জন্মদিনের উদযাপন
অরুণ মিত্র : জীবন ও কবিতার অন্তর্লীন ভুবন

অরুণ মিত্র (জন্ম ২ নভেম্বর, ১৯০৯ সাল — মৃত্যু ২২ আগস্ট, ২০০০ সালে)
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার বিস্তীর্ণ ভুবনে অরুণ মিত্র এক অনন্য ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের অধিকারী। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক এবং অনুবাদক। তার কবিতায় যুগযন্ত্রণা, সাম্যবাদী চেতনা, নাগরিক জীবনের দ্বান্দ্বিকতা এবং বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর টান এক আশ্চর্য সরলতায় মিলেমিশে আছে। তিনি মিছিলের কবি, কিন্তু মিছিলের যাত্রী নন— এই মূল্যায়নই তার কবিতার স্বরূপকে হয়তো সবচেয়ে ভালোভাবে ধরে রাখে। প্রথাগত ছন্দের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে তিনি গদ্যস্পন্দের ভেতর খুঁজে পেয়েছিলেন মুক্তির আকাশ। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে— ’প্রান্তরেখা’। সারাজীবনে খুব বেশি যে কবিতা তিনি লিখেছেন, তা নয়। তবে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অরুণ মিত্রের নাম আসবেই। শঙ্খ ঘোষ তার কবিতা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘আরেকরকম কবিতা আছে, যার বাইরের কোনো ঠমক নেই, জৌলুশ নেই, অর্ধমনস্ক পাঠককে কাছে টেনে নেবার মতো কোনো বড়োরকমের আড়ম্বর নেই, আছে কেবল কথাবলার একটা মগ্ন স্রোত’। এই মগ্ন স্রোতই অরুণ মিত্রের কবিতার প্রাণভোমরা।
২.
অরুণ মিত্রের জন্ম ১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর, অধুনা বাংলাদেশের যশোর শহরে। তার পিতা হীরালাল মিত্র ও মাতা যামিনীবালা দেবী। ছয় পুত্র-কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব কেটেছে যশোর শহর আর মামাবাড়ির সাংস্কৃতিক আবহে। সে-সময়ের যশোর ছিল নগর ও গ্রামের মেশামেশি এক জনপদ— দালানকোঠার পাশে কুঁড়েঘর, পাকা পথের পাশে মাটির কাঁচা পথ, পুকুর আর ডোবার পাশাপাশি ঝোপঝাড়, বাঁশবন আর নারকেল-সুপুরির জটলা। অরুণ মিত্র নিজেই লিখেছেন, ‘শহর থেকে একটু পা বাড়ালেই নির্ভেজাল গ্রাম। ফলে আমরা গ্রামের ছেলে ছিলাম না শহরের, তা বলা কঠিন। বসবাসের অনুভূতিটাও মেলানো মেশানো ছিল’।
এই শহরগ্রামেমেশা পরিবেশই তার কবিতার মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর টান তৈরি করেছিল। তার মামাবাড়ি ছিল তরুণদের এক মিলনকেন্দ্র, যেখানে ‘প্রবাসী’ পত্রিকা আসত, ছিল গ্রামোফোন, গানের রেকর্ড এবং নানা রকম বই। সেখানে সন্ত্রাসবাদী, গান্ধীবাদী ও সাম্যবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের আনাগোনা ছিল, কেউ কেউ ছিলেন সাহিত্যানুরাগীও। এই পরিবেশেই তার সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক চেতনার বীজ রোপিত হয়।
অল্পবয়সেই অরুণ মিত্র শিক্ষাকল্পে কলকাতায় চলে যান। কলকাতার বঙ্গবাসী স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত। ১৯২৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৩০ সালে রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন। এই সময়ে সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতের প্রতি তার অধিক আকর্ষণ তৈরি হয়। ভিক্টর হুগোর উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ পড়ে তিনি ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফরাসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। বিএ পাসের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পড়া শুরু করলেও পারিবারিক দায়দায়িত্বের চাপে তা অসমাপ্ত রেখে ১৯৩১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি নিতে বাধ্য হন।
৩.
আনন্দবাজারে চাকরিকালে তিনি সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় বিভিন্ন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও লেখকগোষ্ঠীর সান্নিধ্যে আসেন এবং মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই সূত্রে ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ ও ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’র সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৪২ সালে আনন্দবাজার ছেড়ে তিনি যোগ দেন সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘অরণি’ পত্রিকায়। অরুণ মিত্রের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোড় আসে ১৯৪৮ সালে, যখন ফরাসি সরকারের আহ্বানে বৃত্তি নিয়ে তিনি গবেষণার জন্য ফ্রান্স গমন করেন। প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘ল্য গ্রুপ দ্য লা রভ্যু ব্লাঁশ’— অর্থাৎ ‘শ্বেত পত্রিকার গোষ্ঠী’। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিল্পী তুলুজ লোত্রেক, সংগীতকার দরসি, সাহিত্যিক আঁদ্রে জিদ ও মার্সেল প্রুস্ত। ফরাসি সাহিত্যে এই গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে তার গবেষণা আজও প্রাসঙ্গিক। ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ কুড়ি বছর সপরিবারে সেখানেই বসবাস করেন। ১৯৭২ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৯০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিক ডি. লিট. উপাধিতে ভূষিত করে এবং ১৯৯২ সালে ফরাসি সরকার ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে নিরন্তর গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘লিজিয়ন অফ অনার’ সম্মানে ভূষিত করে। ২০০০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতায় তার জীবনাবসান ঘটে।
৪.
