এক দুপুরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভাদ্রের এই ভরদুপুরে হঠাৎ মায়ার কথা কেন মনে পড়ল, তার যুক্তিসংগত কোনো কারণ-সূত্র আমার কাছে নেই। মায়া, কোনো বিখ্যাত চরিত্র নয়। খুব অসাধারণ দেখতে এক সাধারণ মেয়ে। আমাদের স্কুলে পড়ত। দেখতে ছিল মুম্বাইয়ের ফিল্ম স্টার দিব্যা ভারতীর ডুপ্লিকেট। পুতুল-পুতুল চেহারা। আমি ছিলাম দিব্যার ডাই-হার্ড ফ্যান। যাকে বলে, রক্ত দিয়ে চিঠি লেখার মতো ব্যাপার-স্যাপার আর কি! এইসি দিবানগি, দেখি নেহি কাহি, মেনে ইসলিয়ে, জানে জানা দিবানা, তেরা নাম রাখ দিয়া... দিব্যা ভারতীর ঠিকানা জানা ছিল না। জানলে হয়তো রক্ত দিয়ে চিঠি লেখা হতো। ময়মনসিংহের মতো মফস্বলে তাকে ভিসিআরে দেখেই শান্তি মিটাই। আর রক্তই হোক আর পুঁইয়ের বিচিই হোক— এত সব ঝামেলায় না গিয়ে বরং প্রতি রাতে পাশ বালিশের মতো তাকে জড়িয়ে কল্পনায় সুখমাখা ঘুম দিতাম।
দিব্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না। বরং মায়ার কথায় ফিরে আসি। টানা দুই বছর ক্লাসে ফার্স্ট হয় মায়া। এই রেজাল্ট দেখে আশুতোষের কান্না আর সামলায় কে? বেচারার বাড়া ভাতে ভাগ বসায় সে। আরে বেটা, এমন একজন ডুপ্লিকেট দিব্যা ভারতীর জন্য প্লেস ছাড়া তো মামুলি বাত, দিব্যি ফেল মারা যায়। কী দরকার তোর ফার্স্ট হওয়ার? মায়ার মতো সুন্দরী ফার্স্ট হবে না তো তোর মতো লাল্টু-বল্টু মার্কা ছেলে ফার্স্ট হবে? মায়া ফার্স্ট হয় আর মনে মনে আমার খুশি দেখে কে? আমি থার্ড বা ফোর্থ প্লেসেই খুশি। যাই হোক, আমার সেই খুশি বেশি দিন টেকেনি। ক্লাস এইটে এসে মায়া চলে যায় গার্লস স্কুলে। সেই স্কুলের সামনে আড়ালে-আবডালে অনেক দিন ঘুরঘুর করেছি। মায়ার দেখা আর মেলেনি।
২
স্কুল থেকে মায়ার চলে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ অবশ্য ছিল। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’ যাকে বলে। মায়ার সৌন্দর্য তাকে কম্বাইন স্কুলে টিকতে দেয়নি। কাঠের বেঞ্চের ওপর অজ্ঞাত লেখক লিখে রাখত— মায়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি। হার্ট চিহ্ন এঁকে তার মধ্যে লেখা থাকত এম+এম। প্রথমে ভেবেছিলাম, আমাদের ক্লাসের মাজেদের কাজ। কিন্তু পরে একদিন টিফিন পিরিয়ডে ক্লাস টেনের বড় ভাই মাসুদ ওরফে চাক্কু মাসুদকে আমাদের ক্লাসরুম থেকে বের হতে দেখে সেই ভুল ভাঙল। মাসুদ ভাই একদিন তার কোমর থেকে টিপ চাকু বের করে আমাকে বলেন, ‘এই প্রণয় শোন। মায়াকে এই আইসক্রিমটা দিয়ে আয় তো। আর বলবি, মাসুদ ভাই দিয়েছে।’ আমি সুবোধ বালকের মতো সেই আজ্ঞা পালন করি। না করে উপায় ছিল না। সব জায়গায় শাহরুখ খান হলে তো হবে না। নিজের হাত-পায়ের সুরক্ষার ব্যাপারে পাগলেরও জ্ঞান আছে। আমি কোন ছাড়। মায়ার সামনে দাঁড়াতে আমার বুক ধড়ফড় করত। পা কাঁপত। হাত অবশ হয়ে যেত। কথা বলতে পারতাম না। গলা দিয়ে স্বর বের হতো না। এতসব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে মাসুদ ভাইয়ের সেই নারিকেলের আইসক্রিম হাতে নিয়ে আমি মায়ার সামনে দাঁড়াই। দূরে আড়াল থেকে আমার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে চাক্কু মাসুদ। আমার হাতের আইসক্রিম দেখে মায়া সে কী খুশি! চোখেমুখে লাজুক ছাপ। কোমল স্বরে জিজ্ঞাসা, কার জন্য?
