‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’-এর একটি উত্তর উপনিবেশী পাঠ

‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’-এর প্রচ্ছদ
সুদানি কথাসাহিত্যিক তৈয়ব সালিহ্র বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’ (আরবি নাম: মাওসিম আল-হিজরা ইলা’শ-শামাল) বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হলো। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তরুণ ভাষাবিদ, লেখক, পরিশ্রমী অনুবাদক ইসফানদিয়ার আরিওন এ মহৎ কাজটি সম্পাদন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করে মূল আরবি থেকে তিনি এই অনুবাদটি বাংলাভাষী পাঠকদের হাতে তুলে দিলেন। উপন্যাসটি প্রথম ১৯৬৬ সালে বৈরুতের পত্রিকা ‘হিওয়ার’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এটি তৈয়ব সালিহ্র সবচেয়ে পরিচিত কাজ হয়ে ওঠে এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের একটি ক্ল্যাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ পর্যন্ত পৃথিবী জুড়ে এই উপন্যাস নিয়ে যত তোলপাড় হয়েছে তার ঢেউ আরব-আফ্রিকা-ইউরোপে আছড়ে পড়েছে। কিন্তু আমাদের বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত তা আসেনি। প্রকাশের প্রায় ৭০ বছর পর বইটির অনুবাদ হওয়া থেকে ধরে নিতে হবে, বিশ্বঘরানায় যে সংবেদনশীল সাহিত্য-দর্শন, লোকায়ত জীবন, রাজনীতি, উত্তর-ঔপনিবেশিক লড়াই, দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম বাস্তবতা ভেঙেচুরে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে তা থেকে আমরা কত দূরে। উপন্যাসটি প্রকাশের প্রায় ৭০ বছর পর বাংলা ভাষায় তা প্রকাশিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়; জ্ঞানবিদ্যা নিয়ে আমাদের দৌড়ঝাঁপ কেমন আত্মবিহ্বলতায় মগ্ন। অারিওন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতোই এই অভাগা জাতির জন্য জীবনের গভীর নিবেদন দিয়ে যাচ্ছেন। একটি জাতি যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধম-দর্শন সবকিছু নিয়ে প্রতারণা শুরু করেছে, সে জাতির সংবেদনে আর কিছুই থাকে না।
ইসফানদিয়ার আরিওন মূল আরবি থেকেই উপন্যাসটি অনুবাদ করেছেন। তাই, পড়তে এটি এত ভালো লাগল। আমি সচেতন পাঠককে উপন্যাসটি পড়ার জন্য আবেদন করছি। উত্তর-উপনিবেশী চিন্তাচর্চা ও লড়াইয়ের সশস্ত্র শব্দবাহিনী হিসেবে এই উপন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বসাহিত্যের পরম্পরায় ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাস বা ‘ওথেলো’ নাটকের প্রপাগান্ডা ও সাহিত্য নিয়ে পাল্টা সাহিত্য অনেক রচিত হয়েছে। সাহিত্য এখানে ঔপনিবেশিক রাজনীতি, আবার উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনীতিও। আফ্রিকীয়-আরবীয় মনের মধ্যে ইউরোপীয়রা তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপকে কীভাবে সেঁধিয়ে দিয়েছেন। উপনিবেশে বাস করা ভূমিপুত্ররা অবদমিত মন নিয়ে বেড়ে ওঠে, লেখাপড়া করে, প্রতিশোধপরায়ণ হয় এবং সেটাই স্বাভাবিক। ঔপনিবেশিক শক্তি মনে করে ভূমিপুত্রদের শিক্ষিত করে তাদের মানসিক দাস ও আজ্ঞাবহ করে তুলবে। কিন্তু মনে মনে অবদমিত মন মুক্তি চায়, স্বাধীনতা চায়; নিজেদের মতো করে বাঁচতে চায়, কিন্তু পারে না। ঔপনিবেশিক প্রভুরা এমন যে, তারা আফ্রিকি-আরবীয়-এশিয়ার সংসারে নাক গলাবেই। এই অপরিমেয় সংঘাত থেকেই জন্ম নিয়েছে কত কত সাহিত্য, কত কত দর্শন। সে ঘরানার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের নাম ‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’।
