Agamir Somoy E-Paper
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
সারা জীবনের উপার্জনে স্কুল করেছেন রেখা
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাহিত্য

স্মরণে সৈয়দ মুজতবা আলী

এক বিচিত্র জীবনের আলাপ

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৫৫
এক বিচিত্র জীবনের আলাপ

সৈয়দ মুজতবা আলী (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪—১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪)

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর। আজকের দিনটা সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিন। তিনি আমার প্রিয়তম লেখকদের একজন। তার রচনাবলি পড়ে আমার মনে হয়েছে মানুষটা নিজেই ছিলেন একটা খোলা চিঠির মতো—সরল, খোলামেলা, আবার কখনও কূটাভাসে ভরা। কিন্তু শুধু একজন রম্যলেখক হিসেবে তাকে মনে রাখতে আমি রাজী না—তার এই অতি সরলীকরণের বিপক্ষে আজ আমার তেমন ক্ষোভেরও কিছু নাই। কারণ ক্ষোভের চেয়ে বেশি জিনিসটা আছে তার নাম বিস্ময়। আছে মুগ্ধতা। আছে সেই মানুষটার বিচিত্র জীবন, যা কোনো কাল্পনিক উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।

সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার সিলেট জেলার করিমগঞ্জে (বর্তমানে আসামের অন্তর্গত)। তার বাবা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন সরকারি চাকুরে—ডিস্ট্রিক্ট সাব রেজিস্টার। চাকুরিসূত্রে তিনি তখন থাকতেন করিমগঞ্জে। মুজতবা আলীর জন্মের পটভূমিটাই ছিল এক অসাধারণ ট্র্যাজিক-কমেডির মিশ্রণ। তার আগে সৈয়দ সিকান্দার আলী সাহেবের প্রথম পুত্র ইসহাক ও প্রথম কন্যা ফাতিমা (যাকে দাদা-দাদী আদর করে ময়না ডাকতেন) দুজনেই হঠাৎ করেই কালাজ্বরে মারা যান। পরপর দুটি সন্তান হারিয়ে দাদা-দাদী যখন শোকে আচ্ছন্ন, তখনই জন্ম হয় মুজতবা আলীর। নবজাতককে তারা ভাবলেন আসমান-জমিনের মালিক কর্তৃক প্রেরিত একটি সিতারা—একটি তারা। তাই নাম রাখলেন সিতারা, সংক্ষেপে সিতু। ডাকা শুরু করলেন সিতু মিয়া হিসেবে। এই সিতু মিয়াই যে একদিন হয়ে উঠবেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, সেদিন কে আর জানতো! এই ফুটফুটে ফর্সা রঙের, ধারালো নাকের ছেলেটি একদিন বাংলা গদ্যের ভাষাকে এমনভাবে বদলে দেবেন যে তাকে পড়তে গিয়ে পাঠক ভাববেন—এই লোক বুঝি সেদিন আমার বাড়িতেই আড্ডা দিয়ে গেলেন!

নানা সাক্ষাৎকার আর নথি ঘেঁটে জানা যায় মুজতবা আলী ছিলেন বহুভাষাবিদ, পণ্ডিত।
মুজতবা আলীর ছেলেবেলা কেটেছে হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার হয়ে ১৯১৮ সালে সিলেটে। সিলেট সরকারী হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছিলেন। আর তখন থেকেই শুরু হয় তার কিংবদন্তিসম জীবনের। দাদা-দাদীর কাছে তিনি ছিলেন আদরের সিতু। কিন্তু স্কুলে তিনি ছিলেন একাধারে ক্লাসের ফার্স্টবয় এবং দুষ্টুর শিরোমনি। প্রচলিত ধারণা ছিল—ভালো ছাত্ররা ধীরস্থির হয়, তারা দুষ্টুমি করে না; আর দুষ্টু ছেলেরা ফার্স্ট হয় না। মুজতবা আলী এই ধারণাটা বদলে দিয়েছিলেন। সিলেটে তখন খুব ভূমিকম্প হতো। স্কুল কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল—ভূমিকম্প টের পাওয়ামাত্র ক্লাস ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু দেখা গেল, শুধু মুজতবা আলী এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ভূমিকম্প টের পাচ্ছেন এবং স্কুল ত্যাগ করছেন! এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় তাদের অভিসন্ধি ধরা পড়ে যায়। ব্যাপারটা কী? মুজতবা মশাই তো ভূমিকম্প ছাড়াই ভূমিকম্পের অভিনয় করে ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছেন!

