নারায়ণ নারায়ণ, করি যে স্মরণ

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৮ – ৮ নভেম্বর, ১৯৭০)। স্কেচ: ফারজিন জামান খান
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন একজন ব্যক্তিত্বের নাম খুব কমই পাওয়া যায়, যিনি একই সঙ্গে সাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার, কিশোর সাহিত্যিক এবং রসিক মানুষ হিসেবে সমান জনপ্রিয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ঠিক এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তার সৃষ্ট ‘টেনিদা’ আজও বাংলার কিশোর-কিশোরীদের মুখে মুখে ফেরে। সাহিত্য, সিনেমা, অধ্যাপনা— সবেতেই তার ছিল স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তিনি বাঙালি পাঠকের অতি প্রিয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, দিনাজপুরের বালিয়াডিঙ্গিতে। মতান্তরে অবশ্য জন্মসন ১৯১৭। আদিবাস বরিশালের বাসুদেবপুরের নলচারি গ্রামে। পিতৃপ্রদত্ত নাম তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। পিতা প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন পুলিশের দারোগা, মা গোলাপী বালা দেবী, গৃহিণী। পুলিশে চাকরি করলেও প্রমথনাথ ছিলেন আদ্যন্ত সাহিত্যানুরাগী। তাদের বাড়িতে একটি চমৎকার বইয়ের সংগ্রহ ছিল। প্রায়ই বাড়ির ঠিকানায় ডাকযোগে বই ও পত্রপত্রিকা আসত। কেননা প্রমথনাথ বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। সাহিত্যানুরাগী পাঠক-পিতার সান্নিধ্যে ছোটবেলা থেকেই নারায়ণও সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। সাহিত্যের প্রতি তার এই আসক্তি নারায়ণের নিজের কথায় ‘পৈতৃক উত্তরাধিকার’।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বহুলপঠিত বই ‘আমার কথা’য় তিনি লিখেছেন, ‘মনে পড়ছে, তিরিশ মাইল দূর থেকে ডাকাতের আস্তানায় রেইড করে তিনি ফিরে আসছেন— মাঠের ওপারে সাদা আরবি ঘোড়ার ওপরে দেখা যাচ্ছে ইউনিফর্ম পরা উজ্জ্বল গৌরবর্ণ একটি পুরো পাঁচ হাত মানুষ। সহিস ছুটে এসে ঘোড়া ধরলো, জিনের ওপর থেকে সোজা লাফিয়ে নামলেন মাটিতে। কপালে ঘামের বিন্দু, সারা গায়ে উত্তর বাংলার লাল ধুলো। কিন্তু ঘোড়া থেকে নেমেই তার প্রথম প্রশ্ন: নতুন বইগুলোর ভি-পি-পি এসেছে?’
এহেন পিতার সন্তান সাহিত্যে আসক্ত হবেন সেটাই স্বাভাবিক। ফলে যে বয়সে খোকাখুকুর গল্প পড়ে মন ভরার কথা, সেই বয়সেই ছেলে পড়ে ফেলল ভারতবর্ষের পাতা থেকে ‘শ্রীকান্তর ভ্রমণ কাহিনী’, দেশবন্ধু দাশের ‘স্বামী’র মতো প্রাপ্তমনস্ক লেখা। সব যে বুঝত তা নয়, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত দোলা লাগত নিশ্চয়ই। এই পড়ার নেশাই তাকে ক্রমে লেখার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল স্কুলের ছাত্র থাকার সময়ই তিনি লিখে ফেললেন নাটক— ‘গুরুদক্ষিণা’। সেই সঙ্গে মেঘেন্দ্রজিৎ ও রাজকন্যা মেঘমালার প্রণয় নিয়ে এক মহাকাব্য ও একটা ক্রাইম নভেল। তখন তার বয়স ৯ কিংবা ১০। এই সময় তিনি ‘চিত্র-বৈচিত্র’ নামে একটি হাতে-লেখা পত্রিকা প্রকাশ করেন। আট পাতার ফুলস্কেপ কাগজে প্রকাশিত এই পত্রিকার তিনি একই সঙ্গে সম্পাদক, লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী, মুদ্রক এবং পাঠক। নিজেই গল্প, কবিতা লিখে, ছবি এঁকে পত্রিকা তৈরি। শুধু তাই নয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের দরও ঠিক হয়ে গেল— বিজ্ঞাপন এক পৃষ্ঠা দুই আনা, আধপৃষ্ঠা এক আনা আর বার্ষিক গ্রাহকমূল্য ‘সডাক চার পয়সা’। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতা তো দূরের কথা, পত্রিকার পাঠক কই? অথচ প্রকাশক কাম লেখক এতই লাজুক স্বভাবের যে, কাউকেই নিজের এই কীর্তির কথা জানাতে পারছে না। শেষে একদিন তার বাল্যবন্ধু বেস্ত (সুধীন ঘোষ) এসে ডাকল মার্বেল খেলার জন্য। নারায়ণ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘এখন যেতে পারব না গল্প লিখছি।’
