ফিলিস্তিনি মায়ের কান্না, ‘মেয়েকে স্কুলে পাঠালাম সাজিয়ে, ফিরল লাশ’

মায়ের ফোনে ছোট্ট রিতাজের ছবি। ছবি: সংগৃহীত
গাজা উপত্যকার উত্তরে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম বেইত লাহিয়া। সেখানের একটি স্কুলে বসে গণিত অনুশীলন করছিল ছোট্ট শিশু রিতাজ আব্দুর রহমান রিহান।
খাতায় ততক্ষণে প্রশ্ন লেখা হয়ে গেছে তার। কিন্তু উত্তর লেখার অমীমাংসিত খালি জায়গাটি কলমের কালির পরিবর্তে রাঙা হয়েছে এই শিশুর রক্তে।
বৃহস্পতিবার আবু উবাইদা বিন আল-জাররাহ স্কুলে প্রায় ৪০ জন সহপাঠীর সঙ্গে ক্লাস করছিল ৯ বছর বয়সী রিহান। সেই সময় নিকটে অবস্থানরত ইসরায়েল সেনাবাহিনীর এক সদস্য তাকে লক্ষ্য করে চালায় গুলি।
রিহানকে তাৎক্ষণিক নেওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানে নেওয়ার পর তাকে মৃত বলে জানিয়ে দেন চিকিৎসক। শেষ দেখা করার সুযোগও পায়নি বাবা-মা। জানাতে পারেনি শেষ বিদায়ও।
গাজার মানুষের জন্য এই নিয়তি যেন প্রাত্যহিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুহারা মা-বাবা শোকে পাথর। শোকে পাথর স্বজনহারা আত্মীয়রাও।
রিহানের বাবা আব্দুর রহমান তার মেয়ের সঙ্গে কাটানো দিনলিপির কথা জানাতে গিয়ে বললেন, এই ভয়াবহতার মধ্যেও আমি আমার মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতাম রোজ। যেন সে লেখাপড়া শেখা চালিয়ে যেতে পারে দুনিয়ার আর পাঁচটি শিশুর মতোই।
‘সেদিনও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পরে খবর পাই, মেরে ফেলা হয়েছে আমার মেয়েকে।’
রিহানের বাবার ভাষ্য, মা-বাবা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠায় অনেক আশা নিয়ে। তাদের আশা, সন্তান হবে মানুষের মতো মানুষ। কিন্তু সেখান থেকেই যদি আসে সন্তানের মৃত্যুর খবর, এর চেয়ে অভাবনীয় বিষাদের বিষয় আর কী হতে পারে?
শোকের ঘটনা রিহানের পরিবারের জন্য এটিই প্রথম নয়। সবচেয়ে বড় এই দুর্ঘটনা ঘটার আগে ইসরায়েলি হামলায় তাদের বাসস্থান হয়েছে ধ্বংস। তারা বর্তমানে থাকেন ভাড়া বাসায়। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন শুরুর।
রিহান ছিল তাদের বড় মেয়ে। মেয়েকে প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটা পথ পার করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন তার বাবা।
রিহানের বাবা আরও জানান, টানা দুই বছর ধরে চলমান ইসরায়েলি গণহত্যায় আমরা অনেক মানুষকেই হারিয়েছি। কিন্তু আমরা খুশি ছিলাম যে, আমাদের সন্তান এখনও বেঁচে আছে।সেই বাস্তবতা এখন অলীক কল্পনা মাত্র। আমাদের মেয়ে আমাদের বিদায় না জানিয়েই বহুদূরে চলে গেছে। সে আর ফিরে আসবে না।
আব্দুর রহমান বলেছেন, আমরা খুশি ছিলাম যে, বেড়ে উঠছে আমাদের মেয়ে রিহান। সে সব কিছু বুঝতে শিখছে ধীরে ধীরে। সে ছিল বুদ্ধিদীপ্ত আর স্মার্ট। সুযোগ পেলে সে আরও ভালো কিছু করতে পারত।
আমরা চাচ্ছিলাম সে আবার স্কুলে যাক। আমাদের সামর্থ্য মতো তাকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম আমরা। সে আশার কিছুই আর পূরণ হবে না, বলে নিজের আক্ষেপ ব্যক্ত করেন তিনি।
গাজায় সেইফ জোন বলে কিছু অবশিষ্ট আছে কী
