এরিখ মারিয়া রেমার্ক
যুদ্ধের ছাই থেকে উঠে আসা লেখক

এরিখ মারিয়া রেমার্ক (২২ জুন ১৮৯৮ – ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭০)
জন্ম ১৮৯৮ সালে, জার্মানির ওসনাব্রুকে। নাম ছিল এরিখ পল রেমার্ক। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কর্দমাক্ত পরিখায়। সেখানে তিনি দেখেছেন মানুষের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মুখ—রক্ত, মৃত্যু, আর সেই নিরর্থকতা— যা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছিলেন; শ্যাপনেলের আঘাতে বাঁ পা, ডান হাত আর গলা ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে তিনি দেখলেন, দেশ ভেঙে পড়ছে, চারপাশে ক্ষুধা আর শোকের কালো লম্বা ছায়া। এই অভিজ্ঞতাই তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে সারা জীবন। কিন্তু এ আঘাত তাকে দিয়েছিল এক অদ্ভুত শক্তি— যে শক্তি থেকে জন্ম নিয়েছে বিশ শতকের বিখ্যাততম যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস।
লেখক হিসেবে রেমার্কের ধারণা ছিল খুব বাস্তব। তিনি বলতেন, জনসাধারণ মনে করে একটা বই নাকি এক বসায়, এক ধরনের উন্মাদনায় লেখা হয়ে যায়। কিন্তু সত্যিটা পুরোপুরি আলাদা। তিনি স্বীকার করতেন, বলতেন— "আমাকে অসাধারণ পরিশ্রম করতে হয় যা আমি শুরু করেছি তা শেষ করার জন্য। কখনও সকাল নয়টা থেকে সারা দিন ডেস্কে বসে থেকে একটি লাইনও লিখতে পারিনি।" তার মতে, লেখার কাজ মানুষের সবচেয়ে কঠিন, আত্ম-নাশকারী কাজগুলোর একটি। প্রতিটি পৃষ্ঠা বের করতে হয় ঘাম আর আত্ম-ভর্ৎসনার মধ্য দিয়ে। যারা "হ্যামক সাহিত্য" বা দোলনায় চড়ে আরামের সাহিত্য না করে চিরস্মরণীয় কিছু তৈরি করতে চান, তাদের এই কষ্ট সহ্য করতেই হবে। কিন্তু যে লেখকের সত্যিই লেখার মতো কিছু থাকে, সে কখনও হাল ছাড়ে না—সে সন্দেহ, একঘেয়েমি আর নিরুৎসাহের মধ্য দিয়েও এগিয়ে চলে।
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী উপন্যাসের জন্ম নিয়ে রেমার্ক বলেছিলেন, সেটা ছিল তার জন্য "এক ধরনের নিরাপত্তা-কপাট"। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তার মাথায় ছিল অপরিমেয় ভয় আর কষ্টের বোঝা। সেই অনুভূতি ছিল অব্যক্ত আর বিশৃঙ্খল। সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তাকে লিখতে হয়েছিল। একদিন রাতে কাজ থেকে ফিরে তিনি লেখা শুরু করেন। বলেছিলেন, "আমি কোনো বড় পাঠকের জন্য লিখছিলাম না; আমার উদ্দেশ্য ছিল আমি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি তা স্পষ্টভাবে দেখা, তাই আমি অত্যন্ত সরলতা আর সততার সঙ্গে লিখেছি, যেন কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে গল্প বলছি।" তিনি সমস্ত স্তুতি এড়িয়ে কেবল ভয়ানক সত্যকে নিজের হয়ে কথা বলতে দিয়েছেন। মাত্র ছয় সপ্তাহে বইটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন "ইম ভেস্টেন নিক্স নয়েস"—অর্থাৎ 'অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট'। কী নির্মম বিদ্রূপ! বইটি পড়া শেষ করে পাঠক যখন আবার শিরোনামটি পড়েন, তখন বুঝতে পারেন—"সব শান্ত" বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন অফিসিয়াল রিপোর্টে লেখা হয় "All Quiet in the Western Front", তখন সেখানে প্রতিদিন শত শত তরুণ মারা যাচ্ছে।
বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। প্রথম বছরেই জার্মানিতে দশ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। এটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম সফল যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। কিন্তু এই বিশাল সাফল্য তাকে শুধু খ্যাতি আর সম্পদ দেয়নি—সঙ্গে নিয়ে এসেছিল অকল্পনীয় যন্ত্রণা। সাফল্যের ছয় মাসের মধ্যেই নাৎসিরা ক্ষমতায় আসে। রেমার্কের বইয়ে সত্যের উপস্থাপন তাদের পছন্দ হয়নি। ১৯৩৩ সালে তার বই প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাকে "পরাজয়বাদী", "পলায়নবাদী'' আখ্যা দেওয়া হয়। রেমার্ক তখন সুইজারল্যান্ডে চলে যান। তাকে ফিরে আসার সব অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। ফলাফল—তিনি জার্মান নাগরিকত্ব হারান, তার বই নিষিদ্ধ হয়, তার চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ হয়। রেমার্ক নিজেই ছিলেন এক "ভীত, নাৎসি জার্মানির ভয়াবহতা দ্বারা তাড়িত এবং নিজের প্রিয় দেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার তিক্ততায় পীড়িত" মানুষ। তার সৃষ্টিকর্মে সেই যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। তিনি সব সময় নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন, হলিউডের জৌলুস থেকে দূরে থেকেছেন। ১৯৩৮ সালে তিনি আমেরিকায় চলে যান, ১৯৪৭ সালে নাগরিকত্ব পান। কিন্তু তার হৃদয় সব সময় সুইজারল্যান্ডের লেক ম্যাজিওরের তীরে পোর্তো রোঙ্কোতে ছিল, যেখানে তিনি চল্লিশ বছর বসবাস করেছেন।
