ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এবার কিয়েভে ফিরে আসাটা অনেক বেশি কষ্টের ছিল। কাতিয়া তো ইগরের ব্যাপারে প্রতিটা খুটিনাটি শোনার জন্য মুখিয়ে ছিল। ও দুই বোতল নালিফকা এনেছে। এটা হচ্ছে এক ধরনের চেরি লিকার।
কাতিয়ার বাবাই এটা তাদের রিভনের বাড়িতে বানায়। আজ রাতে আমরা তিনজনে-কাতিয়া, মিকিতা আর আমি- বেশ মজা করবো। মহল্লার নিরিবিলি জায়গায় লুকিয়ে এসব খাওয়ার সময় উঠতি বয়সীরা যেভাবে খুশিতে মাতে আর কী! চলবে অহেতুক গলাফাটিয়ে হাসা আর অর্থহীন বকবকানি! মোটকথা, যুদ্ধটুদ্ধ ভুলে জীবনকে একটু নিজের মতো উপভোগ করবো আমরা।
দুষ্টুমির হাসি হেসে কাতিয়া বললো, ওর বাবার তৈরি করা নালিফকা দোকানের জিনিসের চেয়ে অনেক বেশি কড়া। দুই বোতল তিন তিনজন সাবালক মানুষকে বেতাল করে দিতে যথেষ্ট।
আমরা হেঁটে অ্যালি অব ল্যান্ডস্কেপের দিকে গেলাম। চিজ, সালামি, শুটকি মাছ আর ওয়ান টাইম ব্যবহারের গ্লাস কেনা হলো। অ্যালিতে পৌঁছে বেশ বড় একটা সবুজ ঘেরা জায়গা পাওয়া গেল। চারপাশে দীর্ঘ গাছের সারি আর ঘন ঝোপগুলোতে রঙিন ফুলের উৎসব।
সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে গড়াতে শুরু করলে চারপাশের আলো ম্লান হয়ে এলো। অন্ধকার ঘনাতেই কিন্তু আবার গোটা তল্লাটটা জেগে উঠলো। চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল উচ্ছ্বল হাসি, কলগুঞ্জন। এই কণ্ঠস্বরের মালিকরা প্রায় সবাই বয়সে তরুণ। সবুজ ঘাসে কম্বল বিছিয়ে বসেছে কেউ কেউ। ড্রিংকের কুলার খুলে চলছে পানীয় বিতরণ। হাতে হাতে হাল্কা খাবার। একজন গিটারে এরই মধ্যে কোন একটা সুর তুলেছে।
ছোট ছোট দল যার যার নিজস্ব ভুবন গড়ে তুলেছে যেন। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে চলছে চুটিয়ে গল্পগুজব। থেকে থেকে মজার কৌতুকে উঠছে হাসির হুল্লোড়।
একসময় গাঢ় অন্ধকার নেমে এলে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তারার আলো উঁকি দিতে লাগল। সেই মায়াবী আলো ছড়িয়ে পড়ল সবার মুখে!মাথার ওপরের আকাশ তারায় তারায় ভরা। অপার্থিব লাগছিল সব। বোতলের শেষ ফোটা পর্যন্ত গলায় ঢেলে আমরা সবাই ততক্ষণে নেশায় চুর। হেসে মরছি খামোখাই। প্রাণভরে উপভোগ করছি সান্নিধ্যের উষ্ণতা।
আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কম মাতাল হয়েছিল মিকিতা। আমরা যেন ঠিকমতো ঘরে ফিরি তা নিশ্চিত করতে ঠেলেঠুলে সে-ই সবাইকে ট্যাক্সিতে ওঠালো।
এতটাই নেশা হয়েছিল যে রুমে ফিরে আর কাপড়চোপড় বদলানোর নাম নিলাম না আমি। শুধু মনে আছে একছুটে বাথরুমে গিয়েছিলাম আর সেখান থেকে বেরিয়েই ধপাস করে বিছানায় ঝাঁপ। তারপর মরার মতো গভীর স্বপ্নহীন ঘুমের পালা।
হঠাৎ দরজায় জোরে আঘাতের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। সকাল হয়ে গেছে তা বুঝতে পারলাম চোখ খুলে। কিন্তু বেলা কতটা হয়েছে মাথায় ঢুকছিল না। দরজায় কেউ নক করেই যাচ্ছিল জোরে, খুব অস্থিরভাবে।
