না-বলা কথার তেরোটি স্বর

চারপাশে যখন অসংখ্য নারী প্রতিনিয়ত নিজেদের অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি, ঠিক তখনই কিছু নারী তাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে বহুদূর এগিয়ে গিয়ে নিজেদের গল্প নিজেরাই লিখছেন। বলছি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে আয়োজিত ‘Untold Story’ প্রদর্শনীর কথা। শিল্পী ফারিহা জেবার কিউরেশনে আয়োজিত এই দলীয় প্রদর্শনীতে ১৩ জন নারী শিল্পী তাদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, পরিচয়, হারানো, আকাঙ্ক্ষা ও যাপনের নানা স্তরকে শিল্পের ভাষায় অনুবাদ করেছেন। প্রদর্শনীর বিশেষত্ব শুধু বিষয় নির্বাচনে নয়; বরং কীভাবে সেই ব্যক্তিগত গল্পগুলো বলা হচ্ছে, তার মধ্যেই এর শক্তি। প্রচলিত ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে টেক্সটাইল, সেলাই, কোলাজ, ড্রয়িং, উডকাট, সংগৃহীত উপকরণ এবং হাতে লেখা শব্দ একে অন্যের সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক অন্তরঙ্গ দৃশ্যভাষা। ফলে শিল্পকর্মগুলো শুধু দেখার বিষয় মনে হয় না; বরং মনে হয়, প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে শিল্পীর ব্যক্তিগত জগতে প্রবেশের একটি দরজা খুলে যাচ্ছে।
একজন নারীর না-বলা কথা কখনোই শুধু তার নিজের গল্প হয়ে থাকে না। তার ভেতরে জড়িয়ে থাকে পরিবার, শৈশব, সম্পর্ক, শরীর, সামাজিক প্রত্যাশা, হারানো, ভালোবাসা, ভয় এবং নিজের হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রা। এই ১৩ জন শিল্পীর গল্পও তাই এক নয়। কেউ ফিরে গেছেন শৈশবের স্মৃতিতে, কেউ মাতৃত্ব ও পারিবারিক বন্ধনে, কেউ আত্মপরিচয় ও মানসিক যন্ত্রণায়, কেউ হারানো ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতায়; আবার কেউ ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে পৌঁছেছেন পরিবেশ ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বৃহত্তর প্রশ্নে। তাদের অভিজ্ঞতার এই ভিন্নতাই প্রদর্শনীতে তৈরি করেছে এক বহুস্বরের নারী-আখ্যান। প্রদর্শনীর শিল্পভাষায় এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো বেশ স্বাভাবিকভাবেই বস্তু ও উপকরণের সঙ্গে মিশে গেছে। শিল্পী সুরভী আক্তারের কাজে আলিঙ্গনরত দুটি অবয়বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি চরিত্র, তার চারপাশে উড়ে যাওয়া প্রজাপতি এবং টানটান ওঠানামা করা রেখা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ও দূরত্বকে একসঙ্গে অনুভব করায়। কাজটি কোনো নির্দিষ্ট গল্প বলে না; বরং দর্শককে একটি অনুভূতির সামনে দাঁড় করায়।
অন্যদিকে, সুমনা আক্তারের কাজে রঙিন কাপড়, ফুলের নকশা, সুতা এবং হাতে লেখা বাংলা শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ঘরোয়া স্মৃতির এক উষ্ণ পরিসর। এখানে কাপড় ও সেলাই শুধু শিল্পের মাধ্যম নয়; এগুলো নারীর দৈনন্দিন জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিচিত উপাদান। ফলে ব্যক্তিগত গল্পটি হয়ে ওঠে আরও স্পর্শযোগ্য, আরও আপন। প্রকৃতিও এই ব্যক্তিগত বয়ানের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। মাহমুদা সিদ্দিকার কাজে নানা নকশার কাপড়ের টুকরো জুড়ে তৈরি ঘন বৃক্ষভূমি শুধু একটি দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ নয়; এর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সবুজ, পরিবেশ এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রশ্নও উঠে আসে। অর্থাৎ নিজের গল্প বলতে বলতে শিল্পীরা কখনো কখনো নিজের বাইরের পৃথিবীর কথাও বলে উঠেছেন।
আবার আলিয়া কামালের শিল্পকর্মে প্রিয়জন হারানোর বেদনা ব্যক্তিগত শোকের এক নীরব দৃশ্যপট তৈরি করে। কোথাও রেখা অস্থির, কোথাও উপকরণের কোমলতা অনুভূতিকে কাছে টানে, কোথাও ছাপচিত্রের কালো-সাদা বৈপরীত্য তৈরি করে চাপা উত্তেজনা। ফলে মাধ্যমগুলো এখানে নিছক নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়; প্রতিটি মাধ্যমই শিল্পীর অনুভূতির সঙ্গে নিজস্বভাবে যুক্ত। এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই— এখানে নারীদের গল্প অন্য কেউ ব্যাখ্যা করে দিচ্ছেন না; তারা নিজেরাই নিজেদের অভিজ্ঞতার ভাষা নির্মাণ করছেন। ব্যক্তিগত স্মৃতি তাই নিছক আত্মকথন হয়ে থাকেনি; তা কখনো সম্পর্কের প্রশ্ন, কখনো সামাজিক কাঠামো, কখনো পরিবেশ, কখনো আবার নিজের অস্তিত্বকে বোঝার প্রয়াসে পরিণত হয়েছে।
এই ১৩ জন শিল্পীর কাজকে একসঙ্গে দেখলে কোনো একক ‘নারী-আখ্যান’ তৈরি হয় না; বরং তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি সম্মিলিত কণ্ঠ। একজনের শৈশব অন্যজনের মাতৃত্বের মতো নয়, ব্যক্তিগত ট্রমা মেলে না পরিবেশের সংকটের সঙ্গে। তবু তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন জায়গা আছে— নিজের অভিজ্ঞতাকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করার অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা। ‘Untold Story’ তাই শুধু নারী শিল্পীদের একটি দলীয় প্রদর্শনী নয়; এটি নারীর ব্যক্তিগত পরিসরকে দৃশ্যমান করারও একটি প্রয়াস। এখানে না-বলা কথাগুলো চিৎকার করে প্রকাশিত হয়নি; বরং কাপড়, সুতা, কাগজ, রেখা, ছাপ, বস্তু ও নীরবতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এসেছে।
প্রদর্শনীটি দেখতে দেখতে তাই মনে হয়, আমরা শুধু ১৩ জন শিল্পীর গল্প শুনছি না; তাদের গল্পের ফাঁকে নিজেদের গল্পও খুঁজে নিচ্ছি। কোনো পুরনো সম্পর্ক, শৈশবের কোনো দৃশ্য, হারিয়ে যাওয়া মানুষ কিংবা দীর্ঘদিন উচ্চারণ না করা কোনো অনুভূতি— কোনো না কোনোভাবে দর্শকের নিজের স্মৃতির দরজায় এসে কড়া নাড়ে।