বন্ধু অবাক হয়ে বলল, ‘কী গল্প? দেখি, পড় তো!’ হত্যা, ডাকাতি, গুলি-গোলায় ভরা ধুন্ধুমার উপন্যাসের প্রথম কিস্তি শুনে বন্ধুর চোখ ছানাবড়া। তারপর নারায়ণ আবার সম্পাদকীয়-গাম্ভীর্য নিয়ে উত্তর দিল, বাকিটা পরের সংখ্যায়। চাঁদা দিলে পরেরটা পাওয়া যাবে। বেস্ত সঙ্গে সঙ্গে প্যান্টের পকেট থেকে হান্ডিভাজা খাওয়ার জন্য জমানো পয়সা বার করে বলল, ‘আমি গ্রাহক হব।’ তারপর থেকে পুরো দুই কপি কাগজ বেরোনো শুরু। কিন্তু কিছুদিন পরেই সুধীন পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে যাওয়ায় সেই উপন্যাসও আর শেষ হলো না, কাগজও গেল বন্ধ হয়ে।
১২ বছর বয়সে ১৯২৯ সালে ‘মাসপয়লা’ পত্রিকার ফেব্রুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত হলো তার প্রথম কবিতা— ‘ডাক’। এই কবিতার জন্য তিনি বারো আনা দামের তিনটি বই পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন। আর দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল স্কুলের ছাত্রাবস্থাতেই বৈপ্লবিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। নারায়ণের দাদা শেখর গঙ্গোপাধ্যায়ের জবানি থেকে জানা যায়, বৈপ্লবিক কার্যকলাপের প্রতি বালক নারায়ণের তীব্র আকর্ষণ ছিল। মেজদা শেখরনাথের প্রভাবে আর রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের লেখা পড়ে তখন বিপ্লবী দলের সংস্পর্শে এলেন নারায়ণ। দাদার মতো তিনিও ‘যুগান্তর’ বিপ্লবী দলের সদস্য হয়েছিলেন। ওই ছোটবেলাতেই তিনি দলের হয়ে অনেক বিপজ্জনক কাজও করেছিলেন, যেমন— অস্ত্র লুকিয়ে রাখা বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় তা পৌঁছে দেওয়া, চিঠিপত্র বা বেআইনি বই পৌঁছে দেওয়া ও আরও অনেক কিছু। এই প্রসঙ্গে একটি স্মৃতি তিনি ছেলে অরিজিতকে প্রায়ই শুনিয়েছেন। বাড়িতে প্রমথনাথ রয়েছেন। এমন সময় ‘ঠক্ ঠক্’— দরজায় পুলিশ। ‘কী ব্যাপার?’ ‘সার্চ ওয়ারেন্ট রয়েছে।’ ইতিমধ্যে কোন ফাঁকে বুদ্ধি করে কিশোর নাড়ু (নারায়ণের ডাকনাম) পিস্তলসহ যাবতীয় আগ্নেয়াস্ত্র এক থলিতে পুরে রেখে দিয়েছেন ধানের গাদায়। আর যে অফিসার সার্চ করতে এসেছেন, তিনি তার মাথার টুপিটি রাখলেন সেই গাদার ওপরই। বাড়ির সকলেই প্রমাদ গুণলেন। শেষমেশ অবশ্য সেই থলির নাগাল পায়নি পুলিশ। কিন্তু সে যাত্রা রক্ষা পেলেও বাবার লাইব্রেরির মগ্ন পাঠক, কৃতী ছাত্র নারায়ণের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলল রাজনীতি। এসব কারণেই তার একটা শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হলো।
১৯৩২-এ প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসার পরিবর্তে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৩-এ প্রবেশিকা দিলেন, পাস করলেন বাংলায় ৮৪ শতাংশ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে। এবার ভর্তি হলেন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে। বন্ধু হিসেবে পেলেন সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র ও অচ্যুত গোস্বামীকে। এর ঠিক এক বছর পর ১৯৩৪-এ দেশ পত্রিকায় তার কবিতা ‘নমস্কার’ ও ‘চারণ’ প্রকাশিত হলো। এরপর থেকেই দেশ পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে তার কবিতা ও গল্প। রেভল্যুশনারি সাসপেক্ট হিসেবে এক বছর অন্তরীণ থাকার কারণে ১৯৩৫-এ আইএ দেওয়া হলো না। ১৯৩৬-এ তিনি অবিভক্ত ভারতবর্ষের বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের নন-কলেজিয়েট ছাত্র হিসেবে আইএ দিলেন। এবারও পাস করলেন প্রথম বিভাগে। ওই কলেজের ছাত্র থাকাকালীন দেশ পত্রিকার সহ-সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি পেলেন— গল্প লেখো। তার উৎসাহে লিখে ফেললেন গল্প— ‘নিশীথের মায়া’। তা ছাপা হলো দেশ-এ, তখন তার বয়স ১৭ বা ১৮। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, ‘পবিত্রদা খুশি হলেন। গল্পের জোয়ার এল— কবিতাকে ভুলে গেলাম।’ তারপর একে একে ‘ভারতবর্ষ’, ‘বিচিত্রা’, ‘শনিবারের চিঠি’ ও আরও অনেক পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করল। ব্রজমোহন কলেজ থেকেই ১৯৩৮-এ ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করলেন নারায়ণ। এ বছরই তার পিতৃবিয়োগ ঘটল। কিছুদিন পর কলকাতার মেসে চলে এলেন তিনি। থাকতে শুরু করলেন নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে। এই সময় অর্থের তাগিদে তিনি তিনটি রোমাঞ্চকাহিনি লিখলেন— ‘বিভীষিকার মুখে’ (১৯৩৮), ‘মরণের মুখোমুখি’ (১৯৩৯) ও ‘ঘূর্ণিপাকে লাল নিশান’ (১৯৪০)। মজার কথা হলো— এই তিন গ্রন্থেই নিমাই বন্দ্যোপাধ্যায় নামে তার এক সহলেখক ছিলেন।
১৯৪০-এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও সেই পরীক্ষা দেওয়া হলো না। কেননা ওই সময়ই তার ভগ্নিপতি শরৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাগ্নি রেণু দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন নারায়ণ। পরের বছর সম্পূর্ণ নতুন সিলেবাসে এমএ পরীক্ষা দিয়েও তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেলেন। এক বছর পর ১৯৪২-এ জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে সেখানে থাকতে শুরু করলেন। এ সময় তার সঙ্গে আশা সান্যালের আলাপ হলো। পরে ১৯৪৫ সালে আশাদেবীর সঙ্গে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়। জলপাইগুড়ি থাকাকালীনই তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘তিমিরতীর্থ’ প্রকাশিত হলো দৈনিক ‘কৃষক’ পত্রিকায়। প্রায় একই সময়েই তার উপন্যাস ‘উপনিবেশ’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় বিখ্যাত ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কিছু ছোটগল্প—‘বীতংস’, ‘নক্রচরিত’, ‘দুঃশাসন’, ‘হাড়’, ‘পুষ্করা’— এ সময়েই প্রকাশিত। ১৯৪৫-এ জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা চলে এলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, যোগ দিলেন সিটি কলেজে।
১৯৪৬-এ শিশুসাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটল নারায়ণের। ঘটনাটি তিনি নিজেই এভাবে বর্ণনা করেছেন— ‘বড়দের জন্যই গল্প লিখছিলাম। হঠাৎ একদিন বিশু মুখোপাধ্যায় এলেন। একটি আশ্চর্যসুন্দর মানুষ... এসেই ফরমাশ করলেন, ‘মৌচাক’-এ গল্প লিখতে হবে ছোটদের জন্যে। ...বিশুদা শুরু করিয়ে দিলেন— আর থামতে দিলেন না। ফরমাশ দিলেন, হাসির গল্প লেখো একটা বার্ষিকীর জন্য। আরও মুশকিল! গোমড়া মুখ করে মাস্টারি করি— বলতে গেলে ছেলেদের হাসি বন্ধ করাই আমার কাজ। হাসির গল্প কোত্থেকে আসবে! তখন নিজের ছেলেবেলায় ফিরে এলাম। স্মৃতির ভেতর থেকে খুঁজে আনতে লাগলাম সেই সব ঘটনাকে— যাদের কথা ভাবলে এখনো তরল হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটের কোনায়। ... সেই যে মনের ভেতর হাসির স্রোত বইল আজও তা আর থামল না।’ ভাগ্যিস মৌচাক-এর অলিখিত সম্পাদক বিশু মুখোপাধ্যায় সে সময় জোর করেছিলেন, নইলে শিশু-কিশোর সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা পেতাম কি না সন্দেহ। আর এভাবেই বাংলা কিশোর সাহিত্যে জন্ম নিল এক অদ্বিতীয় চরিত্র— টেনিদা।
শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হলে গল্প-উপন্যাসের ধরনও বদলে যায়। সিরিয়াস বিষয়ের পাশাপাশি সেখানে নিখাদ গল্পও গল্প-উপন্যাসকে রসসিক্ত করে তোলে। আড্ডা বাঙালির এক চিরাচরিত ঐতিহ্য। এখানেই সহজে অনুপ্রবেশ ঘটে গালগল্পের। আসলে আড্ডায় এই ধরনের গল্প ফেঁদে নিজেকে জাহির করার এক নির্দোষ প্রতিযোগিতা চলে সেখানে। আর তাই কিশোরগল্পের খনি ঢুঁড়ে আমরা দেখি প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ঘনাদা’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টেনিদা’ বা অহিভূষণ মালিকের কমিকস চরিত্র ‘নোলেদা’কে— যারা অত্যাশ্চর্য গল্প ফেঁদে প্রকৃতপক্ষে তাদের খুদে ভক্তদেরই আসলে জিতিয়ে দেয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এমনই এক