অরুণ মিত্রের কবিতার ভিত্তি নিহিত তার একান্ত নিজস্ব কবিতাভাবনায়। তিনি ‘কথামুখ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মানুষ ও অন্য প্রাণীর সংস্পর্শ যখন ভেতর থেকে আমাকে নাড়ায় কিম্বা যখন কোনো নিসর্গদৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করে, তখন আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয়। লিখিও প্রায়ই। তবে আমার পৃথিবী মনুষ্যকেন্দ্রিক। আমার দৃষ্টিকে সবচেয়ে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে মানুষ, তার অস্তিত্ব তার জীবন তার আচরণ’। তিনি আরও বলেছেন, ‘পৃথিবী আর মানুষ আর তাদের সংস্পর্শে আমার সত্তা, এই তো আমার কবিতার মূল’। এই মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই তার সমগ্র কাব্যজীবনের ভিত্তি। তিনি ‘নিছক শব্দনির্ভর লিখন চাতুর্য’ অপেক্ষা অধিকতর সত্য বলে মনে করতেন ব্যক্তিসত্তার অনুভব ও উপলব্ধিকে, যার নেপথ্যে রয়েছে অভিজ্ঞতা ও মননের ভূমিকা।
নিজের লিখনকর্ম বিশ্লেষণে তিনি দুটি বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন—
এক, কবিতার পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট বহিরঙ্গ রূপ অপরিহার্য নয়;
দুই, কবিতার একটা কিছু বিষয় থাকে, যা প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে প্রত্যাশা করাই কবিকর্ম— অর্থাৎ কবিতা শুধু শব্দচাতুর্য বা ধ্বনিবিলাস নয়।
এই কবিতাভাবনার প্রকাশ ঘটেছে তার কাব্যগ্রন্থগুলির বিবর্তনে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রান্তরেখা’ (১৯৪৩) প্রকাশিত হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের আবহে। এই গ্রন্থের কবিতাগুলি বেশির ভাগই পদ্যছন্দে, কোথাও কোথাও অন্ত্যমিলও ছিল। যেমন ‘দোটানা’ কবিতায় তিনি লেখেন:
দু’-বাহু ঘেরাও করে বারবার অভ্যস্ত আহ্লাদে
সোনার হরিণ আর স্মরণের বিপর্যন্ত সোনা,
দু’হাতে পাথর কাটা কঠিন, কাঠামো বুঝি বাধে।
হৃদয়ের আন্দোলন ঘড়ির কাঁটায় যায় শোনা।
এই পদ্যছন্দের পরপর ‘উৎসের দিকে’ (১৯৫০/১৯৫৫) কাব্যগ্রন্থ থেকে তিনি প্রথাগত ছন্দমিলের কাঠামো পরিহার করে গদ্য ভেঙে ছোটবড় ছত্রে বিন্যস্ত করে কবিতা লেখা শুরু করেন। এই পরিবর্তনের পেছনে ফরাসি কবিদের প্রভাব ছিল। ফরাসি কবিদের কাছ থেকেই তিনি দুটি শিক্ষা নিয়েছিলেন—
এক, গদ্য-পদ্য যাই হোক, ‘আত্মপ্রকাশই প্রধান কথা’;
দুই, ছন্দ ও মিল কবিতার পক্ষে আবশ্যক নয়।
৫.
অরুণ মিত্রের কবিতার একটা বড় অংশ সৃষ্টিতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলি ভূমিকা নিয়েছিল। ১৯৩৬-এ স্পেনের গৃহযুদ্ধ, ১৯৩৭-এ জাপানের চীন আক্রমণ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু (১৯৩৯), হিটলারের রাশিয়া আক্রমণ (১৯৪১)— ফ্যাসিবাদ-বিরুদ্ধ উদ্দীপনার বিপুল তরঙ্গাভিঘাত তার কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। ‘প্রান্তরেখা’ কাব্যের ‘লাল ইস্তাহার’ কবিতায় তিনি লেখেন:
প্রাচীরপত্রে অক্ষত অক্ষর
তাজা কথা কয়, শোকেও;
কখন আকাশে ভ্রুকুটি হয় প্রখর
এখন প্রহর গোনো।
উপোসী হাতের হাতুড়িরা উদ্যত,
কড়া-পড়া কাঁধে ভবিষ্যতের ভার;
দেবতার ক্রোধ কুৎসিত রীতিমতো;
মানুষেরা, হুঁশিয়ার!
এই একই কবিতার অপর এক পাঠে তিনি লেখেন:
প্রাচীরপত্রে পড়োনি ইস্তাহার?
