ভালো আছি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এখন নিরন্তর অন্ধকার ছায়ায় বেঁচে থাকা। চোখের জ্যোতি নেই। আবছায়া অন্ধকার। অল্প আলো টের পাই। অসুখের সঙ্গেই আমার ওঠাবসা। হাই ডায়াবেটিস, সঙ্গে হৃদযন্ত্রের অসুস্থতা আমাকে ভোগাচ্ছে। বুকে ক্যাথেটার পরে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ডায়ালাইসিস নিচ্ছি ডাক্তার আবদুল ওয়াহাব খানের অধীনে। বেশ কয়েকবার সুগার শূন্য হয়ে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। একবার তো ৭২ ঘণ্টা কোনো সাড়া ছিল না। ডাক্তারও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমার পরিবার ও স্বজনরাও হয়তো ভেবেছিলেন, আমি আর ফিরব না। কিন্তু ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে ফিরে এলাম। কিন্তু আমার চোখের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমি চোখে কম দেখতে লাগলাম।
বাংলাদেশ আই হসপিটালের ডাক্তারদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। উন্নত প্রযুক্তির ভাল্ব লাগানোর পরও কোনো উন্নতি হলো না। আমার অবশ্য এটি নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। তবুও আমাদের বস মানে ফরিদুর রেজা সাগর আমাকে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক পাঠালেন আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। আমি জীবনবাদী মানুষ। এখন প্রায় অন্ধকার এক পৃথিবীতে বেঁচে থাকা। টেলিভিশন এখন শুনি। মোবাইলে গান শুনি। মনের চোখ দিয়ে যেটি দেখি, সেটিই আসল দেখা। তাই চোখ থাকল কি থাকল না, এটি নিয়ে ভাবার সময় নেই।
এই তো সেদিন এলো মোস্তফা মামুন। বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক। অনেক কথা হলো তার সঙ্গে। লেখালেখির ব্যাপারেও খবর নেওয়া হলো। সে এখন একটি দৈনিকের সম্পাদকও বটে। আমার এখন অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। পল্টনে আড্ডা। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সেই আড্ডা। আমার প্রিয় আমলিগোলার স্মৃতি। সবই চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
এখন ই-বুক শুনে সময় কাটে। কোনো কিছুতেই হতাশা নেই। যে কয়দিন বেঁচে আছি, আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কত মানুষই তো চোখে দেখতে পাননি...
এখন ই-বুক শুনে সময় কাটে। কোনো কিছুতেই হতাশা নেই। যে কয়দিন বেঁচে আছি, আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কত মানুষই তো চোখে দেখতে পাননি, কিন্তু অনেক কাজ করেছেন। হোমার অন্ধ হয়ে কবিতা লিখেছেন। বাংলাদেশে দেখলাম বিখ্যাত কবি আল মাহমুদ কানা মাহমুদ নামে কবিতার বই লিখে ফেললেন। এখনো অফিস করি। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করি। রেকর্ডিংয়ের শিডিউল করি। আমার লেখালেখি এবং অফিসের কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে ইমরান পরশ। আমাকে অফিসে আরও সাহায্য করে হাবিবুল হুদা পিটু।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমার প্রিয় শিক্ষক। তিনি বললেন, ‘আমীরুল তো মৃত্যুঞ্জয়ী। সে মৃত্যুকে ভয় পায় না। এক আশ্চর্য ছেলে। সে খুবই জীবন রসিক। সবই করে যাচ্ছে, কিন্তু ভয়ানক অসুস্থ। হুইলচেয়ারে তাকে থাকতে হয়। কিন্তু তার কর্মদক্ষতা দেখে অবাক হই।’ সায়ীদ স্যার যেমন প্রেরণা দিয়ে থাকেন আমাকে, তেমনি আমাকে জীবনে বাঁচিয়ে রেখেছেন চ্যানেল আইয়ের কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগর। আমার সকল সুখ-দুঃখের ছায়াসঙ্গী তিনি। শাসন করেন। জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার কথা বলেন। কখনো আমি যেন হতাশ না হই, ভেঙে না পড়ি, সেই চেষ্টাই করেন। বলা যেতে পারে, সাগর ভাইয়ের কারণেই আমি অর্ধেক জীবন বেঁচে আছি। যেকোনো সমস্যা তিনি সমাধান করে দেন।
আমাদের প্রিয় শিল্পী ধ্রুব এষ দুঃখ করে বলে, ‘আমি যে এখন ছবি আঁকি, প্রচ্ছদ করি এগুলো কাকে দেখাব? আমীরুল ভাইকে তো দেখাতে পারি না। তিনি তো দেখতে পারেন না।’ এটা তার একটা বড় হতাশা।
আমার এখন সকাল-বিকালের সঙ্গী দেলোয়ার ও রাজিন। রাজিন আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, দেলোয়ার আমার সহকারী। তারাই আমাকে পোশাক পরায়, গোসল করিয়ে দেয়। সব কাজে সহযোগিতা করে। এই বেঁচে থাকার মধ্যেও আনন্দ আছে। অনেক প্রিয়জন দূর থেকে খবর রাখেন। আমি অর্ধপঙ্গু হয়ে আছি, এটা অনেকেই মেনে নিতে পারে না। আমি সবকিছুতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চাই। তাই বলতে চাই— আমি ভালো আছি, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে চাই।