তৈয়ব সালিহ্র এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মোস্তফা সাঈদ একজন ব্যক্তি নয়, তিনি একধরনের ঐতিহাসিক প্রতীক। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা, জ্ঞানতত্ত্ব, ক্ষমতা ও যৌন-রাজনীতির জটিল সম্পর্ক তার চরিত্রের ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। তিনি ইউরোপে গিয়েছেন, ইউরোপের জ্ঞান অর্জন করেছেন, তাদের ভাষায় কথা বলেছেন, তাদের সমাজে প্রবেশ করেছেন; কখনোই ইউরোপীয় হতে পারেননি। আবার নিজের দেশেও তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসতে পারেননি। এই দ্বৈত সংকটই উত্তর-ঔপনিবেশিক মানুষের সংকট। সে দুই জগতের মাঝখানে ঝুলে থাকে। তার কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকে না। সে যেমন প্রভুর জগতে বহিরাগত, তেমনি নিজের জগতেও একধরনের অপরিচিত মানুষ।
উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই, এটি কোনো সরল রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়। এখানে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে স্লোগান নেই, আছে মানুষের গভীর মনস্তত্ত্বের অনুসন্ধান। উপনিবেশ ভূখণ্ড দখল করে না, মানুষের চেতনা, স্বপ্ন, প্রেম, যৌনতা, আত্মপরিচয়— সবকিছুকেই প্রভাবিত করে। মুস্তাফা সাঈদের জীবন সেই প্রভাবের এক করুণ দলিল। তিনি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের ভেতর বন্দি হয়ে পড়েছেন। উপন্যাসটি রাজনৈতিক নয়, একই সঙ্গে অস্তিত্ববাদীও। এ কারণে ‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আফ্রিকা, আরব বিশ্ব, এশিয়ার বহু দেশের মানুষ এখনো উন্নয়ন, আধুনিকতা ও পরিচয়ের সংকটে ভুগছে। পশ্চিমকে অনুসরণ করবে, না নিজের শিকড়কে ধারণ করবে— এ প্রশ্ন এখনো বহাল আছে। বিশ্বায়নের এ যুগে প্রশ্নটি আরও জটিল হয়েছে। আজকের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতরও আমরা সে মোস্তফা সাঈদের ছায়া দেখতে পাই। আমরা পশ্চিমের জ্ঞান চাই, প্রযুক্তি চাই, জীবনযাত্রা চাই; কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের পরিচয়ও হারাতে চাই না। এই টানাপড়েন আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অংশ।
যে জাতি নিজের ইতিহাস, নিজের ক্ষত, নিজের পরাজয় ও নিজের সম্ভাবনাকে বুঝতে চায়, তার জন্য এই উপন্যাস পাঠ অপরিহার্য। ইসফানদিয়ার আরিওনের অনুবাদ সেই প্রয়োজনীয় পাঠের দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব পাঠকের। তারা যদি এই বইয়ের মধ্য দিয়ে নতুন প্রশ্ন করতে শেখেন, নতুন করে নিজেদের ইতিহাস ও অবস্থানকে ভাবতে শেখেন, তাহলেই এই অনুবাদের প্রকৃত সার্থকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমি বইটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও জাতীয় ইতিহাসের সামান্য জের টেনেছি। কিন্তু এ বিষয়-ভাবনা-বোধ অত্যন্ত গভীর। তার জন্য পড়াশোনা, প্রস্তুতি, লড়াই বুঝতে পারাও এক বড় ব্যাপার। হুজুগে নয়, বিচার-বিবেচনাবোধ দিয়ে নিজেদের জীবন মীমাংসায় নিজেদের দাঁড়াতে হবে। তার জন্য সালিহ্র এই আত্মজিজ্ঞাসার কাছেই আমাদের ফিরতে হবে।
ইসফানদিয়ার আরিওন মূল আরবি থেকেই উপন্যাসটি অনুবাদ করেছেন। তাই, পড়তে এটি এত ভালো লাগল। আমি সচেতন পাঠককে উপন্যাসটি পড়ার জন্য আবেদন করছি। উত্তর-উপনিবেশী চিন্তাচর্চা ও লড়াইয়ের সশস্ত্র শব্দবাহিনী হিসেবে এই উপন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।