ক্ষণজন্মা সাহিত্যিক, যিনি তার কিশোর-উপযোগী গল্প-উপন্যাসে সব বয়সের পাঠককেই পরিতৃপ্তি দেন। তার লেখার প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই যে চরিত্রের কথা আমাদের মনে আসে তা ‘টেনিদা’। চরিত্রটি কিশোরসাহিত্যে তাকে অমর করে রেখেছে। তার সঙ্গেই আমাদের মনে পড়ে ক্যাবলা, প্যালা, ও হাবুলের কথা। এরাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কিশোর সাহিত্যের প্রধান চার চরিত্র। ‘থ্রি চিয়ার্স ফর পটলডাঙা— হিপ হিপ হুররে’, ‘ডিলা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস— ইয়াক ইয়াক’, এই শব্দগুচ্ছ আমাদের একটানে কৈশোরের উঠোনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
পটলডাঙার রকবাজ টেনিদা অর্থাৎ ভজহরি মুখার্জি, পিলে-জ্বরে ভোগা প্যালারাম ওরফে কমলেশ ব্যানার্জি, ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলা হাবুল অর্থাৎ স্বর্ণেন্দু সেন ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সাহসী, পড়াশোনায় সবার সেরা ক্যাবলা ওরফে কুশল মিত্র সমগ্র নারায়ণ-কিশোরসাহিত্যে প্রভাব বিস্তার করে আছে। ভালো নাম ভজহরি মুখার্জি। পটলডাঙার চাটুজ্জেদের রোয়াকের আড্ডার মধ্যমণি। পুরো ছ’হাত লম্বা। গন্ডারের খাঁড়ার মতো লম্বা নাক। খটখটে জোয়ান। গড়ের মাঠে গোরা ঠেঙিয়ে স্বনামধন্য। পাকস্থলীতে একটি বিয়েবাড়ির সব খাবার ভরে ফেলতে পারে। কিন্তু পড়াশোনার ব্যাপারে স্কুলে ক্লাস টেনে একেবারে মনুমেন্ট হয়ে বসে আছে। সেখান থেকে তাকে নড়ায় কার সাধ্য! টেনিদার মতে, ‘পাশ তো যে কেউই করতে পারে, কিন্তু পরীক্ষায় সব উত্তর লিখেও পাশ না করতে পারাই নাকি সব থেকে কঠিন।’ বারবার ফেল করার কারণে টেনি সহপাঠীদের কাছে দাদা হবার গৌরব অর্জন করেছে। সাধারণত বারবার ফেল করা কোনো ছাত্র সহপাঠীদের কাছে ব্যঙ্গ-উপহাসের পাত্র হয়। সাতবারের চেষ্টায় মাধ্যমিক পাস করলেও টেনিদা কিন্তু সেসবের ঊর্ধ্বে। টেনিদা পেটুক— একদমে গোটা আষ্টেক শিঙাড়া বা খান-ত্রিশেক পিঠে সে সাপটে দিতে পারে। তা ছাড়া গড়ের মাঠে গোরা পেটানো খাড়া নাকের টেনিদার গল্প বলার টেকনিক তাকে বাকিদের থেকে স্বতন্ত্র করে দিয়েছে। যার ফলে সে এই গ্রুপের লিডার। শুধু গল্প বলার জন্য নয়, পড়াশোনায় খুব খারাপ হলেও টেনিদা খেলাধুলায় ভালো। তার দশাসই চেহারা, সে বক্সিং জানে, ছেলেদের শরীরচর্চায় উৎসাহী করে তুলতে সে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে ‘এক্সারসাইজ ক্লাব’ চালু করতে প্রধান ভূমিকা নেয়। দলের বিপদ হলে সে-ই সবার আগে এগিয়ে যায়, বস্তিতে আগুন লাগলে বাকি তিনজনকে নিয়ে সে আগুনের মধ্য থেকে আটকে পড়া শিশুকে উদ্ধার করে আনে। কান ছিঁড়ে কানপুরে পাঠানো কিংবা নাক মুলে নাসিকে পাঠিয়ে দেওয়া অথবা দাঁতনে দাঁত পাঠানো টেনিদার বায়ে হাতকা খেল। টেনিদারের প্রিয় ধমক হলো ‘কুরুবকের মতো বকবক করিসনি’। হাবুলের ভালো নাম স্বর্ণেন্দু সেন। কাঠ ঢাকাই বাঙাল যাকে বলে, হাবুল ঠিক তাই। তবে পড়াশোনায় মন্দ নয়। ক্যাবলার ভালো নাম কুশলকুমার মিত্র। চারজনের মধ্যে পড়াশোনায় খুব ভালো। প্রতি বছর পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এজন্য টেনিদা মাঝেমাঝেই ক্যাবলার ওপর বেজায় খেপে যায়। আর প্যালারামের ভালো নাম কমলেশ ব্যানার্জি। পড়াশোনায় চলে যায় আর কি! দু’পা হাঁটলেই তার পিলে খটখট করে জানান দেয়। পটল দিয়ে পাতলা শিঙি মাছের ঝোল আর ভাত, এই হলো তার দুই বেলার আহার।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় টেনিদাকে নিয়ে মোট পাঁচটি উপন্যাস, তেত্রিশটি ছোটগল্প, যেমন— ‘খট্টাঙ্গ ও পলান্ন’, ‘মৎসপুরাণ’, ‘দধীচি’, ‘পোকা ও বিশ্বকর্মা’, ‘ক্রিকেট মানে ঝিঁঝিঁ’, ‘কুট্টিমামার হাতের কাজ’, ‘ক্যামোফ্লেজ’, ‘দি গ্রেট ছাঁটাই’, ‘দশাননচরিত’, ‘কুট্টিমামার দন্ত-কাহিনী’, ‘বেয়ারিং ছাঁট’, ‘চামচিকে আর টিকিট চেকার’, ‘ন্যাংচাদার হাহাকার’ প্রভৃতি ও একটি নাটক লিখেছিলেন। যদিও টেনিদাবিহীন তার আরও অনেক শিশুতোষ গল্প আছে— ‘সভাপতি’, ‘অথ নিমন্ত্রণ ভোজন’, ‘ভূতুড়ে’, ‘ঘণ্টাদার কাবলু কাকা’, ‘ওস্তাদের মার’, ‘ছাত্র চরিতামৃত’। আর ‘চারমূর্তি’, ‘চারমূর্তির অভিযান’, ‘কম্বল নিরুদ্দেশ’ বা ‘টেনিদা আর সিন্ধুঘোটক’ তার অন্যতম প্রধান টেনিদা-উপন্যাস। প্রথম টেনিদা-উপন্যাস ‘চারমূর্তি’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘শিশু সাথী’ পত্রিকায় ১৩৬২ বঙ্গাব্দে।
