সৈয়দ মুজতবা আলী আজও প্রাসঙ্গিক কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রথম বিদেশ ভ্রমণ আফগানিস্তানে। সেখানে তার প্রথম চাকরি। কলেজে অধ্যাপনার।
কল্পনা করুন দৃশ্যটা। ১৯২৭ সাল। শান্তিনিকেতন থেকে বিএ পাস করা ২৩ বছরের এক তরুণ প্রথম পা রাখছে দেশের বাইরে। হাওড়া থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা। তারপর সড়কপথে খাইবার গিরিপথ পেরিয়ে কাবুল। ট্রেন একবার বাংলা অঞ্চলের বাইরে বেরোতেই জানালাপথে অচেনা এক ভূ-দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন মুজতবা। তখনো তিনি জানেন না, এটা তার জীবনে এক বিশেষ যাত্রা। এটা শুধুই বাংলার বাইরে পা রাখা নয়, এ তার ভবঘুরে অনিকেত জীবনের সূচনাবিন্দু। গৌরচন্দ্রিকা।
১৬ বছর পর এ যাত্রার বিবরণ যখন তিনি লিখেছেন ‘দেশে-বিদেশে’ গ্রন্থে, তখন ট্রেনের বাইরের ভূ-দৃশ্য বদলে যাওয়ার কথাটি লিখেছেন এভাবে— ‘বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি কাকজ্যোৎস্না। তবুও স্পষ্ট চোখে পড়ে এ বাংলাদেশ নয়। সুপারিগাছ নেই, আম-জামে ঘেরা ঠাসবুনুনির গ্রাম নেই, আছে শুধু ছেঁড়া ছেঁড়া ঘরবাড়ি এখানে সেখানে। উঁচু পাড়িওয়ালা ইঁদারা থেকে তখনো জল তোলা চলছে— পুকুরের সন্ধান নেই। বাংলাদেশের সোঁদা সোঁদা গন্ধ অনেকক্ষণ হলো বন্ধ— দমকা হাওয়ায় পোড়া ধুলো মাঝে মাঝে চড়াৎ করে যেন থাবড়া মেরে যায়। এই আধা আলো-অন্ধকারে যদি এ দেশ এত কর্কশ, তবে দিনের বেলা এর চেহারা না জানি কী রকম হবে।’
এই বিবরণ পড়লে বাংলা ফিকশনের আরেক বিখ্যাত রেলভ্রমণের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। সেটা অবশ্য উল্টোযাত্রা। অপু তার মায়ের সঙ্গে ফিরছে বেনারস থেকে। সেদিন ফেসবুকে দেখি পাঠকদের কোনো একটি জনপ্রিয় গ্রুপে কেউ একটা অনানুষ্ঠানিক জরিপ চালাচ্ছিল বাংলা সাহিত্যে সেরা পাঁচ উপন্যাসের তালিকা নিয়ে। দেখি, কেউ কেউ সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘শবনম’ উপন্যাসের নাম দিয়েছেন। ভেবে দেখুন, ‘শেষের কবিতা’, ‘পথের পাঁচালী’, ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ বা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র পাশে বীরদর্পে ‘শবনম’। যিনি সারা জীবনে উপন্যাসই লিখেছেন চারখানা— এমন ফিকশন রাইটারের জন্য এটা বড় সাফল্য। ‘শবনব’ আফগানিস্তানের পটভূমিতে রচিত এক প্রেমকাহিনি। বাঙালি যুবক। আফগান তরুণী। বাংলাদেশের তরুণ পাঠকমহলে সৈয়দ মুজতবা আলী নিঃসন্দেহে পুনরাবিষ্কৃত হচ্ছেন। সেটা অনলাইন পাঠকদের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম গুডরিডসে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। প্রশ্ন জাগে, পাঠককুল যে মুজতবাকে বইয়ের তাক থেকে তুলে নিচ্ছেন, সেটা আসলে কোন মুজতবা? কী খুঁজছেন তারা একদা প্রায়বিস্মৃত এই লেখকের মধ্যে? কেন তিনি এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন? প্রথম কথা হলো, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত সক্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী ওই সময়কালের স্বনামধন্য অপরাপর লেখকদের থেকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা ছিলেন। কলকাতার রাবীন্দ্রিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা মুজতবা লেখার এবং দেখার একটা নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন। সেটা ঘটেছিল বাংলা মুল্লুক ছেড়ে তার বাইরে বেরিয়ে পড়ার কারণে। তিনি দুনিয়া দেখেছেন। সেদিক থেকে পুরো বাংলা সাহিত্যে তার জুড়ি পাওয়া যাবে না। এদেশে আরেকটা ‘দেশে-বিদেশে’ কিংবা ‘চাচা-কাহিনী’ পাওয়া যাবে না। কিন্তু এখানেই শেষ না। সৈয়দ মুজতবা ঠিক সেই ধাঁচের লেখক ছিলেন, একালে আমরা যাকে সীমান্তহীন লেখক বলি। বিশ্বসাহিত্যে এ এক নতুন প্রবণতা। আজকের জমানায় একজন সালমান রুশদি বা ওরহান পামুক বা জে এম কোতসির সঙ্গে তাকে তুলনা করা যাবে না বটে; কিন্তু তাদের মতোই এক বৈশ্বিক সত্তা তৈরি হয়েছিল তার। আজ আমরা যে গ্লোবালাইজেশন আর মাল্টিকালচারালিজমের কথা বলি, মাইগ্রেশন আর ডায়াসপোরার কথা বলি, নানাভাবে সেগুলোর পরোক্ষ ছাপ মুজতবা আলীর হাস্যরসের আড়ালে লুকানো গদ্যে দেখতে পাওয়া যাবে। সবকিছু ছাপিয়ে ভ্রমণকাহিনিকার হিসেবে তিনি যে অনন্য ছিলেন, তার সময়ের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে ছিলেন, সেটা আমরা এ যুগে এসে ভালো করে আবিষ্কার করতে শুরু করেছি। গত শতকের আশির দশক থেকেই ভ্রমণকাহিনি লেখার ধারায় একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশে-দেশে দূরত্ব এমনভাবে ঘুচে গেছে যে, ‘আমি একটি অপরিচিত স্থানে গেলাম এবং সেই স্থানের বিবরণ পাঠককে জানালাম’— এই ধারায় এখন আর ভ্রমণকাহিনি লেখা হয় না। ভ্রমণকারী বা পরিব্রাজক এখন আর কোনো মেডিয়েটর নন। তার যাত্রা এখন অনেকাংশে অন্তর্যাত্রা বা ইনার জার্নি। সেদিক থেকে এ যুগের পল থেরু বা পিকো আয়ারের সহলেখক মনে হবে মুজতবাকে। সৈয়দ মুজতবার লেখা প্রথম ভ্রমণকাহিনি ‘দেশে-বিদেশে’র কথা বিবেচনা করা যাক। একটি ট্রেনযাত্রার বিবরণ দিয়ে শুরু। কিন্তু মুজতবা প্ল্যাটফর্ম বা ট্রেনের বর্ণনা দিচ্ছেন না। দিচ্ছেন এক গোরা সহযাত্রীর বিবরণ। আর তার সঙ্গে ভাগাভাগি করা খাবারের বর্ণনা। তার পরেই সহযাত্রী পাঠান সর্দারজিদের সঙ্গে ইয়ারি-আড্ডার গল্প। ‘দেশে-বিদেশে’ সব দিক দিয়েই এক অনন্য গ্রন্থ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নেবে। এটা নিছক আফগানিস্তানে ভ্রমণের গল্প নয়। এটা এক ধরনের এনকাউন্টার বা মোলাকাত। উপনিবেশিত এক বাঙালি তরুণের এমন এক ভূখণ্ডের সঙ্গে মোলাকাত, যেটি সদ্যই ঔপনিবেশিক নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়েছে। সৈয়দ মুজতবা ভ্রমণকারীর চোখ দিয়ে কোনো ‘অপর’কে দেখার বিবরণ হাজির করেননি। তিনি কাবুলে কোনো ভ্রমণকারী হিসেবেই যাননি। তিনি গিয়েছেন কাবুলের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে। তিনি স্বাধীন আফগানিস্তানের স্বপ্ন আর সাধ তুলে এনেছেন কতগুলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। একালের ভ্রমণ সাহিত্যিক পিকো আয়ার ‘হোয়াই উই ট্রাভেল’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, একটি উৎকৃষ্ট ভ্রমণকাহিনিতে পরিব্রাজক শেষ পর্যন্ত তার কল্পনা এবং সত্তার সঙ্গে মিশে যান। এটা ‘দেশ-বিদেশে’ বইতে অতি অনায়াশে ঘটে।
আরেক ভ্রমণকাহিনি ‘মুসাফির’-এর ভূমিকায় সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন: ‘এ সত্য আমি বারবার বলব, আমি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি অতিশয় অনিচ্ছায়— গত্যন্তর ছিল না বলে। প্রতি আশ্রয় লাভের পর ফের যে বেরিয়েছি, সেটা তারও বেশি অনিচ্ছায়— নিতান্ত বাধ্য হয়ে।’
কথাটা এখানে শেষ করলে হতো। কিন্তু তিনি আগ বাড়িয়ে আরও লিখেছেন: ‘আমার মোক্ষমতম গুরুপাপ— আমি ভ্রমণকাহিনি (তথা অন্যান্য সর্ববিধ রচনা) লিখেছি সর্বাধিক অনিচ্ছায়।’ এ কথা লিখছেন তিনি ১৯৭১ সালে, জীবনের শেষ দিকে, তার শেষ ভ্রমণ গ্রন্থে। মুজতবা আলীর লেখা সার্কাজম বা বক্রোক্তিতে ঠাসা। কিন্তু আমি যে কোনো লেখকের মুদ্রিত বাক্য দলিল হিসেবে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার পক্ষপাতি, তা যতই বক্রোক্তি বা সার্কাজম হোক না কেন। ফ্রয়েড বলবেন, বক্রোক্তিও আসলে বক্রোক্তি নয়। ভূমিকার শেষ দিকে তিনি লিখছেন: ‘ভগবৎ কৃপায় অব্যবহিত প্রত্যাদেশ লাভ করেছি, আমার ভবলীলা সংহরণ প্রত্যাসন্ন’।
এর তিন বছরের মাথায় মুজতবা আলীর মৃত্যু হয়।
যে লোক সারা জীবন ভবঘুরে জীবন কাটিয়েছেন, যিনি সর্বার্থে এক কসমোপলিটান সত্তা, তিনি জীবন সায়াহ্নে এসে যদি লেখেন, তার এ অনিকেত দশা এবং সব লেখাজোখা এক নিরুপায়তার ফসল— তাহলে বুঝতে হবে মুজতবা আলীকে খুব সরলভাবে নেওয়ার জো নেই। লোকটা জীবনে ভীষণ দাগা খেয়েছেন। দাগা তিনি খেয়েছেন। যে স্থানকে জীবনের শেষ ঠিকানা করার কথা ভেবেছিলেন, সেই শান্তিনিকেতনে তার জায়গা স্থায়ী হয়নি। অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অভিমান করেছেন। ঠিকানা বদলেছেন। ‘মুসাফির’ লেখার পরপরই মুজতবা আলী তার জীবনের কলকাতা পর্বের পাট চুকিয়ে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কে একটি বাড়িতে তিনি থাকতেন। ততদিনে তার রোগগ্রস্ত শরীর ভেঙে পড়েছে। বছর দুয়েক বেঁচে ছিলেন। ঢাকাতেই তার শেষ ঠিকানা হয়।