এই নির্বাসনের যন্ত্রণা আরও গভীর হয়ে উঠেছিল একটি অকল্পনীয় ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। রেমার্কের বোন এলফ্রিডে স্কলজ—যিনি কখনও কোনো রাজনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন না—তাকে নাৎসি "পিপলস কোর্ট" ১৯৪৩ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কারণ? তিনি রেমার্কের বোন। হিটলারের শাসনব্যবস্থা রেমার্ককে সরাসরি আঘাত করতে না পেরে তার পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল। রেমার্ক এই ঘটনার কথা বলেছিলেন সাক্ষাৎকারে, "যারা আমার বোনের বিচারের দায়িত্বে ছিল, তারা আজ উচ্চ পদে আছে, পেনশন পাচ্ছে। এটা আমি ঠিক বুঝতে পারি না।" এই নির্মম সত্যটি তার পরবর্তী লেখাগুলোতে ছায়া ফেলেছে।
রেমার্কের সাহিত্যকর্মকে একটি আলাদা জগৎ বলা যায়। 'অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট'-এর সাফল্যের পরও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস লিখেছেন, যার প্রায় সবগুলোই চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তাকে প্রায়ই "একটি উপন্যাসের লেখক" বলে মনে করা হয়। 'দ্য রোড ব্যাক' (১৯৩১) ছিল 'অল কোয়ায়েট'-এর সরাসরি উত্তরসূরি। যুদ্ধ শেষে সৈনিকরা যখন সাধারণ জীবনে ফিরে আসে, তখন তাদের অবস্থা কেমন হয়—সেটাই এই উপন্যাসের বিষয়। পরিখার জীবন থেকে সভ্য জীবনে ফেরা তাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়; তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
'থ্রি কমরেডস' (১৯৩৬) ছিল তার আরেকটি কালজয়ী কাজ। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সমালোচক লিখেছিলেন, "সরলতা আর শক্তি, হাস্যরস আর কোমলতা, বাস্তব আর অবাস্তবের প্রতি কবির সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া—এই সব গুণ তার কাজে প্রথম থেকেই একত্রিত হয়েছে।" এই উপন্যাসে রেমার্ক দেখিয়েছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে তিন বন্ধু কীভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে, কীভাবে ভালোবাসে, কীভাবে হারায়। রবার্ট, অটো আর গটফ্রিড—এই তিনজন একসাথে একটা গাড়ির মেরামতের দোকান চালায়। তারা একে অন্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত। কিন্তু জার্মানির ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থা আর রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের স্বপ্নকে ক্রমশ গিলে ফেলে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে রেমার্ক দেখিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধের ক্ষত কখনও সারে না।
'আর্ক অব ট্রায়াম্ফ' (১৯৪৫) উপন্যাসের পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের প্যারিস। রাভিক নামের এক জার্মান ডাক্তার, যিনি দেশত্যাগী শরণার্থী। ফ্রান্সে তার অস্ত্রোপচার করার অনুমতি নেই, তবু তিনি গোপনে শহরের অভিজাত রোগীদের চিকিৎসা করেন। নাৎসি জার্মানির হাতে নির্যাতিত, আবার ফ্রান্সেও অবাঞ্ছিত—এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে থাকা এক মানুষের গল্প। এই উপন্যাস তার দ্বিতীয় সর্বাধিক সফল কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। 'স্পার্ক অব লাইফ' (১৯৫২) নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা নিয়ে লেখা। 'দ্য নাইট ইন লিসবন' (১৯৬৩)-এ তিনি স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল হিটলারের যুদ্ধ, যেখানে "মাস্টার রেস" ইহুদি আর অন্য "অমানুষদের" নির্মূল করতে চেয়েছিল। 'আ টাইম টু লাভ অ্যান্ড আ টাইম টু ডাই' (১৯৫৪), 'দ্য ব্ল্যাক অবেলিস্ক' (১৯৫৬)—প্রতিটি বইতেই তিনি যুদ্ধ, নির্বাসন আর মানবিক সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরেছেন।