প্রথম টেনিদা নিয়ে গল্প প্রকাশিত হলো শৈল চক্রবর্তী অলংকৃত ‘সপ্তকাণ্ড’ গ্রন্থে, ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে। এখানে মোট সাতটি গল্পের মধ্যে চারটি টেনিদাকে নিয়ে। ছোটগল্প ‘পরের উপকার করিও না’ প্রকাশিত হয় এর ঠিক দু’বছর পর। পরে তিনি এর নাট্যরূপ দেন। নাটক ‘পরের উপকার করিও না’— এক অনাবিল হাসির নাটক। কিশোরমন জয় করার ক্ষেত্রে এসবের জুড়ি মেলা ভার। টেনিদা চরিত্রের প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে টেনিদার কাহিনী নিয়ে ইতোমধ্যে কমিকসও প্রকাশিত হয়েছে। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট ও কমিকস রচয়িতা অরিজিৎ দত্ত চৌধুরীর চিত্রনাট্য ও রেখায় প্রকাশিত হয়েছে ‘টেনিদার অভিযান’।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার গল্প-উপন্যাসে যেমন সকলের মন জয় করেছেন তেমনি তার লেখা ছড়া ও কবিতাও ভারি চমৎকার এবং হাস্যরসে পরিপূর্ণ। লিমেরিক ফর্মে লেখা তেমন একটি ছড়াগুচ্ছ হলো ‘প্যালারামের ছড়া’। তার মধ্যে থেকে একটি ছড়া এখানে উদ্ধৃত করা যায়—
‘শখ করে এনে দাদা পুঁতেছিনু ওল
গিন্নি দিয়েছে রেঁধে তাই দিয়ে ঝোল
এক গ্রাস খাওয়া যেই—
আমি আর আমি নেই,
চক্ষের নিমেষেই গাল-গলা ঢোল!
আরেকটি ছড়ায়—
‘রেগে আগুন চণ্ডী খুড়ো ছিঁড়ছে নিজের দাড়ি,
গিন্নি এসে মাথায় তাহার চাপায় ভাতের হাঁড়ি।
খুড়ো যতই চেঁচিয়ে ওঠে— খুড়ির মুখে হাস্য ফোটে—
চটবে যত ভাতটা তত ফুটবে তাড়াতাড়ি।’
শিশুসাহিত্য মাত্রই কিছুটা কল্পনা, কিছুটা রূপকের এক মিশ্রিত রূপ। আর শিশুসাহিত্য তো কল্পনা ও ইচ্ছেপূরণের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে থাকে। যুক্তিবাদীর চোখে যা আজগুবি বা ভিত্তিহীন, শৈশব ও প্রথম কৈশোরে তা-ই তো কল্পরাজ্য। মেঘের ভেলায় ভেসে তখন শিশু উড়ে বেড়াতে পারে বৃষ্টিরাজ্যে, দেখতে পায় চাঁদের বুড়ির চরকা কাটার দৃশ্য— পক্ষীরাজ ঘোড়া বা পাতালপুরির দৈত্য বলে কিছু তো ছিল না কখনো। কিন্তু শৈশবের এসব গল্প একেকটা সোনার খনি। কল্পনা ও আজগুবির মাঝখানেও সেখানে কয়েকটা বিষয় কিন্তু সযত্নে স্থান পায়— সত্যের জয়, অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার শিক্ষা, সব সময় ভালো কাজ করার তাগিদ, পরের উপকার ও আরও অনেক কিছু। আর তাই সত্যকথন না হলেও এসব গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস শিশুমনের খোরাক জোগায়, তাদের মননকে সমৃদ্ধ করে তোলে। ছোটদের মনের পূর্ণ বিকাশ ও বড় হয়ে উঠতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে— এই সমাজে যাদের দায় সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে শিশুসাহিত্যিক অগ্রগণ্য। বিশেষভাবে বললে, প্রতিটি দেশে, সমাজে শিশুসাহিত্যিক একজন মানবশিশুর জীবন গড়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারিগর। কেননা শিশুসাহিত্য হলো সাহিত্যের এমন এক বিশেষ শাখা, যাকে ডিঙিয়ে কোনো শিক্ষিত শিশুর যৌবনে বা তারুণ্যে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। আর সেজন্যই প্রকৃত শিশুতোষ রচনা লেখা অন্য যেকোনো লেখার চেয়ে কঠিনতর। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এই কঠিন কাজটাই অনায়াসে করে গেছেন।