বিগত প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় রিহানের মতো অসংখ্য শিশু স্কুলে যেতে পারেনি। জ্ঞান হবার পর এটাই ছিল তাদের জন্য প্রথম এমন একটি বছর যখন তারা আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করতে পারবে। শিশুদের ক্লাস শুরু হয়েছিল বিল্ডিংয়ের ভগ্নস্তূপের মাঝেই, তাবু খাঁটিয়ে। তবুও তারা এই পরিবর্তিত অবস্থা নিয়ে আশাবাদী ছিল।
রিতাজের বাবা আব্দুলরহমান জানান, আবু উবাইদা বিন আল-জাররা স্কুলটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, যাকে আমরা 'হলুদ সীমান্ত' বলে চিনি, তার থেকে ২ কিলোমিটার দূরত্বে ছিল। সেই কারণে আমরা ভেবেছিলাম বাড়ি থেকে দূরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের মেয়ে নিরাপদে থাকবে, একই সঙ্গে তার পড়াশোনাও চালু রাখতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের তীব্র ভাবে আঘাত করলো। আমরা বুঝতে পারলাম যে, এই দেশে নিরাপদ জায়গা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
রিহানের মা অলার জীবনে স্বজন হারানোর ঘটনা এই দুই বছরে এর আগেও ঘটেছে অনেকবার। ইসরায়েলের চালানো গণহত্যায় তিনি তার মা-বাবাকে হারিয়েছেন। হারিয়েছেন বোনের সন্তানদেরও।
শোক ভারাক্রান্ত কন্ঠে অলা জানালেন, সকালে আমি আমার মেয়ের চুল আঁচড়ে দিলাম। জামা পরিয়ে দিলাম। স্কুল থেকে আমার মেয়ে ফিরল লাশ হয়ে।
আমার মেয়ের সারা মুখ জুড়ে ছুপছুপ রক্ত।
তিনি আরও জানান, আমার মেয়ে ছিল উৎফুল্ল একটি শিশু। অন্যের প্রতি সে ছিল বিনয়ী। আমাকে কোনোকিছুতে কখনও না করেননি সে। আমি যা-ই বলতাম তার উত্তর হতো, হ্যাঁ মা।
আমি আমার মেয়ের ছবি সাথে নিয়ে ঘুমাই। আমি এখনও ভাবতে পারি না যে, আমার মেয়ে আর বেঁচে নেই।
‘এটা কলমের কালি নয়, এটা আমার মেয়ের রক্ত’
রিহানের নিস্তেজ শরীরের সাথে এসেছে তার খাতা-কলমও। তার মা অলা, মেয়ের অঙ্কের খাতাটি আঁকড়ে ধরে বলছেন, আমি আমার মেয়ের খাতাটি প্রায়ই খুঁটিয়ে দেখি। ভাবি, আমার মেয়েকে মেরে ফেলার আগে ঠিক কী করছিল সে। এই পৃষ্ঠার দাগগুলো কালি নয়, এগুলো আমার মেয়ের রক্ত। আমার কাছে ফিরে আসা এই খাতাটিই শিশুদের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আগামী সপ্তাহে রিহানের চাচার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তার জন্য নতুন জামা আর জুতো কেনা হয়েছিল। রিহান খুব আগ্রহী ছিল সেগুলো পরার জন্য। কিন্তু নতুন জামার বদলে তাকে সাদা কাফন পরিয়ে বিদায় নিতে হলো, বলেন রিহানের মা অলা।
‘পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ধ্বংসের অভিযোগ’
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি বাহিনী ধারাবাহিকভাবে এই ‘ইয়েলো লাইন বা হলুদ সীমান্ত’ সম্প্রসারণ করে চলেছে। সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে তারা।
রিহানের মা অলা মনে করেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তার মতে, ইসরায়েলি এই বর্বর দখলদার বাহিনী চায় না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠুক। তারা ফিলিস্তিনিদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে চায়।