তার পর চেঁচিয়ে কথা বলল কেউ। খুব সম্ভব হলের ওয়ার্ডেন। চিৎকার করে দরজা খুলতে বললেন তিনি। আমার মাথা তখনো ভার। গলা শুকিয়ে কাঠ। রাতের বেদম পানের ঘোর পুরোদমে চলছে। বিছানা থেকে উঠে জ্যাকেটটা পড়ে আমি খালি পায়েই দরজার দিকে এগোলাম। কৌতুহলী হয়ে কাতিয়াও আমার পেছনে এলো। কে কী বিষয়, জিজ্ঞেস না করেই দরজা খুললাম আমি। দরজা খুলে দেখলাম, সত্যিই ওয়ারেডেন সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে ঘিরে আছে গাঢ় রঙের ইউনিফর্ম পড়া পাঁচজন লোক। তাদের মধ্যে দুজন নারী আর তিনজন পুরুষ। সবার পরনেই কালো পোশাক। কারও জ্যাকেটের হাতায় বাহিনীর পরিচয়চিহ্ন। অন্যদের পোশাকে কোনো চোখে পড়ার মতো ব্যাজ বা চিহ্ন দেখলাম না। সবার একরকম কঠোর মুখ আর কালো হাতমোজাই যেন বাকিটা বলে দিচ্ছিল। একজনের হাতে একটা অফিসের কাজের ফোল্ডার। আরেকজনের বুকের সঙ্গে আটকানো ছোট্ট ক্যামেরা।
এরা তেমন কিছু বলল না। নারী দুজন এগিয়ে এসে আমার দুই হাত চেপে ধরল। দুজন দুপাশে। তাদের হাতের মুঠো রীতিমত শক্ত। বোঝাই গেল এ কাজে বেশ অভ্যস্ত তারা। পুরুষেরা এগিয়ে গিয়ে কাতিয়াকে আটকে দিল। তাদের একজন হলওয়ের মধ্যে আড়াআড়িভাবে হাত বাড়িয়ে দাঁড়াল, যাতে আর কেউ আমার কাছে আসতে না পারে।
পাশের রুমগুলো থেকে ছাত্রীরা বেরিয়ে এসেছিল। কারও কারও পরনে তখনো রাতের পোশাক। তবে কেউ একটা কথাও বলল না।
কাতিয়া চিৎকার করে জানতে চাইলো- ব্যাপারটা আসলে কী! এই লোকগুলো কে এবং তারা আমাকে কোথায়ই বা নিয়ে যাচ্ছে। নারীদের মধ্যে একজন তাকে বলল চুপ থাকতে। বাকিরা কেউ কিছু বলল না।
ওরা আমাকে খালি পায়েই টেনে হিঁচড়ে বের করছিল ঘর থেকে। কাতিয়া ব্যাপারটা খেয়াল করে দৌড়ে ঘরে ঢুকে আমার জুতোজোড়া নিয়ে এলো। টানাটানির মধ্যেই হাঁটু গেড়ে বসে আমার পায়ে জুতো গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো কাতিয়া। এক পায়ে জুতাটা অর্ধেক ঢুকল, অন্য পায়েরটা খুলে পড়ে গেল। সে আবার চেষ্টা করল। কাঁপা কাঁপা হাতে বুড়ো আঙুল দিয়ে জুতার গোড়ালিটা ঠেলে পরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল কাতিয়া। কিন্তু তার আগেই ওরা আমাকে টেনে তার নাগালের বাইরে নিয়ে গেল।
সিঁড়ির কাছে পৌঁছানোর সময়ও আমার জুতা দুটো ঠিকমতো পরা হয়নি। ওরা থামল না। আমাকে টেনেহিঁচড়ে দুই তলা নিচে নামিয়ে নিয়ে গেল। পায়ে কোনমতে ঝুলে থাকা জুতাগুলো বারবার পিছলে যাচ্ছিল, আর আমি হোঁচট খাচ্ছিলাম।
গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় দুটো ভ্যান অপেক্ষা করছিল। কাতিয়া খালি পায়েই আমার পেছনে পেছনে ছুটে এল। ও আর চিৎকার করছিল না। শুধু চোখের ভাষায় ঝরে পড়ছিল আকুতি। লোকগুলো আমাকে ঠেলে গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দিল। দুই পাশে দুই নারী বসে আমাকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখল। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে তারা আমার দুই হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল। তারপর এক ফালি কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলল চোখ। মুহূর্তেই নিভে গেল শেষ আলোটুকুও ।
হাতকড়ায় বাধা আমার হাতদুটো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। আতঙ্কে আঙুলগুলো কাঁপছিল। আমি গাড়ির ইঞ্জিনের টানা গুঞ্জন আর রাস্তার ছোট ছোট ঝাঁকুনির দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সময়ের একটা ধারণা পেতেও চাইছিলাম। কতক্ষণ কাটলো? কয়েক মিনিট? নাকি কয়েক ঘণ্টা? মাথায় কিছুই আসছিল না। আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা দেখার কোনো সুযোগ নেই। শুধু মাঝেমধ্যে গাড়ি তীব্র বাঁক নিচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি। কোথাও আবার থেমে যাচ্ছে। সম্ভবত ট্রাফিক সিগন্যালে।
নিজেকে স্থির রাখতে কোনো কিছুর ওপর মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম আমি। কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তার স্রোত ছুটে চলছিল। আমাকে কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? নাকি আরও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে সামনে?
নিজেকে বোঝালাম যত যাই হোক, এরা তো পুলিশ। সরকারি কর্মচারী। ওরা আমাকে অন্তত মেরে ফেলবে না। এভাবে না। কোনো কারণ ছাড়া তো না-ই। তবু পেটের ভেতর জমাট বেঁধে থাকা আতঙ্কের দলাটা কিছুতেই হালকা হচ্ছিল না।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছিল জানি না। মনে হলো, ঘণ্টাখানেক পর অবশেষে গাড়ি থামল। দরজা খুলে টেনেহিঁচড়ে নামানো হলো আমাকে। মাটিতে হোঁচট খেতে খেতে এগোলাম। হঠাৎ এক ঝাপটা বাতাস এসে গায়ে লাগল। চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো আমার। সেই সঙ্গে হাতকড়াও। কিন্তু কোথায় এলাম বা আছি তা বোঝার আগেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে একটা আলো-আঁধারিমতো ঘরে ঠেলে দিল কেউ একজন।
ঘরটির বাতাস স্যাঁতসেঁতে। মাথার ওপর একটা বাতি মিটমিট করে জ্বলছে। তার ক্ষীণ আলোয় চারপাশে অস্পষ্ট ছায়া পড়েছে। দেয়ালের অনেকটা ওপরে ছোট্ট একটা জানালা দিয়ে সকালের সূর্যের সামান্য আলো ভেতরে ঢুকছিল। পেছনে দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। আমি বন্দি হয়ে রইলাম নিস্তব্ধতা আর ঠান্ডার মধ্যে।
ঘরের এক পাশে একটা সরু ধাতব খাটে বিছানা পাতা। ঠান্ডা, আর অস্বস্তিকর দেখতে। বিছানার পায়ের দিকে ভাঁজ করে রাখা একটা পাতলা কম্বল। বিপরীত দেয়ালের পাশে একটা টয়লেটের খোলা প্যান। গোপনীয়তার জন্য একটু আড়াল নেই। প্যানের পাশেই একটা মরচে ধরা পানির ট্যাপ। সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছিল ফাটল ধরা বেসিনটায়।
সারাটা দিনে কেউ একবারের জন্যও দেখতে এল না। রাতে কিছু খাবার দ্ওেয়া হল—সাদামাটা পাতলা স্যুপ আর এক টুকরো রুটি। খাবারগুলো সেভাবেই পড়ে রইল বেশ কয়েক ঘণ্টা। ছুঁয়ে দেখতেও ইচ্ছা হচ্ছিল না। তারপর একসময় খিদে আর সইতে না পেরে খেয়ে নিলাম।
[চলবে]