স্মৃতিকথা পড়ে জানা যায়, নারায়ণবাবুর সবচেয়ে তৃপ্তি বোধহয় পড়ানোয়— পড়িয়েছেন জলপাইগুড়ি আনন্দচন্দ্র কলেজ, সিটি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাস নিয়েছেন সাউথ সিটি কলেজের (বর্তমান শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজ) মর্নিং সেকশনেও। যদি সাহিত্য-অধ্যাপনার কোনো ইতিহাস রচনা করা যায়, তাহলে বোধ হয় বিশেষ একটি অধ্যায়ই ছাড়তে হবে নারায়ণবাবুর জন্য। অসামান্য বাচনভঙ্গি, কঠিন বিষয়কে সহজ করে বলার ক্ষমতা, দেশি-বিদেশি সাহিত্য সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান তাকে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়, তার শিক্ষাদান চলত শ্রেণিকক্ষের বাইরেও। একমাত্র ছাত্র-সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন টিএনজি স্যর। কথাকার, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, টেনিদার স্রষ্টা হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন, তেমন ছিলেন মাস্টারমশাই হিসেবেও। শিক্ষকতাকেও শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে আর কেউ পেরেছিলেন বলে মনে হয় না।
শিক্ষক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে মুগ্ধতার উল্লেখ রয়েছে তার নানা কৃতী ছাত্রের কথায়। কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত অনার্স ও এমএ, দুক্ষেত্রেই নারায়ণবাবুর ছাত্র ছিলেন। অনার্স পড়েছেন সিটি কলেজে, এমএ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি জানাচ্ছেন, ‘হলফ করে বলছি, যারা নারায়ণবাবুকে ক্লাশ নিতে দেখেন নি, তাঁরা অনুমানও করতে পারবেন না যে একজন শিক্ষকের জনপ্রিয়তা কোনখানে পৌঁছতে পারে। অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন তো দূরের কথা, বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাও তাঁর ক্লাশে হামলে পড়ত। দশ বা এগারো নম্বর ঘরের করিডোর দিয়ে মাছি গলতে পেতো না।’ বর্ণনাটা দিচ্ছেন শঙ্খ ঘোষ। এক স্পেশাল ক্লাসের। অন্তত তিনশ পড়ুয়ার দাবি, স্যারের ক্লাস চাই। তা, শুরু হলো ক্লাস। তিলধারণের জায়গা নেই। এমন সময়ে ঢুকলেন অত্যন্ত গৌরবর্ণ নারায়ণবাবু। ছ’ফুট ছুঁই ছুঁই লম্বা। গায়ে ধুতিপাঞ্জাবি। পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি। ক্লাসে তখনো পড়ুয়াদের অনেকে বসার জায়গা পাননি। পড়ানো শুরু করলেন নারায়ণবাবু। পড়ুয়াদের কেউ দেয়ালে, কেউ বা অন্যের পিঠে খাতা রেখে ‘নোট’ নেওয়া শুরু করলেন। আনন্দে বোধহয় খানিক উচ্ছ্বল হয়ে উঠলেন ছাত্রদের প্রিয় টিএনজি। বললেন, ‘আগে জানলে তো রিপোর্টারদের একটা খবর দিতাম, ছবি নিয়ে যেত।’ রিপোর্টার দরকার পড়েনি এমন অধ্যাপকের। কারণ তার ছাত্রবাৎসল্য তো যে সে জাতের নয়।
নারায়ণবাবুর একদা ছাত্র লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তার মাস্টারমশাইয়ের আশ্চর্য স্মৃতিশক্তির কথা শুনিয়েছেন। লেখকের কথায়, ‘কলেজ ছাড়ার পাঁচ ছ বছর বাদে ওর সঙ্গে এক জায়গায় দেখা। আমার দৃঢ় ধারণা, উনি আমাকে চিনতে পারবেন না। মাত্র বছর দেড়েক ওঁর ছাত্র ছিলুম, পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাশও পড়িনি —আমাকে চিনতে পারার কোনো প্রশ্নই ওঠে না— কিন্তু উনি ঠিক আমাকে দেখেই এক নিমেষও চিন্তা না করে বললেন, কি সুনীল কেমন আছো? তারপর আমাদের ব্যাচের অন্যান্য ছেলে— ফণিভূষণ আচার্য, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, শিবশম্ভু পাল প্রভৃতির কথাও জিজ্ঞেস করলেন। আমি স্তম্ভিত।’
তিনি ক্লাসে কখনো বই নিয়ে পড়াতেন না। অথচ দেশ-বিদেশের নানা সাহিত্য থেকে অবলীলায় অজস্র উদ্ধৃতি দিতেন। খানিক সুরেলা কণ্ঠে পাতার পর পাতা মুখস্থ বলতেন। স্তম্ভিত হয়ে যেতেন শিক্ষার্থীরা। এক দিন দুই বন্ধুর একজন ঠিক করলেন, স্যারকে একটু পরীক্ষা করলে কেমন হয়! ‘স্যার রবীন্দ্রনাথের ‘বনবাণী’ কাব্যটা তো পাঠে রয়েছে... আপনি একটু বুঝিয়ে দেবেন।’ স্যার এক কথায় রাজি। দু’জনকে নিয়ে একটি ফাঁকা ক্লাসে গেলেন তিনি। আর তার পর বলতে লাগলেন, ‘ওটা ১৯৩১ সালে বেরিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের তখন ৭০ বছর চলছে... প্রথম কবিতাটা হল ‘বৃক্ষবন্দনা’— অসাধারণ। শুনবে?’ আড়াই পাতার কবিতাটি ঝাড়া আবৃত্তি করলেন স্যার। দুই ছাত্রই মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। দু’জন, পরবর্তী সময়ের সাহিত্যের দুই দিকপাল অধ্যাপক উজ্জ্বল মজুমদার এবং সুধীর চক্রবর্তী। মাস্টারমশাইয়ের এমনই ছিল স্মৃতিশক্তি। এই স্মৃতিশক্তির সাক্ষী তার সহকর্মী অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তেতলায় চায়ের আড্ডা চলছে। আচমকা প্রবেশ প্রমথনাথ বিশীর। একটু যেন চিন্তিত। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, প্রমথবাবুর কবিতা সংকলন বের হবে ‘মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স’ থেকে। কিন্তু ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকায় একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল প্রমথবাবুর। সেই পত্রিকার সংখ্যাটি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। ‘কী কবিতা?’ প্রশ্ন নারায়ণের। নাম শুনে খানিক বিনয়ী হয়ে নারায়ণ বললেন, ‘কবিতাটা আমার মুখস্থ আছে, প্রয়োজন লেখা নিতে পারেন।’ বিস্ময়ে হতবাক প্রমথবাবু এবার বললেন, ‘দেখুন এত স্মৃতি ভালো নয়, ভালোমন্দ সবই আপনি মনে রাখতে পারেন দেখছি।’
মানুষটি বেশ রসিক ছিলেন। নিজেও হাসতেন, অন্যদেরও হাসাতেন। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিশতেন বন্ধুর মতো। একজন সাহিত্যিকের শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয়তার দৃষ্টান্ত বিরল। আবিষ্কার করেছেন তার ছাত্র, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। সিটি কলেজে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব হবে। ছাত্ররা নাটকের মহলা দিচ্ছে। নারায়ণ তখন ওই কলেজেরই বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। ওর লেখা ‘রামমোহন’ নাটকটি মঞ্চস্থ হবে। রামমোহনের চরিত্র করছে যে ছেলেটি, সে তখন বিএ’র থার্ড ইয়ারের ছাত্র। চুটিয়ে ছাত্র ফেডারেশন করা ছেলে। বামপন্থী রাজনীতি করে বলে নারায়ণের একটু বেশিই প্রিয়। নাটক মঞ্চস্থ হলো। সকলেই রামমোহনের অভিনয়ে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু তাও যেন ছেলেটির মন ভরে না। পরের দিন সটান গিয়ে হাজির তার প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে। ‘কাল আমার অভিনয় কেমন হয়েছে স্যার?’ শিক্ষক নারায়ণ তার ছাত্রের দুই হাত নিজের মুঠোয় ধরে বললেন, ‘দেখবে, একদিন তুমি অনেক বড় অভিনেতা হবে। অনেক বড়। আর তখন আমি বসে বসে তোমার জীবনী লিখব।’ বুকভর্তি আনন্দ নিয়ে সেদিন পটলডাঙার বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল সেই ছাত্র। মাস্টারমশায়ের সেই ভবিষ্যদ্বাবাণী ব্যর্থ হয়নি। সেদিনের ওই সদ্য তরুণটির নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর যে সৌমিত্রকে একদিন তিনি অনেক বড় অভিনেতা হবে বলে আশীর্বাদ করেছিলেন, সৌমিত্রর জীবনের প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনিই। একদিন মাস্টারমশায়ের বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন ছাত্র সৌমিত্র। সে দিনের আড্ডায় রয়েছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের এক প্রিয় বন্ধু চিত্র সাংবাদিক খগেন রায়। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ সিনেমারও পরিচালক ছিলেন তিনি। কথায় কথায় তরুণ সৌমিত্রকে তিনি প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন, ‘তুমি অভিনয় করবে? যদি চাও তো ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’ উত্তরে সৌমিত্র কিছু বলার আগেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন নারায়ণ— ‘না না খগেন, এ কী বলছ তুমি! ওর এখনও সিনেমায় নামার সময় হয়নি। আগে লেখাপড়া শেষ করুক, তার পরে না হয় ও সব হবে। পড়াশোনা থামিয়ে সিনেমায় যাওয়াটা ঠিক হবে না।’
