শীতের উৎসবে কুয়াশা
- বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব, ঢাকা ফোকফেস্ট ও ঢাকা লিট ফেস্ট— বর্ণাঢ্য এই তিন আয়োজনের কোনোটিই এ বছর ফিরছে না

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
শীতের হিমেল আমেজে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরে মগ্ন হওয়ার দৃশ্য শেষ দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালে। ওই বছরের নভেম্বরে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের সর্বশেষ আসর অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নানা জটিলতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে আর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে, ২০১৫ সাল থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়মিত আয়োজিত ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট’ ২০১৯ সালের পর বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর সর্বশেষ আসর বসেছিল ২০২৩ সালের ৫ থেকে ৮ জানুয়ারি।
একসময় এই তিন উৎসব রাজধানীর শীতকালকে উৎসবমুখর করে তুলত। বছর ঘুরে আবারও নভেম্বর আসছে। কিন্তু বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব, ঢাকা ফোকফেস্ট ও ঢাকা লিট ফেস্ট—বর্ণাঢ্য এই তিন আয়োজনের কোনোটিই এ বছর ফিরছে না। আয়োজকদের ভাষ্য, বড় পরিসরে উৎসব আয়োজনের জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতির পাশাপাশি সরকারের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও ভেন্যু বরাদ্দ প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপদে এমন আয়োজন করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও তাদের সংশয় রয়েছে। তিনটি উৎসবের আয়োজকরাই জানিয়েছেন, আয়োজনগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তারা নেননি। পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সংকট ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে উৎসবগুলো আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বছরের মধ্যে তিনটি উৎসবেরই ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় ভেন্যু বরাদ্দ পাওয়া গেলে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে উৎসবগুলো আয়োজন সম্ভব হতে পারে।
বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব
২০১২ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব। প্রথম দুই বছর তিন দিনব্যাপী আয়োজন করা হলেও শ্রোতাদের ব্যাপক সাড়ায় ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উৎসবের মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ দিন করা হয়। ২০১৭ সালে ভেন্যু জটিলতায় আর্মি স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেওয়ায় ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৯ সালে ভেন্যু ও নিরাপত্তা সংকটসহ নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে উৎসবের আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে এটি স্থগিত রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উৎসবটি আবার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ভেন্যু বরাদ্দ না পাওয়া এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
চলতি বছর উৎসবটি আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা জানিয়েছেন, উৎসব আয়োজনের আন্তরিক ইচ্ছা রয়েছে। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার বাস্তবতায় এত বড় আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তারা দ্বিধায় আছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আমরা উৎসবটি আয়োজনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা বলছি। নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হলে এই শীতে উৎসবটি হতে পারে। তবে তা ডিসেম্বরের মধ্যে সম্ভব নয়, কারণ এ ধরনের বড় পরিসরের আয়োজনের জন্য অন্তত তিন মাসের প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।’
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট
২০১৫ সালে সান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শুরু হয় ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট’। বাংলা লোকগানকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এ উৎসব অল্প সময়েই তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের লোকসংগীতশিল্পীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিল্পীরাও এতে সংগীত পরিবেশন করেন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে বসেছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ লোকসংগীতের এ আসর। করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর পর থেকে উৎসবটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফোকফেস্ট আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে আর্মি স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রথমে ভেন্যু বরাদ্দ দিলেও পরে তা বাতিল করে। ফলে শেষ পর্যন্ত উৎসবটি স্থগিত করা হয়। আয়োজক প্রতিষ্ঠান সান কমিউনিকেশনসের এক্সিকিউটিভ ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা উৎসবটি আয়োজন করতে চাই এবং আমাদের প্রস্তুতিও রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে জানানোর মতো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।’
ঢাকা লিট ফেস্ট
বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঢাকাকে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। সাদাফ সায্, আহসান আকবার ও কাজী আনিস আহমেদের পরিচালনায় শুরু হওয়া এ উৎসব কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, কবিতা, বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শনসহ নানা বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠেছিল।
উৎসবটি এ বছরে আয়োজন হবে কি না, জানতে চাইলে অন্যতম পরিচালক সাদাফ সায্ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এ বছরও ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না।’
এ পর্যন্ত ১০টি আসরে ৫০টি দেশের চার শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অংশগ্রহণে মুখর হয়েছে ঢাকা লিট ফেস্ট। বাংলাদেশের এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ভি এস নাইপল, জীববিজ্ঞানে নোবেলজয়ী হ্যারল্ড ভারমাস, অস্কারজয়ী অভিনেত্রী টিল্ডা সুইন্টন এবং পুলিৎজারজয়ী লেখক বিজয় শেষাদ্রির মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিরা। দেশীয় অঙ্গন থেকে অংশ নিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, দেবেশ রায়, নির্মলেন্দু গুণ, জয় গোস্বামী ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো বরেণ্য সাহিত্যিকরা।



