জন্মদিনে বোর্হেস স্মরণ
বোর্হেস, রাজু আলাউদ্দিন এবং...

হোর্হে লুই বোর্হেস (জন্ম ২৫ আগস্ট ১৮৯৯—প্রয়াণ ১৪ জুন, ১৯৮৬)। ছবি: কোলাজ
আজ ২৪ আগস্ট, ২০২৬। ঢাকার এক আর্দ্র বিকেলে অফিসের ডেস্কে বসে আমি ভাবছি— বুয়েনোস আইরেস থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, এই শহরে, কী করে এক আর্জেন্টাইন লেখকের জন্মদিন আমাদের এত কাছে নিয়ে এলো? হোর্হে লুইস বোর্হেসের আজ একশো সাতাশ বছর পূর্ণ হলো। তিনি নেই। চোখের আলো হারিয়েছিলেন প্রয়াণের বহু আগেই, কিন্তু তাঁর কল্পভূবনের সারি সারি আলো আজও জ্বলছে। তাঁর গোলকধাঁধাগুলো, বিস্রস্ত আয়নাগুলো, অসীম গ্রন্থমালা—সবই যেন আজও শ্বাস নিচ্ছে।
আমার বোর্হেসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আসলে রাজু আলাউদ্দিনের সূত্রে পাওয়া। আশির দশকের প্রথমার্ধে তিনি যখন বোর্হেসের ‘ছোরা’ কবিতাটি পড়েন, তখন তিনি জানতেন না যে এই মুগ্ধতা তাকে আজীবন টেনে নিয়ে যাবে। কবি রফিক আজাদের অনুবাদে সেই কবিতায় একটি ড্রয়ারে রাখা ছোরা, যা স্পর্শ করলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে— সেটি সিজারকে হত্যা করেছিল। জড় বস্তুর ভেতর প্রাণ সঞ্চারের সেই অলৌকিক ব্যাপারটিই রাজু আলাউদ্দিনকে প্রথম টেনে নেয় এক অনন্য আলাদা সাহিত্যের জগতে। তিনি বুঝতে পারেন, বোর্হেস শুধু গল্পকার বা কবি নন; তিনি এক দার্শনিক জাদুকর, যিনি পাঠককে যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব বলে বিশ্বাস করাতে সক্ষম।
একদিন আমি রাজু ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বোর্হেসকে তো লেখকদের লেখক বলা হয়। এত জটিল একজন লেখকের রচনা থেকে বাছাই করে বাংলায় সংকলন করার উদ্যোগ কেন নিলেন?’ তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘বোর্হেস জটিল, সত্যি, কিন্তু সে জটিলতা কখনো বোঝা নয়—সেটা আনন্দ। তাঁর টেকনিক নিঃসন্দেহে জটিল, সেই শিল্পকৌশল, সেই গল্প গড়ার ঢং—তা বোঝা কঠিন। তাই অনেক বড় লেখকও তাঁকে গুরু মানেন। কিন্তু গল্পের বিষয়, তার কল্পনা—তা অসাধারণ আনন্দের। প্ররোহী পথের বাগান গল্পে একটি অন্তহীন উপন্যাসের কথা বলা হয়েছে, যেখানে অসংখ্য সময় একসঙ্গে আছে, প্রতিটি সময়ের আলাদা স্বভাব। আপনি কি ভিজুয়ালাইজ করতে পারেন? সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মতো জমজমাট। ট্লন, উকবার, অরবিস টাসিয়াস—এসব নাম শুনলেই মনে হয় কোনো অজানা গ্রহের গল্প। এই সবই তাঁর কল্পনার খেলা, আর এই খেলাতেই যত মজা।’
রাজু আলাউদ্দিনের কথায় আমি বারবার ফিরে আসি, তার হাত মন মগজ হয়েই তো বোর্হেস হয়েছে আমাদের। তিনি বলেন, ‘আপনি গার্সিয়া মার্কেসের কথা দেখুন। সাধারণ মানুষও পড়ে, আবার মননশীল পাঠকেরাও পড়ে। বোর্হেস পণ্ডিতধাঁচের লেখক, কিন্তু পাণ্ডিত্য আর দার্শনিক ধাঁধা তাঁর কাছে খেলার জিনিস। তিনি পাঠককে আমন্ত্রণ জানান তাঁর কাল্পনিক ভুবনে—গল্পের ছলে, প্রবন্ধের ছদ্মবেশে। আর সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিলেই পাওয়া যায় অপার আনন্দ।’
আজ, এই জন্মদিনে, আমি যেন বোর্হেসের সেই কথাই শুনতে পাই—‘আমি আমার লেখার চেয়ে আমার পাঠ নিয়েই বেশি গর্বিত।’ রাজু আলাউদ্দিনও যেন সেই পাঠের ধারাকে বাংলায় ধারণ করে চলেছেন। তাঁর হাত ধরেই বোর্হেস এলেন বাংলায়—প্রথমে ‘ঐতিহ্য’ থেকে পাঁচ খণ্ডে, আর এখন ‘কাগজ প্রকাশন’-এর ‘নির্বাচিত বোর্হেস’-এ। এই সংকলনটি কিন্তু হঠাৎ আসেনি। রাজু আলাউদ্দিন জানান, তিনি ১৯৯৭ সালে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে মেক্সিকো চলে যাওয়ার পর দশ বছর প্রকল্প থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ তিন বন্ধু কাজটা এগিয়ে নিয়ে যান। দেশে ফিরে নতুন উদ্যমে তিনি সম্পাদনা শেষ করেন। আজ সেই বই প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বোর্হেস নিজেই আমার জন্য এক আনন্দ। তার ওপর এই বইয়ের প্রকাশনা তো আরেক বাড়তি আনন্দ। আমি কৃতজ্ঞ অনুবাদকদের প্রতি, যাঁদের শ্রমে বইটি সম্ভব হয়েছে।’
বোর্হেসের জীবনটা যেন তাঁর গল্পগুলোর মতোই। ১৮৯৯ সালে বুয়েনোস আইরেসে জন্ম। পিতা আইনজীবী ও দর্শনের অধ্যাপক, মাতা স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরদের বংশধর। দ্বিভাষিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তিনি শেকসপিয়র, সের্ভান্তেস, স্টিভেনসন—সবাইকে মূল ভাষায় পড়েছেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জেনেভায় চলে যান, সেখানে আধুনিক ভাষা ও দর্শন নিয়ে পড়াশোনা। পরে স্পেনে উল্ট্রাইস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন—সংক্ষিপ্ততা, সাহসী কল্পনা আর উদ্ভাবন তাঁর শৈলীতে স্থায়ী ছাপ ফেলে। ১৯২১ সালে বুয়েনোস আইরেসে ফিরে ‘ফেরভোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (১৯২৩) দিয়ে আত্মপ্রকাশ। ‘প্রিসমা’ আর ‘প্রোয়া’-র মতো পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করে তিনি আর্জেন্টিনীয় সাহিত্যকে নতুনভাবে বিন্যাস্ত করেন।
তাঁর আসল খ্যাতি আসে ১৯৪০-এর দশকে। ‘ফিকসিওনেস’ (১৯৪৪) আর ‘এল আলেফ’ (১৯৪৯)—এই দুই সংকলন আধুনিক গল্পকথনের চেহারা বদলে দেয়। ‘দ্য লাইব্রেরি অফ বাবেল’-এ মহাবিশ্ব এক অসীম গ্রন্থাগার, যেখানে সম্ভাব্য সব বই আছে। ‘পিয়ের মেনার্ড, অথর অফ দ্য কুইক্সোট’-এ লেখকত্ব আর মৌলিকতার ধারণা উল্টে যায়; পাঠকই সেখানে লেখক এবং পাঠ মানেই সৃজনকর্ম। ‘এল আলেফ’-এর শিরোনাম গল্পে একটি বিন্দুর মধ্যে আছে সব বিন্দু—যেন এক নিমেষে সব জ্ঞান, যেন বিন্দুতে সিন্ধু। তাঁর গল্পে বারবার ফিরে আসে গোলকধাঁধা, আয়না, অসীম পশ্চাদপসরণ, দ্বৈত সত্তা। তিনি যেন বাস্তবতাকেই এক বিস্ময়কর ধাঁধায় পরিণত করেন।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে বংশগত চক্ষুরোগে ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যান বোর্হেস। কিন্তু অন্ধত্ব তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি মুখস্থ নির্ভরতা আর সহায়কদের কাছে শুনিয়ে শুনিয়ে রচনা শুরু করেন—এতে তাঁর সাহিত্য হয়ে ওঠে আরও মৌখিক, স্মৃতিনির্ভর, ঘনীভূত। এই সময়েই ‘ল্যাবিরিন্থস’ (১৯৬২) ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়, তার আগে অবশ্য এটি ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই গ্রন্থের প্রকাশের সূত্রে ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আদোলফো বিওই কাসারেসের সঙ্গে গোয়েন্দা গল্পের সিরিজও রচনা করেন—খেলার ছলে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলার এক অসাধারণ দক্ষতা তাঁর।
ডেনমার্কের বোর্হেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ইভান আলমেইদা আর ক্রিস্টিনা পারোদি যেমন বলেছেন, বোর্হেস প্রতিটি রচনাকে এক আস্তিত্ববাদী ধাঁধা হিসেবে সাজিয়েছেন। তাঁর কল্পজগতে আছে চমত্কার অন্টোলজি, ইউটোপিয়ান ব্যাকরণ, কাল্পনিক ভূগোল, বহু-বিশ্বের ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যার প্রাণীকোষ, ধর্মীয় থ্রিলার, নস্টালজিক জ্যামিতি—আর সব কিছুর ওপরে দর্শন, যা বিস্ময়, আর কবিতা, যা যুক্তির গভীরতম রূপ। তিনি বইকে বিশ্বরূপে আর বিশ্বকে বইরূপে পড়তেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বোর্হেস চর্চা এসেছে দেরিতে। রাজু আলাউদ্দিন বলেন, ইংরেজি সাহিত্যের আধিপত্য স্প্যানিশ সাহিত্যকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আর শওকত ওসমানের অনুবাদগুলো ছিল সেই ব্যবধানের সেতু। বিশেষ করে শওকত ওসমানের ‘স্পেনের গল্প’—বইটি রাজু আলাউদ্দিনের কাছে বিশেষ স্মরণীয়। এর আগে বেলাল চৌধুরী আর জাকারিয়া সিরাজী পত্র–পত্রিকায় বোর্হেসের এক–দুটি গল্প অনুবাদ করেছিলেন, কিন্তু তা ব্যাপক ছিল না। মেহেবুব আহমেদের ‘নদী প্রকাশনী’-র সংকলনটি ইংরেজি থেকে অনূদিত হলেও রাজু আলাউদ্দিন মান নিয়ে কিছু আপত্তি জানান।
অনুবাদ প্রসঙ্গে রাজু আলাউদ্দিনের একটা চমৎকার পর্যবেক্ষণ আছে। তিনি বলেন, ‘একটি ইতালীয় প্রবাদ আছে—অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু বোর্হেস নিজে অনুবাদ নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, অনুবাদক মূল লেখকের প্রতি বিশ্বস্ত না থাকলেই বরং উত্কৃষ্ট অনুবাদ সম্ভব—অনুবাদকের স্বাধীনতার কথা বলেছেন তিনি। অন্যদিকে তিনি নিজে যখন ওয়াল্ট হুইটম্যান বা ফকনার অনুবাদ করেছেন, তখন মূলানুগ থেকেছেন। এটি এক স্ববিরোধিতা, কিন্তু সেটাই বোর্হেসের চিন্তার মজা।’ রাজু আলাউদ্দিন নিজেও মূলের কাছাকাছি থাকতে চান, পাশাপাশি বাংলায় যেন পাঠযোগ্যতা থাকে, সেই চেষ্টা করেন। তিনি মনে করেন, অনুবাদ শেষ পর্যন্ত একটি সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম।