মাস্টারমশাইয়ের কথা একবাক্যে মেনে নিয়েছিল ছাত্রটিও। সুযোগ পেয়েও সিনেমায় অভিনয়ের ধারেকাছে ঘেঁষেনি। তার অনেক পর, ছাত্রজীবন শেষ। যখন পাকাপাকিভাবে সিনেমায় নামবেন স্থির করলেন, প্রথমেই গেলেন মাস্টারমশায়ের কাছে। প্রিয় ছাত্রকে জড়িয়ে ধরে নারায়ণ বললেন, ‘আমি তো বলেইছি তুমি অনেক বড় অভিনেতা হবে। আসলে কী জানো, সিনেমার অভিনয়কে বোঝার জন্য পড়াশোনা করতে হবে। যখন যে চরিত্রেই অভিনয় করবে যত্ন নিয়ে, প্রাণ দিয়ে অভিনয় করবে।’ স্যারের আশীর্বাদ নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিলেন তার ছাত্র।
শুধু সাহিত্য ও অধ্যাপনাই নয়, সিনেমার জগতেও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিচরণ ছিল স্বচ্ছন্দ। হরিসাধন দাশগুপ্তের ‘কমললতা’ সিনেমার কাহিনি বিন্যাস, সংলাপ ও চিত্রনাট্য রচনার গুরুদায়িত্ব নারায়ণবাবুরই ছিল। সেই সময় নাম ভূমিকায় মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। তাই অনুরোধ নারায়ণবাবুকে, ‘যদি বাড়ি এসে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় একটু বুঝিয়ে দেন।’ খানিক কথাবার্তার পরেই সুচিত্রার জিজ্ঞাসা, ‘দাদা, ঠিক হচ্ছে তো?’ জিজ্ঞাসাটা সুচিত্রা ঠিক মানুষকেই করেছেন। কারণ উত্তম-সুচিত্রার ওই সিনেমার কাহিনি বিন্যাস, সংলাপ ও চিত্রনাট্য রচনার গুরুদায়িত্ব যে নারায়ণবাবুরই। এ ছাড়া ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘ইন্দিরা’, ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন’, ‘সাহারা’ প্রভৃতি অজস্র সিনেমায় নারায়ণবাবু চিত্রনাট্যকারের দায়িত্ব সামলেছেন। শুধু চিত্রনাট্যই নয়, ‘চারমূর্তি’, ‘নন্দিতা’, ‘সঞ্চারিণী’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের পরিচালনায় ‘টোপ’— বহু বার নারায়ণবাবুর লেখা ফিরে এসেছে সিনেমার পরদায়। গানও লিখেছেন ‘ঢুলি’ সিনেমায়। শুধু তাই নয়, উত্তমকুমার একবার নারায়ণবাবুর বাড়িতে এসেছিলেন সিনেমার একটি চরিত্র বুঝতে। শুধু উত্তমই নন, এক বার নারায়ণবাবুকে যেতে হয় সুচিত্রা সেনের বাড়িতেও। পঞ্চাননতলার বাড়ির বৈঠকখানায় বসে গল্পটা শুনিয়েছেন ছেলে অরিজিৎ।
নারায়ণবাবু চিরকালই অতিথিবৎসল ছিলেন। পটলডাঙার ২২/এ পটলডাঙা স্ট্রিটের বাড়িতে নারায়ণবাবু আর তার স্ত্রী আশাদেবীর সংসার। ছেলে অরিজিৎ তখন বেশ ছোট। জহর রায় যখন সবে কলকাতা এসেছেন, তখনো কয়েক দিনের জন্য ঠাঁই পেয়েছেন প্রিয় দাদা আর আশাবৌদির বাড়িতে। কখনোবা বৈঠকখানার বাড়িতে ঈদসম্মেলনও আয়োজন করতে দেখা গিয়েছে নারায়ণকে। অতিথির তালিকায় আবু সয়ীদ আইয়ুব, গৌরী আইয়ুবেরা থাকতেন। পটলডাঙার বাড়িতে তখন সকলের অবাধ যাওয়া-আসা। সকলেই স্বাগতম। দেদার মজাদার আড্ডা, সঙ্গে চা, মুড়ি-ডালমুট। ছাত্ররা তো বটেই, অনেক নামি-অনামি লেখকও চলে আসতেন আচমকা। এমনই একদিন মলিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এসে হাজির হলেন নারায়ণের বাড়িতে। ঘড়িতে বেলা এগারোটা কি বারোটা। তাকে দেখে বেজায় আনন্দিত নারায়ণ, ‘দাদা এসেছেন! আসুন আসুন কী সৌভাগ্য আমার!’ ভদ্রলোক বললেন, ‘এই তো পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম ভাবলাম একবার দেখা করে যাই। বেশিক্ষণ বসব না। এই আধঘণ্টার মতো বসে একটু গল্প করেই চলে যাব।’ ভদ্রলোকের গলা শুনে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নারায়ণ ঘরণি আশাদেবী। দাদা এসেছেন যখন দুপুরে চাট্টি ভাত খেয়ে যাবেন। ‘ভাত? আচ্ছা আপনি বলছেন যখন দুটি খেয়েই যাই। জমিয়ে রান্না করুন দেখি।’ নারায়ণ ওই বেলায় ছুটলেন বাজারে। ইলিশ মাছ দিয়ে জমিয়ে ভাত খেয়ে তারপর শুরু হল মজলিশি আড্ডা। পাশের ঘর থেকে কান খাড়া করে সেই গল্প শুনছে নারায়ণ-পুত্র অরিজিৎ। সেই ভদ্রলোক এমনভাবে ঘন বন-জঙ্গল, জোৎস্না রাতের পাহাড়, নির্জন টিলার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, চোখের সামনে সব যেন ছবি হয়ে ধরা পড়ছে। গল্পে গল্পে সেই বরাদ্দ আধঘণ্টা গড়িয়ে বিকাল। হঠাৎই হুঁশ ফিরল ভদ্রলোকের। ