কেন ধুঁকছে সৃজনশীল বইয়ের বাজার

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প নতুন গতি পাবে
বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থার সঠিক সংখ্যা কত? তার উত্তর মেলা ভার। এমনকি বছরে ঠিক কত টাকার বই বিক্রি হয়, তারও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। যেটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তা শুধু একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক; যেমন সর্বশেষ বইমেলায় বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৭ কোটি টাকার বই। বিগত কয়েক বছরের বইমেলার পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেয়, সৃজনশীল বই বিক্রির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে। তবে মেলাকেন্দ্রিক এই বিক্রির তথ্যের সত্যতা নিয়েও খোদ প্রকাশকদের মনে রয়েছে নানা সংশয়। কভিড মহামারীর আগে একুশে বইমেলায় শতকোটি টাকার বই বিক্রির হাতছানি থাকলেও বর্তমানে কেন তা নেমে এসেছে ১৭ কোটিতে? সারা বছর কেন ধুঁকছে সৃজনশীল প্রকাশনা খাত?
প্রকাশকদের ভাষ্যমতে, কভিডের ধাক্কায় বিপর্যস্ত প্রকাশনা শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আরও অতলগহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সাড়া। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প নতুন গতি পাবে— এমন প্রত্যাশা জাগলেও তাতে যেন গুড়ে বালি; বরং বইমেলায় ডাস্টবিন বিতর্ক, প্রকাশকদের বিভক্তি, প্রকাশনা স্টলে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র আক্রমণ এবং ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে সৃজনশীল লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যে ভীতি তৈরি করায় বইমেলার স্বাভাবিক রূপ ও চরিত্র বিনষ্ট হয়েছে। ফলে আগামী বছরের বইমেলা কেমন হবে, তা নিয়েও দ্বিধা কাটেনি।
তবে এর পাশাপাশি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে গ্রন্থনীতি প্রণয়নের তোড়জোড় এবং মেলাকেন্দ্রিক নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার প্রবণতা নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিচ্ছে। এক দশক আগেও যেখানে শুধু একুশে বইমেলাই ছিল সৃজনশীল বই বিক্রির একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু, তা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে সারা বছরই বিক্রির এক অপার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ‘সময় প্রকাশনী’র স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘কভিডের পর বইমেলা থেকে বিক্রি আসেনি বললেই চলে, যা বিক্রি হচ্ছে তা মেলার বাইরেই হচ্ছে। আবার সারা বছরের বিক্রি যে খুব বেড়ে গেছে, তা নয়। আসলে বইমেলার বিক্রিটাই অনেক বেশি কমে গেছে।’
১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রকমারি ডটকম ঘোষণা দিয়েই অধ্যাপক জাফর ইকবালের বই বিক্রি বন্ধ করে দেয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে জাফর ইকবালের বই আগের মতো বিক্রি হচ্ছে এবং নতুন বইও প্রকাশিত হচ্ছে। যদিও একুশে বইমেলায় এই প্রখ্যাত লেখককে ঘিরে পাঠকের সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাসের চিত্র এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। ফরিদ আহমেদ জানান, সময় প্রকাশন প্রতি বছরই জাফর ইকবালের একটি নতুন বই প্রকাশ করে আসছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় গত দুই বছরেও এই লেখকের দুটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বিক্রিও বেশ সন্তোষজনক।
বই বিক্রি কম হচ্ছে শুনলেই কি মনে হয় এ প্রজন্ম পাঠবিমুখ হয়ে পড়ছে? এ প্রশ্নের উত্তরও অতটা সহজ নয়। কারণ, মানুষের বই পড়ার ধরন ও অভ্যাসে এসেছে পরিবর্তন; পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বই পড়ার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহমান মৈশান বললেন, ‘বই বর্তমানে এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আবার প্রযুক্তির বিকাশ যেসব দেশে বেশি, সেসব দেশে যখন দেখা যায় বই পাঠ বাড়ছে, তখন বলা যায়, বইয়ের আবেদন এখনই ফুরাবার নয়।’
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক আবুল বাশার ফিরোজ জানান, তাদের দপ্তরে সৃজনশীল বই বিক্রির সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও এমন একটি জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। গত এপ্রিলে আগামীর সময়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রথমার উপব্যবস্থাপক কাউসার আহম্মেদ আশিক একটি ধারণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সৃজনশীল বই বিক্রি হয়ে থাকে, যেখানে ‘গ্রন্থিক’-এর প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল এবং পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির মনিরুজ্জামান খানও একমত পোষণ করেছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা ও চেইন বুকশপ ‘বাতিঘর’-এর স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশের মতে, বইয়ের বাজার হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও সেটি দেড় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।
২০২৫ সালে বইমেলায় অংশ নিয়েছিল ৭২১টি প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ৭০৩টি ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং বাকিগুলো মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক। সে হিসাবে দেশে সাত শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। তবে সবশেষ বইমেলায় অংশ নিয়েছে ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির তথ্যমতে, তাদের সদস্যভুক্ত প্রকাশনা সংস্থা আছে আড়াইশর মতো।
২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বইমেলায় বাংলা একাডেমির প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে আগামীর সময় দেখেছে, কভিডের আগে বই বিক্রি প্রতি বছরই ছিল ঊর্ধ্বমুখী; কিন্তু কভিডের পর থেকে তা নিম্নমুখী হতে থাকে। ২০২৬ সালে বিক্রি হয় ১৭ কোটি, ২০২৫ সালে যা ছিল আনুমানিক ৪০ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালে মেলায় ৬০ কোটি ও ২০২৩ সালে ৪৭ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। ২০১৩ সালে বই বিক্রি হয়েছিল ১০ কোটি ১৪ লাখ টাকার, ২০১৪ সালে সাড়ে ১৬ কোটি, ২০১৫ সালে ২১ কোটি ৯৫ লাখ, ২০১৬ সালে ৪০ কোটি ৫০ লাখ ও ২০১৭ সালে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে এই অঙ্ক দাঁড়ায় ৭০ কোটি ৫০ লাখে এবং ২০১৯ সালে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা। আর ২০২০ সালে বিক্রির রেকর্ড ছুঁয়েছিল ৮২ কোটি টাকা।
গত বইমেলায় প্রকাশক ঐক্য জানিয়েছিল, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালে বইমেলায় বিক্রি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। আর ২০২৬ সালের বইমেলার বিক্রি ২০২১ সালের মহামারীকালের মেলাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং তা অত্যন্ত ‘শোচনীয়’। তাদের ভাষ্য, ‘১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার একটি সুনির্দিষ্ট মার্কেটিং বাজেট থাকলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’






