প্রদর্শনী পরিক্রমা
নজরুলের স্মৃতিচিহ্ন ধরে

জাতীয় জাদুঘরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের আগ্রহের জায়গা। আর সেই প্রদর্শনী যখন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে, তখন তার তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। বিশেষত, যেখানে কবির জীবনের এমন কিছু স্মৃতিচিহ্ন দেখার সুযোগ রয়েছে, যা এর আগে নিয়মিত দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপিত হয়নি। পরিচিত ইতিহাসের বাইরে নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দের পাশাপাশি এ যেন জাতীয় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে আয়োজিত ‘গাহি সাম্যের গান’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি নজরুলকে জানার এমনই একটি পরিসর তৈরি করেছে। তবে প্রদর্শনীর গুরুত্বের পাশাপাশি এর উপস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনার কিছু সীমাবদ্ধতাও দর্শক হিসেবে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে।
নজরুলকে আমরা প্রধানত তার কবিতা, গান, সাম্যবাদী দর্শন ও বিদ্রোহী চেতনার মধ্য দিয়ে চিনি। তার সৃষ্টিকর্মে যে প্রতিবাদী, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়, তা তাকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে স্বতন্ত্র আসন দিয়েছে। কিন্তু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে জানার অভিজ্ঞতা শুধু তার সৃষ্টিকর্মে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ব্যবহার্য সামগ্রী, আলোকচিত্র, ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিচিহ্ন এবং তাকে ঘিরে সমকালীন মানুষের অনুভূতিও সেই পরিচয়কে অন্য মাত্রা দিতে পারে। ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে গত ১৩ অক্টোবর উদ্বোধন হওয়া এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ। এতে স্থান পেয়েছে মোট ৯৬টি নিদর্শন। এর মধ্যে জাতীয় জাদুঘরের নিজস্ব সংগ্রহের ৭৮টি এবং সংগ্রহবহির্ভূত ১৮টি নিদর্শন রয়েছে। আয়োজকদের ,
গ্যালারিতে রাখা কবির ব্যবহার্য সামগ্রীগুলোর দিকে তাকালে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ইতিহাসের সম্পর্কটি বিশেষভাবে অনুভব করা যায়। খাট, ড্রেসিং টেবিল, পাঞ্জাবি, কিংবা ঘর সাজানোর ছোট ছোট তৈজসপত্র— একসময় যেগুলো ছিল কবির দৈনন্দিন জীবনের অংশ, সময়ের ব্যবধানে সেগুলোই হয়ে উঠেছে স্মৃতির বাহক। প্রদর্শনীতে নজরুলের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের আলোকচিত্র রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা কবির প্রতিকৃতির স্কেচ এবং নজরুলের জীবনালেখ্য নিয়ে একটি প্রামাণ্য তথ্যচিত্র। বিদ্রোহী কবিতার আবৃত্তি কিংবা ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানের পরিচিত সুর দর্শককে তার সৃষ্টির জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এসবের মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীটি দৃশ্যমান নিদর্শনের পাশাপাশি শব্দ ও চিত্রের মাধ্যমেও কবির জীবনকে উপস্থাপনের চেষ্টা , ? , — ; , , ,
প্রদর্শনীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার ও সময়সূচির প্রসঙ্গে। ঘোষিত সময় অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা থাকলেও প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে পরপর দুদিন বিকাল ৫টায় গ্যালারি বন্ধ পাওয়া যায়। এই অভিজ্ঞতা ঘোষিত সময়সূচি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে অসংগতির প্রশ্ন তোলে। বিশেষত যারা নিয়মিত অফিস করেন এবং যাদের কর্মদিবস সন্ধ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত, তাদের পক্ষে এমন প্রদর্শনী দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য যদি বৃহত্তর জনসমাজের কাছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া হয়, তবে তার সময়সূচি ও প্রবেশ ব্যবস্থাও সেই লক্ষ্যকে সমর্থন করা জরুরি।
নজরুলের স্মৃতি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদ। সেই স্মৃতিকে জনপরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগ যেমন প্রশংসনীয়, সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুর গুরুত্বের পাশাপাশি প্রচার, তথ্যপ্রাপ্যতা ও দর্শকের অভিজ্ঞতার প্রতিও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
এই প্রদর্শনীটি আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।