লাল অক্ষরে আগুনের হল্কায়
ঝলসাবে কাল জানো!
‘কসাকের ডাক: ১৯৪২’ কবিতায় তিনি রাশিয়ার মুক্তির যুদ্ধের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন:
এবার কসাকের কড়া পাঞ্জায় চূড়ান্ত মীমাংসা
এবং পরবর্তী স্তবকে:
সারা দুনিয়ার ভাই হো
এক সাথে দাঁড়াই
দুশমন রাশিয়ার
দুশমন দুনিয়ার
হাতিয়ার দাও ভাই হো
হাতিয়ার।
এই কবিতাগুলিতে তার আন্তর্জাতিকতাবোধ ও সাম্যবাদী দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে অরুণ মিত্রের কবিতায় সাম্যবাদী চেতনা কখনো স্লোগানের উচ্চকিত চিৎকারে পরিণত হয়নি। তিনি প্রত্যক্ষভাবে কোনো সমাজবিশেষকে প্রকাশ করেননি, বরং সাধারণ মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামকেই স্বীকৃতি দিতে চেয়েছেন। ‘মাটির কবর’ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের উত্থান ও জাগরণের কথা আছে, ‘বসন্তবাণী’ কবিতায় আছে অস্ত্রে অস্ত্রে প্রতিরোধের স্মরণীয় উক্তি। দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘বর্তমান দুর্দশা দুর্গতি— যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে— সেসব দূর করা, সমস্ত মানুষ মুক্ত জীবনের স্বাদ পাবে বা নিজের জীবনের স্বাধীনতা পাওয়ার মতো পরিবেশ পাবে, সে রকম ভবিষ্যতের দিকে উন্মুক্ত হয়ে থাকার অর্থে আমি বামপন্থী’। এই বামপন্থী চেতনা তার কবিতায় বক্তৃতার বদলে জীবনবোধের গভীরতায় প্রকাশ পেয়েছে।
৬.
‘উৎসের দিকে’ কাব্যের ‘বর্ষমাণ’ কবিতায় জনসংগ্রামের বক্তব্য এসেছে বেশ অনুচ্চ স্বরে:
থমথমে বাড়ির সারিকে
অসহায় ক’রে
বৃষ্টি এল।
এক বন থেকে অন্য বনে বিচ্ছুরিত সঘন গমক
এসে জোটে চৌকাঠের ধারে
মাথা কেটে বিষাক্ত গরজে
সর্বাঙ্গে আপন ক’রে তাকে ঘুম পাড়াবার
আমার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল।
‘সঞ্জীবনী’ কবিতায় রূপকের মোড়কে গড়া শরীরে স্বস্তির আবেশ স্পন্দিত:
করাতের দাঁত আমাদের রক্তাক্ত করেছে;
চামড়া ছিঁড়েছে, ছিঁড়ুক
মাংস চিরেছে, চিরুক
হাড় পর্যন্ত আঁচড় লেগেছে, লাগুক …
আমরা বাঁচলাম।
এই কবিতাগুলিতে তত্ত্বের বদলে জীবনকে ধরতে চাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। ‘জাগর’ কবিতায় তিনি লেখেন:
এ কোন নির্জন ভালোবাসা
আমাকে উত্তাল ক’রে রাখে
শিখরে শিখরে রক্তে রক্তোচ্চার গানে?
‘উৎসর্গ’ কবিতায় ‘তুমি’ যে নারীর অমৃত চোখে তিনি খুঁজে ফিরেছেন দিশা:
ধ্বংসের প্রান্তরে হিরণ্ময় আমার ভাবনা
তোমাকে উৎসর্গ করলাম
তোমাকে স্মরণ করলাম।
৭.
অরুণ মিত্রের গদ্যকবিতার শিল্পের উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘এ জ্বালা কখন জুড়াবে’:
আমার এই বোবা মাটির ছাতি ফেটে চৌচির। উঠোনের ভালোবাসার ভোর একমুঠো ছাই হয়ে ছড়িয়ে যায় শুকনো লাউডগার মাচায়, খড়ের চালে কাঠবেড়ালীর মতো পালায় অনেক দিনের আশা, শুধু ভাসাভাসা, কথার শূন্যে লেগে থাকে এক জল মোছা দৃষ্টি দুপুরের সূর্য হয়ে।
এই কবিতায় ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও সামাজিক অবক্ষয়ের আর্তি একাকার হয়ে গেছে। এই পর্বের সবচেয়ে আলোচিত কবিতা ‘সুকান্ত’, যা গদ্যকবিতার শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়:
মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কী ভেবেছিল সুকান্ত? যে ছোট্ট বুকটা আর ছোট্ট মাথাটা অনবরত কবিতায় উথলে উঠত তাদের নিঃশব্দ শেষ ডাক শুনতে পাওয়া গেল না। আমি নিশ্চিত জানি না একদিন হঠাৎ চিৎকার করে উঠবে। যাদবপুর হাসপাতালের মাঠ বাড়ি পুকুর তার আওয়াজে গমগম করতে থাকবে।... রোদের একটা ঝলক যদি সুকান্তর অন্ধকার অন্ত্র আর ফুসফুসের মধ্যে ঢুকতে পারত।
অধ্যাপক পবিত্র সরকার এই কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘অরুণ মিত্র কথ্যতার খুব কাছাকাছি থেকেছেন এ কবিতায়, সাজানো ভাষার শরণ নিয়েছেন কদাচিৎ, বিশেষণ ব্যবহার কথ্যতার সীমানা অতিক্রম করেনি’। এই কবিতায় মৃত্যু, আশা-নৈরাশ্য, সংগ্রাম ও আরোগ্যের দ্বান্দ্বিকতা এক ঋজু ও আর্ত আবেগে প্রকাশিত। তন্ময়তার এই বোধ পাঠককে যেমন আবিষ্ট করে, তেমনিই পৌঁছে দেয় এক নির্জন ধ্যানের জগতে। এমনই একটি বিরামচিহ্নহীন কবিতা ‘আমি অল্প করে বলি’—
আমি অল্প করে বলি যদি তুমি বোঝো নইলে পাহাড় সমুদ্দুর মরুভূমি তোমাকে উদ্বাস্তু করবে নইলে মহাশূন্য তোমাকে নিয়ে চক্কর জুড়বে তুমি ছোট্ট দরজাটা দেখতে পাবে না যে তোমাকে পৌঁছে দেবে তোমার একলা পিদ্দিমের কাছে যাকে হাত দিয়ে আগলে তুমি সেই রাস্তা রাখতে পারো যেখান দিয়ে অগুনতি পাখির ওড়া আর পায়ে পায়ে ধুলোটে গন্ধ চওড়া হতে হতে চওড়া হতে হতে শেষকালে পৃথিবীর মেলা।
৮.
নাগরিক জীবনবোধও অরুণ মিত্রের কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তর। ‘উৎসের দিকে’ কাব্যগ্রন্থের ‘কলকাতায়’ কবিতায় তিনি কলকাতার প্রতি গভীর প্রেম ও মধ্যবিত্ত জীবনের ক্লান্তি-যন্ত্রণার দ্বান্দ্বিক ছবি এঁকেছেন। একদিকে তিনি লেখেন:
কবেকার আবছা গাছের জটলা।
ঘোর-ঘোর বেলায় লতা বুনো ফুল
কোনো উদ্ভ্রান্ত গন্ধ দূরান্তর স্বর,
আমার গাঁয়ের বাংলা ফিরে ফিরে আসে
কলকাতায়।
আবার সেই কলকাতাতেই তিনি দেখেন:
কুঁড়ে ঘরে কোন কান্না শুনেছিলাম
সন্ধ্যায় বা শেষ রাতে
মজা গাঙের ধারে সন্সর হাওয়ায়
তা যেন কলকাতার কোলে মুখ গুঁজে ফেঁপায়
শূন্য খেতের হা হুতাশ
জমে জমে উঁচু বাড়ির মাথা ছোঁয়া,
অলিগলি টলমল করে,
শ্বশানের গা-ছমছম রাস্তা যেন চলে আসে।
এই বৈপরীত্যের ভেতর দিয়েই তার নাগরিক চেতনা গড়ে উঠেছে। একই কবিতায় স্বপ্নময়তার কথায় আত্মবীক্ষণের চিত্রও আছে:
তারা আমাকে বাঁচবার কথা বলে,
ঘৃণাকে প্রবল করে
ক্রোধকে প্রবল করে
প্রেমকে প্রবল করে।
এক শুদ্ধ আগুন জ্বালিয়ে রাখতে বলে,
তারা বলে ঈর্ষাকে সে-আগুনে পুড়িয়ে দিতে
ছোট-ছোট মন গুলো জঞ্জালের মতো সে আগুনে ফেলে দিতে।
শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তার গভীর সহানুভূতি ও একাত্মবোধ প্রকাশ পেয়েছে ‘রিকশাওয়ালা’ কবিতায়। এই কবিতায় তিনি নগরজীবনের প্রান্তিক মানুষের জীবনকে তুলে এনেছেন আশ্চর্য সহানুভূতিতে—
আসুন কবিতাটি পড়া যাক—
রিকশার চাকা দুটো ঘুরতে-ঘুরতে এইখানটাতে এসে দাঁড়ায়। আমার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করে। যে-লোকটা চালায় একদিনও তার কামাই নেই, এই বিষম ঠাণ্ডাতেও না। এমনিতে তাকে দেখে আমার চেনবার কথা নয়, কারণ তার মুখটা রোজই বদলায়। চাকাদুটো ঘোরা থেকে চিনি। সন্ধের পর ছেলে-বউকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে।... ভেতরের আগুনটা নিভে গিয়ে সে ঠাণ্ডায় জমে পাথর হয়ে কোথাও পড়ে থাকবে। কিন্তু তা বলে রিকশার চাকা দুটো তো মাটিতে গেড়ে যাবে না। তারা আবার ঘুরবে এবং তাই থেকে আমি বুঝব সেই রিকশাওয়ালা হাজির হয়েছে, এখন যেমন বুঝি। এটাই আমার কাছে স্বস্তি।
এই কবিতায় রিকশার চাকার ঘূর্ণনই শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্বের অনিবার্যতা ও তার সংগ্রামের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
৯.