মুজতবা আলী যখন দুষ্টুমি করার জন্য প্রায়শই সবার কাছে বকুনি খেতেন, তখন মনের দুঃখে নিচের ছড়াটি রচনা করে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তিনি—
'ই কুল খাইলাম হি কুল খাইলাম
খাইলাম দশর গাইল
হাওয়ার গুড়িত দড়ি বান্ধিয়া
সিতু মিয়া ডাইল'।

অর্থাৎ আমি এ কুল ও দুই কুলই হারালাম, সবার গালিও খেলাম, বাতাসের গোড়ায় দড়ি বেঁধে আমার সর্বনাশ হলো। পরম দুঃখের বিষয়—খুদে সাহিত্যিকের এই সাহিত্যপ্রয়াস কোনোভাবেই তার কৃতকর্মের কৈফিয়ত বা সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ না হয়ে কৌতুক হয়েই বিবেচিত হলো, আর কী জুটলো তা তো বুঝতেই পারছেন প্রিয় পাঠক! তবে এসব দুষ্টুমি তার ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া ঠেকাতে পারেনি।

লেখক শিমুল সালাহ্উদ্দিন, ২০০৭ সালে আজিমপুর গোরস্তানে সৈয়দ মুজতবা আলীর কবরের পাশে বসা। লেখকের কোলে সৈয়দ মুজতবা আলির 'দেশে বিদেশে'। ছবিটি তুলেছিলেন লেখকের ফটোগ্রাফার বন্ধু আবু বরকত।
১৯২১ সালে সিলেটে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ এসে আঘাত করে। মুজতবা আলী তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র, ক্লাসের ফার্স্ট বয়। সেবার স্বরস্বতী পূজার সময় কয়েকজন হিন্দু ছাত্র ডেপুটি কমিশনারের বাংলো থেকে ফুল চুরি করে। শাস্তিস্বরূপ সেই ছাত্রদের বেত মারা হয়। প্রতিবাদে সকল ছাত্র ধর্মঘট করে। মুজতবা আলী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ছাত্রদের এই আচরণে ডেপুটি কমিশনার ডসন সাহেব ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের অভিভাবকদের—বিশেষত যারা সরকারী কর্মচারী—কঠোর তিরস্কার করেন। মুজতবার বাবা তাকে ধর্মঘট পরিত্যাগ করতে বললেন। কিন্তু তিনি অনমনীয়। কিছুতেই ধর্মঘট ত্যাগ করতে রাজী হলেন না। তখন বাবা সব দিক বিবেচনা করে তাকে সিলেটের বাইরে পাঠিয়ে দিতে মনস্থ করলেন।

এ কথা শুনে মুজতবা নিজে থেকেই সদ্যপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীতে অধ্যয়নের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তখন বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনা করতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মুজতবা আলী বিশ্বভারতীতে গেলেন এবং সেখান থেকেই গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বিশ্বভারতীর প্রথম বছরের গ্র্যাজুয়েট। বিশ্বভারতীতে তিনি ছিলেন প্রথম দিককার স্টুডেন্টদের একজন। আর তখনই ঘটে সেই বিখ্যাত ঘটনা—রবীন্দ্রনাথের সাইন নকল করতে পারতেন তিনি। একবার রবীন্দ্রনাথের সাইন নকল করে ভুয়া নোটিশ দিয়ে বসলেন। নোটিশে লিখলেন "আজ ক্লাস ছুটি।" রবীন্দ্রনাথের আদেশ! ছাত্ররা আর কী করবে? কেউ সেদিন আর ক্লাসে গেল না। ব্যাপার বুঝতে পেরে নাকী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ হেসে কুটি কুটি হয়েছিলেন।