রেমার্কের ব্যক্তিগত জীবন ছিল ঠিক তার উপন্যাসের মতোই টালমাটাল। তিনি দুইবার বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রী ইলসে ইয়ুটা জানবোনার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল জটিল—তিনি তাকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন, আবার বিয়েও করেছিলেন। কেন? নাৎসিদের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর জন্যই সেই পুনর্বিবাহ। ইলসে ইহুদি ছিলেন। রেমার্ক তাকে জার্মানি থেকে বের করে আনতে এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অদ্ভুত পথ বেছে নিয়েছিলেন। তার প্রেমের তালিকায় ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে গ্ল্যামারাস নামগুলো—গ্রেটা গার্বো, মারলেন ডিট্রিখ, ডলোরেস দেল রিও, লুপে ভেলেজ। কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক ছিল মারলেন ডিট্রিখের সঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপ থেকে পালাতে ডিট্রিখ তাকে সাহায্য করেছিলেন। শেষে ১৯৫৮ সালে তিনি বিয়ে করেন হলিউড অভিনেত্রী পলেট গডার্ডকে, যিনি তার মৃত্যুর সময় বিছানার পাশে ছিলেন।
রেমার্ক কখনও সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত হননি, কিন্তু তার লেখা ছিল এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ। তার বই পুড়িয়ে দেওয়া, তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, তার চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করা—নাৎসিরা বুঝতে পেরেছিল, এই লেখকের শব্দগুলো তাদের জন্য বিপজ্জনক। তিনি নাৎসি জার্মানির ভয়াবহতা দেখেছেন, অনুভব করেছেন, আর সেই অনুভূতি তার লেখায় রূপ নিয়েছে। তার সৃষ্টিকর্ম নাৎসি আদর্শের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি নিজে বলতেন, "আমি শুধু মানুষের কথা লিখেছি, আর সেটা সব দেশের মানুষ একইভাবে অনুভব করেছে।"
সাহিত্যিক হিসেবে তার প্রভাব ছিল বিশাল। তাকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাথে তুলনা করা হতো তার সংক্ষিপ্ত, নির্মম গদ্যের জন্য। তার রচনাশৈলী ছিল অত্যন্ত সরল, কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই ছিল এক গভীর আবেগ।
তিনি অলংকারহীন ভাষায় যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন, যা পাঠকের হৃদয়ে সরাসরি আঘাত করে। তার সর্বোচ্চ লক্ষ্য ছিল "সবার জন্য শিল্প" লেখা। তিনি বিশ্বাস করতেন, "শান্তি ও বোঝাপড়ার যেসব জিনিস সহায়ক, সেসবই ভালো।" তিনি জানতেন, একটি বই কখনও এক বসায় লেখা হয় না; তাকে অর্জন করতে হয় নিরলস পরিশ্রম আর মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে রেমার্ক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। চার মাস ধরে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, সান্তা অ্যাগনেস ক্লিনিকে তার হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়। একটি অ্যানারিজম—ধমনীর প্রসারণে তৈরি টিউমার—তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তাকে সমাহিত করা হয় রোঙ্কোর গ্রামের কবরস্থানে, "লেক ম্যাজিওরের দিকে তাকিয়ে থাকা" সেই জায়গায়, যেটাকে তিনি এতো ভালোবাসতেন।
এরিখ মারিয়া রেমার্ক ছিলেন এক বিরল প্রতিভা—এমন এক লেখক যিনি যুদ্ধকে দেখেছেন তার সবচেয়ে নগ্ন, নিষ্ঠুর রূপে, আর সেই অভিজ্ঞতাকে শব্দে রূপ দিয়েছেন এমন সরলতা আর সততার সঙ্গে যা আজও পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটে। তার 'অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট' শুধু একটি উপন্যাস নয়—এটি এক প্রজন্মের আত্মার আর্তনাদ, যাকে তিনি নিজের নিরাপত্তা-কপাট বানিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এক নির্বাসিত, যার দেশ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, কিন্তু যার শব্দ আজও গোটা বিশ্বের পাঠকের কাছে পৌঁছায়।
রেমার্কের প্রায় সব লেখাই হয়েছে চলচ্চিত্রায়িত, অল কোয়ায়েট ইন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট ত অল টাইম ক্লাসিক্স এরই অন্তর্ভূক্ত। দেখেছেন নাকী রেমার্কের লেখা অবলম্বনে বা অনুপ্রাণিত কোন চলচ্চিত্র? জানান আমাদের মন্তব্যের ঘরে।