‘আর এক আরম্ভের জন্য’ কবিতায় জনতার কোলাহলের ভেতরেই কবি খুঁজে পান আগামীর প্রতিশ্রুতি— মানবাত্মার মুক্তির প্রতিশ্রুতি:
আমি হাসি আর কান্নার পেছনে আমার প্রথম স্বপ্নকে ছুঁয়েছি তুমি প্রসন্ন হও।...
আমি হাটে হাটে ভেসে এসে থেমেছি।
মাটিতে পা গেড়ে দিয়েছি।
ফুসফুসে ভরে নিয়েছি মহুয়ার আর ধানের বাতাস।
আমের বোলের বাতাস।
মনের মধ্যে এঁকে রেখেছি অঙ্কুর আর কিছু নয়
তুমি প্রসন্ন হও।
এই ‘অঙ্কুর’ জনজীবনের সঙ্গে একাত্মতায় এক চেতনার উত্তরণ— যে চেতনার সেলুলয়েডে ধরা আছে জনহিতকর এক উজ্জ্বল সময়ের ইশারা। কবিতাটি শেষ হয় এই আশ্বাসে:
আমি জনতার মধ্যে শিশুর কণ্ঠ শুনতে পেয়েছি
আমি কোলাহলের খরজে আমাকে বেঁধে নিয়েছি।
এই তো নির্মাণ নেওয়ার মতো উচ্চারণ করেছি মানুষ
আমি তোমার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করতে পেয়েছি
তুমি প্রসন্ন হও।
‘আমার কাছে বদলে যায়’ কবিতায় কবির প্রেমময় মগ্নতার জ্বলজ্বল ছবি বিদ্যমান:
আমার কাছে বদলে যায়
কান্নার দুটি চোখ, রাত্রি
যেখানে আরো রাত্রির দিকে দরজা খোলা,
টুপটাপ ফুল আর শিশিরের মাঝখান দিয়ে যে নিরুদ্দেশ
তার সামনে আমার অবস্থান,
ঘণ্টা বেজে বেজে যখন ঝিমিয়ে পড়ে
আমি নাড়া দিয়ে নতুন কণ্ঠ জাগাই
প্রেম আর বাসনার চিত্রপট আলোর গুচ্ছে সাজাই
তখন আমার বহু চেনা মন অন্ধকার থেকে মুক্তি পায়
বহু মিলে আমি তাদের মেলাই,
দীর্ঘ মলিন সময়
টুকরো টুকরো হয়ে যেন হীরের মতো প্রভাময়।
‘রাতের পর দিন’ কবিতায় প্রকৃতি ও স্মৃতির দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে:
সকাল এল। শিশিরের রূপোর মাঠ খান খান হয়ে গেল এই মুহূর্তে। আমাদের জাদু লাগলে যেখানে পরীর রাজ্য নামত, সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শক্ত মাটির ঢেলা, অসাড় নির্জন পথ।
কাল এল। আমাদের সদর দরজার কাছে শিউলির বরফের দেশ তূপীকৃত হয়ে পড়ে। কবে একে হটানো যাবে? দুই বুকের মাঝখানে ফোটানো যাবে দিনরাতের ফুল?১০.
কবিতায় ‘কামিলা’ও তার এক বিশেষ প্রতীক— কোনো প্রেয়সী নন, কর্মময় জগতের প্রতীক। কর্মে যিনি নিষ্ঠ, তিনি-ই কমিউনিস্ট— এই বোধ থেকে কবি কামিলাকে খুঁজে বেড়ান কারখানার বাঁকে, রাস্তার মিছিলে, অগণিত মানুষের ভিড়ে। ‘ওই কোন নক্ষত্রের’ কবিতায় তিনি লেখেন:
আমার কামিলা ঘরের মধ্যে নেই।
সে কখন অদৃশ্য হয়েছে কারখানার বাঁকে
আমি ভিজতে ভিজতে দাঁড়িয়ে আছি।
আমার কামিলার রাত্তিরে।
কামিলার অন্বেষণ আসলে জীবনের অন্বেষণ, সমাজবদলের ইশারা। ‘এত পাথর ভাঙার ছিল’ পঙক্তিতে সেই ইশারা স্পষ্ট:
এত পাথর ভাঙার ছিল