১৯২৭ সালে মুজতবা আলী কাবুল কৃষি কলেজে শিক্ষকতার দায়িত্ব নিয়ে আফগানিস্তানে গেলেন। তৎকালীন আফগান শাসক আমানুল্লাহ খানের আমন্ত্রণে তিনি কাবুলে যান এবং সেখানেই তার শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। ১৯২০-এর দশকের আফগানিস্তান তখন আমানুল্লাহ খানের মডার্নিস্ট প্রজেক্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আমানুল্লাহ ও তার স্ত্রী সুরাইয়া তখন আফগানিস্তানে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার আনার চেষ্টা করছিলেন। সেক্যুলার এডুকেশন, নারীর সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ইনফ্লুয়েন্স থেকে আরও স্বাধীন করার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু এই রিফর্ম প্রোগ্রাম সেখানকার কনজার্ভেটিভ ফোর্সের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ১৯২৮-২৯ সালের দিকে হাবিবুল্লাহ কালাকানির নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়। কাবুলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে মুজতবা আলীকেও আফগানিস্তান ছাড়তে হয়। কার্যত সেখানকার ভারতীয়রা বন্দীদশায় আটকে পড়েন। মুজতবা আলী বহু কাঠখড় পুড়িয়ে দেশে ফিরে আসেন। তার এই দুই বছরের আফগানিস্তান বাসের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা 'দেশে বিদেশে'-তে। এই বইটার ম্যাটেরিয়াল মূলত তার আফগান লাইফের এক্সপেরিয়েন্স থেকে এসেছে। ১৯৪৮ সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের পর ১৯৪৯ সালে কলেজ স্ট্রিটের নিউ এইজ পাবলিশার্স থেকে 'দেশে বিদেশে' বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হয়।

শুরুতে বার্লিন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেও সেখানকার হইহট্টগোল তার ভালো লাগেনি। পরবর্তীতে তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন।
'দেশে বিদেশে'র সবচেয়ে বড় লিটারেরি ইনোভেশন— সৈয়দ মুজতবা আলী আফগানিস্তানকে ঔপনিবেশিক চশমা দিয়ে উপস্থাপন করেন নাই। তখনকার কলোনিয়াল ট্রাভেল রাইটিংয়ের স্ট্রাকচার ছিল অনেকটা এমন—আমি সিভিলাইজড অবজার্ভার আর ওরা এক্সোটিক অবজেক্ট। মুজতবা আলী সে পথে হাঁটেন নি। তিনি নিজে যে কলোনাইজড বাঙালি ট্রাভেলার, এবং আফগানিস্তান যে তার কাছে একটা অ্যান্টিকলোনিয়াল পসিবিলিটি—এই ফিলিংস 'দেশে বিদেশে'তে চমৎকারভাবে পাওয়া যায়।

এর কিছুদিন পর তিনি হামবোল্ড বৃত্তি নিয়ে জার্মানীতে যান। এ স্কলারশিপ নিয়ে তার সকৌতুক বর্ণনা আছে ' দেশে-বিদেশে' বইটিতে। গোডেসবার্গ শহরের রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে যেতে দেখেন একটা বাড়ির সুমুখে লেখা "আলেক্সান্ডার ফন হুমবোল্ট স্টিফটুঙ"। তারপর কী হয়? ভদ্রলোক যেন সাপের ছোবল খেয়ে চেয়ার থেকে লম্ফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন—"কী চল্লিশ বছর পূর্বে!" মুজতবা আলীও তাজ্জব বনে গিয়ে বললেন—"ব্রাদার ইহজনমে এমন অনেক কিছুই আছে যা তুমিও দেখো নি, আমিও দেখি নি। তুমি কি আপন পিঠ দেখেছ? তাই বলে কি সেটা নেই?"