বোর্হেসের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক কিন্তু শুধু অনুবাদের সূত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুয়েনোস আইরেসে গেলে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বাড়িতে থাকাকালীন বোর্হেসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রবীন্দ্রনাথ কিপলিংকে পছন্দ করতেন না, অন্যদিকে বোর্হেস ছিলেন কিপলিংয়ের ভক্ত—এ নিয়ে তাঁদের তর্কও হয়েছিল। বোর্হেস অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কেও জানতেন, লিখেছেনও তাঁকে নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ রচনা। তাঁর লেখায় বাংলার ডোরাকাটা বাঘ, বাংলার গোলাপ, কলকাতা, মুম্বাই, গৌতম বুদ্ধ—সবই এসেছে। গৌতম বুদ্ধ নিয়ে তাঁর একটি সম্পূর্ণ বই আছে। মারিও বার্গাস ইয়োসার নেওয়া শেষ সাক্ষাৎকারে বোর্হেস বলেছিলেন, তিনি চীন আর ভারত দেখতে চান—যদিও কখনো আসতে পারেননি, কিন্তু সাহিত্যের মাধ্যমেই তিনি সেখানে ভ্রমণ করেছেন।
আজ, এই জন্মদিনে, আমি রাজু আলাউদ্দিনের কথাই বারবার মনে করি। তিনি বলেন, ‘বোর্হেস জটিল কিন্তু আনন্দদায়ক—ভীষণ রকমের আনন্দদায়ক।’ আর এই আনন্দটাই যেন তিনি বাংলায় ছড়িয়ে দিতে চান। তাঁর অনুবাদে বোর্হেসের গোলকধাঁধা, আয়না, অসীম গ্রন্থাগার—সবই এখন বাংলাভাষী পাঠকের অভিজ্ঞতার অংশ। তিনি নিজেও স্বীকার করেন, তিনি এখনও বোর্হেস নিয়ে পুরোপুরি তৃপ্ত নন—আরও কাজ বাকি। পাঠকদের জাগ্রত কৌতূহলই তাঁকে নতুন নতুন উদ্যোগে উৎসাহিত করে।
ঢাকার এই বিকেলে, বোর্হেসের জন্মদিনে, আমি মনে করি—সত্যিকারের মহান সাহিত্য কোনো সীমানা মানে না। আর একজন অনুবাদকের নিষ্ঠাই পারে সেই মহাসমুদ্রের ঢেউ তুলে আনতে। বোর্হেস হয়তো এখানে আসেননি, কিন্তু তাঁর শব্দগুলো এসেছে—রাজু আলাউদ্দিনের হাত ধরে। আর আজ, শতাব্দী পরে, সেই শব্দগুলো আমাদের মাঝে বেঁচে আছে, গোলকধাঁধার মতো, আয়নার মতো, অসীম গ্রন্থাগারের মতো—যেখানে প্রতিটি পাঠক খুঁজে নিতে পারে নিজের অনন্তকাল।
রাজু আলাউদ্দিনের কথায় ফিরি— ‘এই আনন্দ উপভোগ করার জন্য গল্পের আকারে কিংবা প্রবন্ধের ছদ্মবেশে তাঁর সৃষ্টিশীলতার কাল্পনিক ভুবনে বোর্হেস পাঠককে আমন্ত্রণ জানান।’ বোর্হেস যেমন বলেছেন, ‘স্বর্গ হবে এক ধরনের গ্রন্থাগার।’ আর রাজু আলাউদ্দিন যেন সেই স্বর্গের দরজাটা খুলে দিয়েছেন বাংলা ভাষাভাষি পাঠকের জন্য, পাঠকের কাজ কেবল নিজের মনোযোগের বিনিয়োগে ঠিকঠাক আস্বাদটুকু করা।
লেখক: হেড অব ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ এন্ড ইভেন্টস ও সাহিত্য সম্পাদক, আগামীর সময়