আমি বললাম, তু তু তু...
—তুমি যে তোতলা, সেটা তো জানা ছিল না।
লজ্জায়, অপমানে চাক্কু মাসুদকে গুলি করতে ইচ্ছে হয়েছিল সেদিন। তার কারণে আমাকে আজ তোতলা ভাবল মায়া। অথচ আমি তো বটেই, আমার চৌদ্দ পুরুষের কারও তোতলামি নেই। শালা মাসুদের বাচ্চা মাসুদ, তোরে আমি গুলি করব। এই কথা মনে মনে বলে চাপা রেখে মায়াকে ইশারায় দেখিয়ে দিলাম দূরে থামের আড়ালে থাকা মাসুদকে। মুহূর্তেই দৃশ্যের পরিবর্তন। মায়ার চোখেমুখে যেন আগুন। সব ছারখার করে দেবে। আমার হাত থেকে আইসক্রিমটি ছোঁ মেরে নিয়ে সোজা চলে গেল মাসুদের কাছে। ছুড়ে মারল মুখের ওপর। কী ভয়াবহ সাহস রে বাবা! আমার তো দেখে রক্ত জল নয়, রীতিমতো বরফ হওয়ার অবস্থা। মায়া এটা করল কী? মনে মনে অবশ্য ডুপ্লিকেট দিব্যার জন্য গর্বে বুকটা ভরে গেল। আমার হয়ে অপমানের শোধ নিল মায়া নিজেই। কিন্তু এ ঘটনার রেশ সেখানেই শেষ হয়নি। দিন দিন মাসুদের অত্যাচার আরও বেশি প্রকাশ্য হতে থাকল। স্যারদের কাছে বিচার গেল। বেধড়ক মার খেল মাসুদ। আরও আগ্রাসী হয়ে উঠল সে। যেন কোনো এক ভয়ংকর জেদ চেপে বসল তার মাথায়। একদিন স্কুল ছুটির পর পকেট থেকে একটা ব্লেড বের করে সাট করে টান দিল মায়ার গালে। হলুদ গাদা ফুলটিকে সেদিন রক্তজবা হতে দেখলাম। আশপাশের পাবলিক মাসুদকে জাপটে ধরে। খুব পেটায়। একসময় পুলিশে দেয়। মায়াকে নেওয়া হয় হাসপাতালে।
৩
তারপর অনেক বছর কেটে যায়, কিন্তু রক্ত ঝরে না। কেবল কেটেই যায়। এক দুপুরের কথা মনে পড়ে খুব। টিফিন পিরিয়ড। মায়া তার বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে ক্লাসরুমে ঢোকে হাসতে হাসতে। আমি তখন শেষ বেঞ্চের আগের বেঞ্চে বসে খাতায় গোলাপ আঁকছিলাম। কখন মায়া এসে সামনে দাঁড়ায়, খেয়ালই করিনি।
বাহ! তুমি তো খুব ভালো ছবি আঁকতে পারো। আমাকে শেখাবে?
আমার বুক ধড়ফড় আর দেখে কে? যেন যুদ্ধের দামামা বাজছে। আমি আবার তোতলাতে থাকি। হঠাৎ আমার এ পরিবর্তন দেখে শিখা, রেখা, কাকলি হেসে ওঠে। মায়া হাসে না। বরং আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে।
কী ব্যাপার বলো তো প্রণয়? এমন আ আ আ করছ কেন? আমি বাঘ নাকি ভাল্লুক।
কী বলব তাকে? বাঘ-ভাল্লুকে আমার কীসের ভয়? তা ছাড়া এই মফস্বল শহরে তার দেখা মেলা প্রায় অসম্ভব। গল্প বা ছড়ায় ভয়ংকর করে তুলেছে এসব প্রাণীকে। মায়া তো দিব্যি দিব্যা ভারতী। আমার সেই আসন্ন কিশোর বয়সে তাকে কীভাবে বলি, তোমাকে দেখলে আমার বুকের বাম পাশ না চাইতেই কাঁপতে থাকে। কেন বাড়ে, সেই অ্যানাটমির চ্যাপ্টার। আমি কী করে এতসব জটিল বিষয় বুঝব? কাগজে গোলাপ আঁকতে গিয়ে সেটা কেমন করে সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে গেল, সেটি আজও আমার কাছে অজানা। কেবল বুঝেছিলাম, আমার প্যারাশুটটি চুপসে ফাটা বার্থডে বেলুন হয়ে গিয়েছিল সেদিন।
আরেক দিনের ঘটনা। সেই টিফিন পিরিয়ডেই। তবে একা। আমার সামনে এসে নিজের হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, হাতে মেহেদি দেব। সুন্দর একটি নকশা এঁকে দাও। ওরে বাবা! বলে কী। মায়ার হাতে নকশা আঁকা, তাও আবার আমার পক্ষে? মনে মনে বলতে চেয়েছিলাম, ক্ষমা করো। কান ধরছি, আর কোনো কিছু আঁকার চেষ্টা করব না। দিব্যি কাটছি, সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হব, তারপরও আমাকে তোমার হাতে নকশা আঁকতে বলো না। আমার নীরবতা দেখে মায়া ধমকের স্বরে বলে, কী হলো, দাও।
আমি সম্বিত ফিরে পাই। বলি, আ আ আ...
নো তোতলামি। আমি জানি, তুমি তোতলা নও। অকারণ ভাব দেখাবে না।
মায়া তার হাতটি তখনো আমার সামনে প্রসারিত করে রাখে। তার হাত স্পর্শ করতে গিয়ে ইতস্তত করতে থাকি। একসময় হাতের তলায় হাত রাখতেই বিদ্যুতায়িত হই। মনে হয়, কে যেন আমাকে ছিটকে ফেলে দিয়েছে দশ হাত দূরে। ইকোনো কলম দিয়ে মায়ার হাতে ফুল-লতা এঁকে দিই অনেক কষ্টে। সেই নকশা শেষে মায়া হঠাৎ আমার ডান গালে চুমু খেয়ে বসে। বলে, ভালো হয়েছে।
এ নির্ঘাত স্বপ্ন! বাস্তবে এ হতেই পারে না। মায়া চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ নিজের হাত দিয়ে গালটি স্পর্শ করতে গেলাম। মনে হলো আমার গাল যোজন যোজন দূরের কোনো দ্বীপ। কাকে বলি, বহুদিন ডান গালে আমি সাবান মাখিনি। আয়নায় নিজের গালের সৌভাগ্য দেখি, আর মনে মনে ভাবি, এ নির্ঘাত স্বপ্ন, বাস্তবে হতেই পারে না।
৪
সেদিন ছিল আমার জীবনের দুঃখতম দিনের একদিন। মায়ারা এই শহর ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। কেউ বলে চট্টগ্রাম, কেউ বলে কুমিল্লা, কেউ বলে খুলনা, কেউবা বলে ঢাকায়। আমি সবার কথাই বিশ্বাস করি। মনে মনে ভাবি, একদিন সব ছেড়ে মায়াকে খুঁজতে বেরিয়ে যাব। কোথাও না কোথাও তার সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে। তবে মায়ের শাসন আমাকে এতখানি ভীত করে রাখে, নিজের শহরটিই পুরোপুরি দেখা হয়ে ওঠেনি তখনো। এভাবে প্রতীক্ষা করতে করতে, কতবার শীতের কাপড় গুটিয়ে ট্রাংকে তুলে রাখা হয়েছে, তার ঠিক হিসাবপত্র কে রেখেছে শুনি? তবে আমার কাছে সেই হিসাব আছে। ১১ বার শীত গিয়ে মিশে গেছে গরমে। তেমনই একদিন সুমনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। এটা-ওটা কথার পর বলে, হে রে প্রণয়, আমাদের ক্লাসের মায়ার কথা তোর মনে আছে?
কথাটি শুনে আঁতকে উঠলাম। মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালাম।
—ও তো সুইসাইড করেছে। জানিস?
—মানে?
বিয়েতে মত ছিল না শুনেছি। অনেকটা জোর করেই নাকি তার বাবা-মা বিয়ে দেয়। কার সঙ্গে নাকি রিলেশন ছিল শুনেছি।
—কে বলেছে এসব কথা?
—মায়ার কাজিন রাজনের সঙ্গে তো আমার প্রায়ই দেখা হয়।
এরপর সুমন যেন কী কী সব বলে গেল, মাথায় কিছুই ঢুকল না। শুধু সুইসাইড নোটে একটি শব্দ। বাংলায় ২টা ১২, ইংরেজিতে পিএম। পৃথিবী না জানুক, আমি তো জানি, সেই দুপুর ২টা ১২তে কী ঘটেছিল। আমি তো জানি ইংরেজি পি ও এম দিয়ে কী বোঝায়। এটা তুমি কেন করলে?
মায়া, তুমি কী মনে করেছিলে, শুধু তুমিই ভালোবাসতে শিখেছিলে?