এত জল বইবার ছিল
আর ছিল খুনীদের হাতে পড়বার ঝুঁকি নেওয়া
আমার পায়ের তলায় কামিলার মাটি। সেখানে রাবণের চিতা জ্বলছে।
‘উছলে উঠছিল’ কবিতায় কর্মমুখর মানুষের ঘনিষ্ঠ তাপের মধ্যে কামিলার অন্বেষণ নিমগ্ন হয়ে ওঠে:
পেল্লায় ক্রেন বাড়িগুলোর ভিত উপড়ে ফেলছে
রাস্তার খাদে মানুষ পড়ছে টুপটাপ
আর জোরে উঠছে-নামছে দুরমুশ।
আমি আগাপাস্তালা গুঁড়োর মধ্যে কোন পালক দেখতে পাচ্ছি না পাতাও না
কাছ থেকে নাকি দূর থেকে আমি ডেকেই চলেছি
কা-মি-লা।
প্রকৃতির সঙ্গে কবি-মনের একাত্মবোধও তার কবিতায় গভীর। ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’ কাব্যের ‘কাঁটাতার’ কবিতায় তিনি লেখেন:
কাটাতারের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে ধরি।
কেবল শূন্যের চাপ। আমার নাগালের বাইরে অনেকগুলো ফুল নিবে যাওয়ার মতো দপ দপ করে। একটি সুগন্ধি শরীর আমার দিকে ফেরে, তারপর ঘাসের বিবর্ণতায় মিশে যায়। গাছগাছালি সব দুর্বোধ হয়ে দাঁড়িয়ে, তাদের কথা শিকড় বেয়ে পাতালে গিয়ে সিঁধোয়।
‘একটি গলি’ কবিতায় প্রতিদিনের বাস্তবতার ভেতর এক দারুণ ওলটপালটের ইঙ্গিত আছে:
মাঝে-মাঝে একটা দারুণ ওলট পালট ঘটে।
ভোরবেলার কুয়াশার মধ্যে সকলে এমন আলোড়িত হয় যে উদ্বেগের আর কোনো অবসর থাকে না। সকলে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ে, যেন দিগন্তকে এখুনি ভেঙে ফেলে নতুন করে বানাবে।
‘দুই বছর: মঞ্চের বাইরে মাটিতে’ কবিতায় ভাষার সহজ সরলতা ও ভারমুক্তির কথা তিনি নিজেই বলে দেন। কথাগুলোর একেবারেই ভার নেই। পাতার মর্মরে মিশে যেতে পারে। অথচ তারা কল্লোল নিয়ে আসে। অথচ তারা বিস্ফোরণের স্ফুলিঙ্গ নিয়ে আসে। অথচ তারা ফুলফলকে নিঃশ্বাসের কাছে ধরে দেয়। পালকের মতো কথা, তার মধ্যে পৃথিবীর নড়াচড়ার শব্দ।
‘শুধু রাতের শব্দ নয়’ কাব্যের নামকবিতায় তিনি লেখেন:
আদিগন্ত ঢেউ কি সমস্ত দুঃখকে নাচায়?
সন্তান-সন্ততির মুখ
তুমুল জলের উপর ঝুঁকে থাকে,
আমি কি তাদের যন্ত্রণার ছাঁচে দেখি?
অগণ্য দোসরের পাশাপাশি
তারা আত্মার মমতায় সংলগ্ন,
যেখানে কোনো আশা কখনো মরে না। শুধু কি রাতের শব্দ?
আমি নিশ্চিত শুনি ভোরবেলার যাত্রার আয়োজন।
‘ভাঙনের মাটি’ কাব্যের ‘এই আমি’ কবিতায় তিনি নিজেকে চিহ্নিত করেন এভাবে:
আমি একজন উৎকৃষ্ট (সর্বোৎকৃষ্টও বলা যায় হয়তো) অভিনেতা। যাঁরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাটক করে হৈ চৈ লাগিয়ে দেন, অনেক সময় বিজয় করেন, আমি তাদের দলে পড়িনা। আমি তৈরি করা মঞ্চটঞ্চের ধার ধারি না। জীবনটাই আমার মঞ্চ।১১.
ফরাসি সাহিত্যের প্রতি অরুণ মিত্রের অনুরাগ ও আনুগত্য ছিল আজীবন। তিনি প্রায় শতাধিক ফরাসি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন— আর কোনো অনুবাদক সরাসরি ফরাসি থেকে বাংলায় এতগুলো কবিতা হয়তো অনুবাদ করেননি। তার অনুবাদ করা কবিদের সময়কাল পনেরো শতক থেকে বিশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি অনুবাদ করেছেন লেনিনের একমাত্র কবিতাটিও, যা পরে ‘সে এক ঝড়ো বছর’ নামে পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়। তবে একক কবি হিসেবে পল এল্যুয়ারের কবিতাই তিনি সবচেয়ে বেশি অনুবাদ করেছেন। ফরাসি লেখকদের মধ্যে পল এল্যুয়ার, লুই আরাগঁ ও স্যাঁ-জন পার্স তাকে বেশি টানতেন। পল এল্যুয়ারের কবিতার সঙ্গে অরুণ মিত্রের অনেক কবিতার কণ্ঠস্বরের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এল্যুয়ারের গদ্যকবিতার ধরনই অরুণ মিত্রকে গদ্যকবিতায় আকৃষ্ট করেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘অনেকে বলেন আমার ওপর ফরাসি সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। ফরাসি কাব্যের প্রতি আমার অনুরাগ আছে। সেটা থাকতে পারে। হয়তো সেটা আঙ্গিকের ক্ষেত্রে। আমি প্রধানত গদ্যকবিতা লিখি। সেটা কারও প্রভাবে, তা নয়। তবে ফরাসি দৃষ্টান্ত আমাকে জোর দিয়েছে।’ তার ‘বৃষ্টির দেশ থেকে এলে’ কবিতাটি এই গদ্যকবিতার শিল্পের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত:
তুমি বৃষ্টির দেশ থেকে এলে। এই এতগুলো পাতা আমি জড়ো করেছি, এত ডালপালা। দ্যাখো তো এরা তোমাকে আগুন ছাড়া অন্য কথা বলে কিনা।
যে ছেলেটা মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরে ফিরবার নাম নেই। কী নিয়েই বা ফিরবে? আমি তাকে এমনিভাবেই রোজ দেখি। আমার বিশ্বাস সে সব সময় অদৃশ্য হয়ে যাবার জন্যে অপেক্ষা করে। কিন্তু তার কপালের রক্তচিহ্নটা এক-একবার আমাকে অভিভূত করে ফেলে। তুমি হয়তো বুঝবে, মানুষের লক্ষণগুলো তুমি হয়তো ঠিক ঠিক জেনে এসেছ।
‘পাঁচ ক্রোশ পথ ভেঙে আমি গিয়েছি ইস্পাতের নদী দেখতে। কোনোই মানে ছিল না। সে জ্বালাপোড়া তো এখানকার বাতাস ছেয়ে আছে। তবে এইটুকু আমি অনুভব করেছি যে আমাদের মাটির ভিতরে অমোঘ উত্তর রয়েছে। তুমি মৌসুমকে জানো, ফলনকে জানো, এই মাটিকে একবার তুমি আদর করে দ্যাখো’।
‘মুগ্ধতার একটা চেহারা বোধহয় কোনো এক মুহূর্তে আমার নজরে এসেছিল। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই। তোমার জলছোঁয়া হাত কি তাকে নতুন করে গড়ে দিতে পারবে?’
তার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘ফরাসী সাহিত্য প্রসঙ্গে’ এবং ‘সৃজন সাহিত্য ও অন্যান্য ভাবনা’তে ফরাসি সাহিত্য নিয়ে তার গভীর অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায়। সারা জীবন ধরে ফরাসি সংস্কৃতিতে তার অনুরাগ ও আনুগত্য ছিল গভীর— প্রথমে কারও ব্যক্তিগত সহায়তায়, তারপর কলকাতার আলিয়ঁস ফ্রঁস্যাজ-এর ছাত্র ও গ্রন্থাগারিক হিসেবে, পরে সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এবং এলাহাবাদে কুড়ি বছরের অধ্যাপনা। এলাহাবাদে নিঃসঙ্গ শিক্ষকতার জীবনে তার একান্ত টান ছিল কবিতারই জন্য। তিনি বলতেন, ‘জাত শিক্ষক আমি নই। কেননা শিক্ষার ব্যাপার নিয়ে সাধারণভাবে কোনো চিন্তা আমার মাথায় আসত না, আমার মনে ঘুরে-ফিরে আসত কবিতার ভাবনা...’১২.
অরুণ মিত্রের কবিতার আর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘মৃদু স্বগতোক্তির গদ্য লিরিসিজম’। তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো, নিচুগলায়, ঘরোয়া কথাবার্তার চালে কবিতা লিখেছেন। ‘কাছে এসো এবার’ কবিতায় সেই স্বর স্পষ্ট:
এসো এবার তোমার মুখ দেখি ভোরের আলোয়,
সেই আলোয় যা আমি অন্ধকারে ছেঁকে জমিয়ে রেখেছিলাম তোমার হৃৎপিণ্ডে।
জীবনকে রক্তের উৎসে উড়িয়ে নিয়ে এমন ফুল তুমি ফোটালে কামিলা।
‘স্তব্ধ নয়’ কবিতায় তিনি যতিচিহ্নহীন প্রবাহের মাধ্যমে এক বিশেষ শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন:
বহকালের জ্বলনে অক্ষরগুলো পোড়া পোড়া হয়েছে এখন একটু উসকে দিলেই তারা ছাই হয়ে উড়বে দখিনা বাতাসে ঝড়ে, অন্ধকার হলে ভুতুড়ে ছোঁয়া আর একদম বোবা হঠাৎ কোনো ঝলকে চমকানো নয় শূন্যে লেপাপোঁছা। দাঁড়ি টানবার জায়গা এখানে ছিল কিন্তু কী করে টানি?
এই যতিচিহ্নহীন প্রবাহই তার কবিতার স্বকীয়তা। তিনি সহজ সারল্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন এবং কবিতার ভাষাকে একেবারে মুখের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন। এই কারণে গদ্যকবিতার শৈলী নির্মাণে তিনি ব্যবহার করেছেন আটপৌরে শব্দ, দেশজ ভাষা ও শব্দগুচ্ছ। তথাকথিত বাক্যগঠন বা পদবিন্যাসের অনমনীয়তায় তার আস্থা ছিল না। পল এল্যুয়ারের মতো তিনি যতিচিহ্নের আবশ্যিকতাও মানেননি। চিন্ময় গুহ তার কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘সমস্ত ঘৃণা ও কান্নাকে করস্পর্শে সোনা করে দিয়েছিলেন অরুণ মিত্র। তার ক্ষতমুখ থেকে উঠে এসেছিল আলোর ফোয়ারা। মাথা উঁচু করে তিনি খোলনলচে বদলে দিতে চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার। ইতিহাসের এক ব্রাহ্মমুহূর্তে খুলে দিতে চেয়েছিলেন হাত-পায়ের বেড়ি। কবিতার ত্বক থেকে ঝরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সব ভান, সব মিথ্যা প্রসাধন।’ রাজু আলাউদ্দিন লিখেছিলেন, ‘বাংলা কবিতাকে চিৎকার, কোলাহল, বাচালতা আর প্রসাধন থেকে মুক্ত করার গেরিলা বিপ্লব অরুণ মিত্র একাই ঘটিয়েছিলেন।’ এই মূল্যায়নই তার কাব্যভাষার স্বরূপকে ধরে রাখে।
১৩.
অরুণ মিত্রের একমাত্র উপন্যাস ‘শিকড় যদি চেনা যায়’ মূলত আত্মজৈবনিক। যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত তার বাল্যকাল ও জীবনস্মৃতি এর বিষয়। উপন্যাসটি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নিজের কাছে উপন্যাসটি ভালো লাগে। কোনো মডেল দেখে লেখাটি করিনি। হুবহু জীবনী নয়, তবে জীবনের বহু ঘটনা এসেছে, এসেছে কল্পনাও।’ তার ‘সময়’ কবিতাটি কালজয়ী। এখানে তিনি সময়ের বহুমাত্রিক রূপকে ধরেছেন:
সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল।
কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল,
কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল
চাপা কান্নায় কাঁপানো হল,
কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে
বাজানো হল।
সৌরভ বিষাদের আভা কৌতুক
উজ্জ্বল পথ ধ্যানের সুষমা ধূপছায়া,
কত রকম।
চোখ নাক কান খুলেই রাখো,
বোধহয় দৃশ্যের চূড়ান্তে আসা গেছে।
বার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে,
লোভের দাঁত।
দ্যাখো এবার কী হয়!
এই কবিতায় সময়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতা ও ইতিহাসের চূড়ান্ত পরিণতির আভাস ফুটে উঠেছে। তার প্রয়াণের পর সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘কলকাতায় ফিরে তার কবিতার ফোয়ারা দেখে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে বড় জাতের কবিদের বয়স কখনো ছুঁতে পারে না।’
১৪.
সামগ্রিকভাবে, অরুণ মিত্র রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার অগ্রগতিতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার কবিতায় মনন ও বোধের সংমিশ্রণ ঘটেছে, কিন্তু তিনি কখনও কবিতাকে জটিল করেননি। তার কবিতায় প্রেম-ভালোবাসার উজ্জ্বল মানবিক দিক, যুগযন্ত্রণার দগ্ধ জীবন, বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ— সবই অকপট সরলতায় উজ্জ্বল। তিনি সাধারণ মানুষের বিপ্লবীসত্তার কথা যেভাবে কবিতার ভাষায় বলেছেন, তাদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছেন, তা বোধহয় তার আগে বাংলা কবিতায় এভাবে কেউ করেননি। কবি-প্রাবন্ধিক জহর সেন মজুমদারের ভাষায়, ‘শান্তির শিশির-মুক্ত-ঝলমলে এক পৃথিবী তিনি চেয়েছেন, যেখানে মানুষের উজ্জ্বল বেঁচে থাকার স্রোতে উচ্ছাসের সমস্ত আলো জ্বলে ওঠে।’ এই পৃথিবীর স্বপ্নই তার কবিতাকে জীবনমুখী ও মানবিক করে তুলেছে।
তার কবিতা কালজয়ী। তার নিচু স্বরের কবিতা আজও পাঠকের কানে আশ্বাসের টান শোনায়— মানবাত্মার মুক্তির, উজ্জ্বল সময়ের ঠিকানার। তার জীবন ও কবিতা একই সূত্রে গ্রথিত: সরলতা, মানবপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিল্পের প্রতি নিরন্তর আনুগত্য। এই সমন্বয়েই অরুণ মিত্র বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। যারা তার কবিতার নিবিড় পাঠক, তারা জানেন— অরুণ মিত্র উচ্চকিত অঙ্গীকারের বদলে নিচু স্বরে কথা বলতে ভালোবাসতেন, কিন্তু সেই নিচু স্বরেই শুনিয়ে দিয়েছেন বাংলা কবিতার বড় এক আশ্বাসের টান। সেই আশ্বাস আজও আমাদের পথ চলার সঙ্গী— যেমন তার নিজের কথায়: ‘আমি নিশ্চিত শুনি ভোরবেলার যাত্রার আয়োজন।’
