শুরুতে বার্লিন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেও সেখানকার হইহট্টগোল তার ভালো লাগেনি। পরবর্তীতে তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখানে দুই বছর পড়াশোনার করার পর তিনি PhD ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৬ সালে Buchdruckerei R. Mayr থেকে তার ডিজার্টেশন প্রকাশিত হয়। ১১১ পেজের সেই ডিজার্টেশনের শিরোনাম ছিল 'The Origin of Khojhas and Their Religious Life Today'। তিনি যে খোঁজা কমিউনিটি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, তা সাউথ এশিয়ান মুসলিম হিস্ট্রি এবং ইসমাইলি রিলিজিয়াস আইডেন্টিটির একটা ইম্পোর্টেন্ট চ্যাপ্টার। এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা তার ডিজার্টেশনকে আজও খোজা স্টাডিজের বিবলিওগ্রাফিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রেখেছে। ১৯৩২ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তার কিছুদিন পর আবারো ইউরোপ যান, এবং সেখান থেকে মিশরে গিয়ে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। ১৯৩২ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে মুজতবা আলী চারবার জার্মানি ভ্রমণ করেছেন। সেখানে তার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে 'চাচাকাহিনী', 'ময়ূরকণ্ঠী', 'পঞ্চতন্ত্র', 'দেশে-বিদেশে' বইগুলোতে।

মুজতবা আলীর হিউমার সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে। পরিস্থিতি রস এবং ভাষিক রসের সাথে তার বুদ্ধিবৃত্তিক রসের ব্লেন্ডিং তাকে একজন "যেকোন রম্যলেখক" থেকে আলাদা করে।

দেশে ফিরে তিনি বরোদার মহারাজা সোয়াজী রাওয়ের আমন্ত্রণে বরোদা কলেজে আট বছর অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৮ এর দিকে তার প্রথম বই 'দেশে বিদেশে' প্রকাশিত হয় এবং বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। মূলত তখন থেকেই তার লেখালেখির আনুষ্ঠানিক সূচনা। দেশবিভাগের পর মুজতবা আলী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে বগুড়া কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। কিন্তু তার প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক মনোভাব তদানীন্তন সরকার ভালো চোখে দেখেনি। বিশেষ করে তার রচিত "পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা" শীর্ষক পুস্তিকা প্রকাশিত হলে সরকার তার উপর অতিশয় ক্ষুব্ধ হয়। এসব কারণে গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি ভারতে চলে যান এবং সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বহুদিন অল ইন্ডিয়া রেডিওর কটক শাখার পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। এর মাঝে তিনি ভারত সরকারের Cultural Relations বিভাগের সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্বভারতীতে ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন, এবং ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকাতেই মারা যান, সৈয়দ মুজতবা আলীকে দাফন করা হয়েছে আজিমপুর কবরস্থানে।

তিনি এক আশ্চর্য মানুষ ছিলেন, নানা সাক্ষাৎকার আর নথি ঘেঁটে জানা যায় মুজতবা আলী ছিলেন বহুভাষাবিদ, পণ্ডিত। তিনি জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, আরবি, ফার্সী, সংস্কৃত, হিন্দি, উর্দু, গুজরাটি, মারাঠীসহ প্রায় পনেরটি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। তার ভাষায় বাংলা, সিলেটি, আরবি, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃত, ইংরেজি, জার্মান অবলীলায় মিশে যেতে পারত—তার কারণ তার গদ্যের ধরন অনেক মজলিশি ঘরানার। একটা কনভার্সেশনাল, গসিপি টোনের কারণেই তার লেখা এত মজার লাগে।

কিন্তু মুজতবা আলীকে যে রম্যলেখক বলে লেবেল করা হয়, তাকে অনলি হিউমারিস্ট বলা একটু সমস্যার বলে আমি মনে করি। মুজতবা আলীর হিউমার সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে। পরিস্থিতি রস এবং ভাষিক রসের সাথে তার বুদ্ধিবৃত্তিক রসের ব্লেন্ডিং তাকে একজন "যেকোন রম্যলেখক" থেকে আলাদা করে। সৈয়দ মুজতবা আলীর রসের মধ্যে থাকে সমাজের প্রতি তীব্র সমালোচনা। এঁকে সৈয়দ মুজতবা আলীর ইউনিক ফিচার হিসেবে ধরা যেতে পারে। আরেকটা জিনিস বোঝা যায় তার গদ্য পড়লে—তিনি পণ্ডিত ছিলেন, কিন্তু পাণ্ডিত্যজাহির করার কারবার তার গদ্যে নাই। সামান্য কৌতুক থেকে ইতিহাস, ইতিহাস থেকে দর্শন, দর্শন থেকে ভাষাবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞানের সাথে নৃবিজ্ঞান আর এসবের সাথে রাজনীতির মিশেল তার লেখাকে প্রাতিষ্ঠানিক বক্তৃতার বাইরে বের করে আনতো। তার লেখা পড়লে যে কারও মনে হতে বাধ্য যে আপনি একজন রসিক, বুদ্ধিমান লোকের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন। তার সুগভীর পাণ্ডিত্যকে ছাপিয়ে সবসময়ই প্রকাশ পেয়েছে তার সুপ্রসন্ন হাস্যরস, চিত্তহারী বর্ণনা। হাস্যরসের এক অফুরন্ত ডেটা ব্যাংক যেন সৈয়দ মুজতবা আলী। সেখানে আছে পরশুরামের প্রসন্ন হাস্যরস, বঙ্কিমচন্দ্রের বিষণ্ণ হাস্যরস, ত্রৈলোক্যনাথের হৃদয়বৃত্তি, প্রমথ চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তি। মুজতবা আলীর আরেকটি দিকের কথা না বললে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে—সেটা হচ্ছে মাতৃভাষার প্রতি তার অপরিসীম অনুরাগ আর ভক্তির কথা। আজীবন তিনি মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠার সমর্থনের লিখে গিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন মাতৃভাষাই হচ্ছে শিক্ষার উপযুক্ত বাহন। এই ধারণা থেকেই তিনি দেশবিভাগের পরপরই সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সভায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে "পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা" নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে—তিনি বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করে। তখনো খোদ ঢাকাতেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠে নি, মফস্বল তো "দূর কী বাৎ'। সেসময়ই তিনি বলেছেন—"পূর্ব পাকিস্তানের অনিচ্ছাসত্ত্বেও যদি তার উপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়া হয় তবে স্বভাবতই উর্দুভাষাভাষীরা কেবল নিষ্কর্মা ভাষার জোরেই পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করবে। এবং এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একদিন বিদ্রোহ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।" তার এই দূরদৃষ্টি যে কতটা সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হয়েছে আরো চব্বিশ বছর পরে, ১৯৭১ সালে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে পূর্ব পাকিস্তান কেবল বিচ্ছিন্নই হয় নি। স্বাধীন বাংলাদেশরূপে বিশ্ব মানচিত্রে উদ্ভাসিত হয়েছে।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মুজতবা আলী মৃত্যুবরণ করেন।

সৈয়দ মুজতবা আলী'র রচনাসমগ্র পড়ে আমার মধ্যে একটা ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি শুধুই একজন রম্যলেখক নন, তার নাম শুনলে আমার মনে শুধু এক রম্যলেখকের ছবি ভেসে উঠে না, ভেসে উঠে বিপুল বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতাসঞ্জাত জীবন, চিন্তাচেতনার বহুমাত্রিকতায়, মৌলিক চিন্তাধারণায় উদ্ভাসিত, অননুকরণীয় ভাষার উজ্জ্বল কারুকার্যে সুশোভিত এক পরিপূর্ণ সাহিত্যিকের ছবি। তার ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে বিচিত্র ও মিশ্র উপাদানে, জন্মেছেন বঙ্গ প্রদেশের বাইরে, পড়াশোনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে, কিছুদিন কায়রোতে, এক পর্যায়ে জার্মানীর বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। চাকরি সুবাদে লাভ করেছেন কাবুল ও বরোদা বাসের অভিজ্ঞতা। ব্যাপক সফর ও বিদেশভ্রমণ, অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার যোগফল—প্রাচ্য প্রতীচ্যের অনেকগুলো ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন, একেবারে বিশ্বনাগরিকের আদর্শ যেনও। তবে ভাষাবিদ গ্রন্থকীট মানুষেরা, যারা পাণ্ডিত্যের গৌরব নিয়ে চলতে ভালোবাসেন—তাদের সাথে এই সুরসিক, আড্ডাবাজ, সর্ব-চলিষ্ণু, ঠিকানা-পরিবর্তন-প্রবণ, সাংবাদিকসুলভ সজাগচক্ষু এই মানুষটির কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাঠক হিসেবে তার আগ্রহ সাহিত্যে, ধর্মে, দর্শনে, পুরাতত্ত্বে—কোথায় নয়!

তাই আজকে সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিনে কৃতজ্ঞচিত্তে তাকে স্মরণ করছি। শুভ জন্মদিন, প্রিয় মুজতবা আলী! আপনি যেখানেই থাকুন, আপনার সেই অমল সহজ কলমের স্পর্শে আমরা চিরকাল রম্যরসের এক অতুলনীয় জগতে প্রবেশ করতে থাকবো। আমি যেমন এই লেখার মধ্যে দিয়ে আপনার লেখার সেই মজলিশি আড্ডায় আবারও সবাইকে আমন্ত্রণ জানালাম।

    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    সারা জীবনের উপার্জনে স্কুল করেছেন রেখা

    সারা জীবনের উপার্জনে স্কুল করেছেন রেখা

    ডেঙ্গুতে ৪ গুণ বেশি মৃত্যুঝুঁকি অন্তঃসত্ত্বার, শঙ্কায় অনাগত শিশুও

    ডেঙ্গুতে ৪ গুণ বেশি মৃত্যুঝুঁকি অন্তঃসত্ত্বার, শঙ্কায় অনাগত শিশুও

    ছয় বছরেও চালু হয়নি ৬ কোটির বাস টার্মিনাল

    ছয় বছরেও চালু হয়নি ৬ কোটির বাস টার্মিনাল

    ব্রিকস বর্জন কেউ বলছেন যৌক্তিক, কারও কাছে সুযোগ হাতছাড়া

    ব্রিকস বর্জন কেউ বলছেন যৌক্তিক, কারও কাছে সুযোগ হাতছাড়া

    হুতিরা ফোনে আমাকে বলেছে, তারা লড়াই করতে চায় না: ট্রাম্প

    হুতিরা ফোনে আমাকে বলেছে, তারা লড়াই করতে চায় না: ট্রাম্প

    আ.লীগের মিছিল নিয়ে প্রশ্ন-চিন্তা

    আ.লীগের মিছিল নিয়ে প্রশ্ন-চিন্তা

    পাসপোর্ট অফিসে টাকা ছাড়া মেলে না সেবা

    পাসপোর্ট অফিসে টাকা ছাড়া মেলে না সেবা

    জিবুতিতে পালিয়েছেন শত শত ইয়েমেনি

    জিবুতিতে পালিয়েছেন শত শত ইয়েমেনি

    আসিফ নজরুলের দুইটা ছাগলই খাওয়া উচিত ছিল : পাটওয়ারী

    আসিফ নজরুলের দুইটা ছাগলই খাওয়া উচিত ছিল : পাটওয়ারী

    আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

    আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

    নিয়োগকর্তাকেই কাঠগড়ায় তুললেন মার্শাল

    নিয়োগকর্তাকেই কাঠগড়ায় তুললেন মার্শাল

    চাকরির পরীক্ষা নিয়েও দুই বছরে ফলাফল নেই ৬১০ পদের

    চাকরির পরীক্ষা নিয়েও দুই বছরে ফলাফল নেই ৬১০ পদের

    চট্টগ্রামে বসছে পানির আরও ৯৪ এটিএম বুথ

    চট্টগ্রামে বসছে পানির আরও ৯৪ এটিএম বুথ

    এবার সৌদির সামরিক ঘাঁটিতে হুতিদের হামলা

    এবার সৌদির সামরিক ঘাঁটিতে হুতিদের হামলা

    লিফট রেখে সিঁড়ি বেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী

    লিফট রেখে সিঁড়ি বেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী