আহমদ ছফার কবর স্থানান্তর
অবিচারের অবসান নাকি বিদ্রোহী সত্তার অবনমন?
- একটা অবিচারের অবসান হলো: সলিমুল্লাহ খান
- ছফাকে বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠতে হইল কবরস্থান দখল কইরা: ব্রাত্য রাইসু
- জীবিত অবস্থায়ও গুণিজনদের সম্মান জানাতে হবে: নাসির আলী মামুন

আহমদ ছফা
মৃত্যুর দীর্ঘ ২৫ বছর পর সাহিত্যিক ও চিন্তক আহমদ ছফার কবর স্থানান্তর করা হয়েছে। গত বুধবার সাধারণ কবরস্থান থেকে তার দেহাবশেষ সরিয়ে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের স্থায়ী অংশে সমাহিত করা হয়। ছফার কবর স্থানান্তরের এই ঘটনাকে সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বিষয়টি দেখছেন একটি ‘অবিচারের অবসান’ হিসেবে। অন্যদিকে কবি ব্রাত্য রাইসু বলছেন, এর মধ্য দিয়ে আহমদ ছফার বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহী সত্তার ‘অবনমন’ ঘটেছে।
আহমদ ছফার ভাতিজা নূরুল আনোয়ার জানান, ২০০১ সালের ২৮ জুলাই মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে ছফাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা সম্ভব হয়নি। বুদ্ধিজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি না দেওয়ায় বাধ্য হয়ে তখন সাধারণ কবরে দাফন করা হয়েছিল। সাধারণ কবরগুলো নির্দিষ্ট সময় পর ভেঙে ফেলার নিয়ম থাকায় আহমদ ছফার স্মৃতি যেন স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যায়— সেই উদ্দেশ্যে পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে আবেদন করা হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনুমতি সাপেক্ষে গত বুধবার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার দেহাবশেষ স্থানান্তর করা হয়।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান প্রশ্ন তুলে আগামীর সময়কে বলেন, ‘আহমদ ছফা কি বুদ্ধিজীবী নন? তবে তাকে বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়নি কেন? এটা ছিল অবিচার। সেই অবিচারের অবসান হলো।’ গত শনিবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সলিমুল্লাহ খান অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণেই আহমদ ছফাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হতে দেওয়া হয়নি। এমনকি যে মানুষটি সারা জীবন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাকেই দাফন করতে গিয়ে অনৈতিক লেনদেনের শিকার হতে হয়েছিল।
কবর স্থানান্তরের বিষয়টি ইতিবাচক ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিলম্বে হলেও শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে দেখছেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। তিনি বলেন, ‘আহমদ ছফা অতীতে কোনো সরকারের কাছেই সঠিক মূল্যায়ন পাননি। সরকার তার কবরটি বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তর করায় আমি মনে করি, তাকে সম্মান দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এটিও সরকারের কাছে বলতে চাই, কেবল মৃত্যুর পর সম্মান দিলে চলবে না; জীবিত অবস্থায়ও গুণিজনকে সম্মান জানাতে হবে। যে লেখক, কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা জীবিত আছেন, তাদের খোঁজ নিতে হবে। সরকার যেন এ ব্যাপারে তৎপর হয়।’
এদিকে, কবর স্থানান্তরের বিষয়টি দার্শনিক জায়গা থেকে সমালোচনা করে ব্রাত্য রাইসু বলেন, ‘এই যে ছফাকে বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠতে হইল কবরস্থান দখল কইরা, তার আত্মীয়স্বজন বলেন বা তার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের বলেন যে ফাইটটা তারা দিচ্ছে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আনার মাধ্যমে, এটা দিয়া সমাজের যে বুদ্ধিজীবিতার একটা স্ট্রাকচার আছে, সেই কাঠামোর মধ্য দিয়েই উনারা ছফাকে আত্তীকৃত করলেন। এর ফলে ছফার যে একটা র্যাডিকেল বা বিদ্রোহী সত্তা ছিল, সেটিকে উনারা একটা প্রচলিত ফর্মের মধ্যে বা রাষ্ট্রীয় ফর্মের মধ্যে আনলেন। ছফা তো রাষ্ট্রের হইতে চাইলে তার জীবদ্দশায় সেটা হইতে পারত, সেটা তো সে করে নাই। কবর স্থানান্তরে ছফা নিজে রাজি হইতেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। এখন মৃত ছফাকে নিয়ে আসা বা তার হাড়গোড় নিয়ে আসা গেল। কিন্তু তার যে ধারাটা দেখি, সেখান থেকে ভাবলে মনে হয় না যে ছফা এই কবরস্থান চেঞ্জ করাতে রাজি হইত? আমি এটাও মনে করি না যে কবর স্থানান্তর হতে পারবে না। অবশ্যই পারবে। কিন্তু এর ফলে ফিলোসফিক্যাল লেভেলে যেটা ঘটতেছে— আমি সেইটার সমালোচনা করতেছি। ছফারে কেন বুদ্ধিজীবী হিসেবে জায়গা দিতে হইল তার পক্ষের লোকদের? আমি মনে করি, এর ফলে ছফার এক ধরনের অবনমন ঘটল আর কি।’
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্বাধীনচেতা লেখক-চিন্তক আহমদ ছফা ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশে জন্মগ্রহণ করেন। সুবিধাবাদী বুদ্ধিবৃত্তির তীব্র সমালোচনা ও নিজস্ব স্পষ্টবাদী দর্শনের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় বলয়ে আবদ্ধ না থেকে তিনি আজীবন মুক্তচিন্তার চর্চা করে গেছেন। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই এই চিন্তক মৃত্যুবরণ করেন।




