো ব্যর্থতা বা ভুলের মুখোমুখি হলে রাগ না করে বা মন খারাপ না করে তা নিয়ে হাসতে পারলে মনের ওপর চাপ কমে যায়, যা পরিস্থিতির সাথে মানসিকভাবে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত গম্ভীর না থেকে নিজের ভুল ও দুর্বলতা নিয়ে হাসার অভ্যাস তৈরি করতে সহজ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমে নিজের ছোটখাটো দুর্বলতা বা ভুলগুলো, যেমন—উচ্চতা, পোশাক বা আনাড়িপনা মেনে নিয়ে তা নিয়ে হালকা কথা বলা শুরু করুন; এতে ধীরে ধীরে বড় ঘাটতিগুলোও সহজে সামলানো যায়।
তবে যেসব বিষয় আপনি মন থেকে সত্যিই মেনে নিয়েছেন, শুধু সেগুলো নিয়েই কৌতুক করা উচিত; কারণ মনের ভেতরে অস্বস্তি রেখে জোর করে ঠাট্টা করলে তা অন্যের জন্যও বিব্রতকর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সারা দিনের অন্তত তিনটি মজার বা আনন্দময় মুহূর্ত লিখে রাখার অভ্যাস মানসিক চাপ ও বিষাদ কমিয়ে সুখের অনুভূতি বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে।
জীবন ও নিজেকে অতিরিক্ত গম্ভীরভাবে না দেখে নিজের ছোটখাটো ভুল বা ব্যর্থতাকে হেসে মেনে নিতে পারা মানসিক শান্তির অন্যতম বড় উপায়। তবে খেয়াল রাখা জরুরি, এ ঠাট্টা যেন নিজের প্রতি ঘৃণা বা তিক্ততা থেকে না হয়; বরং তা যেন হয় নিজেকে হালকা, আনন্দময় ও সবার সঙ্গে যুক্ত রাখার এক ইতিবাচক মাধ্যম।









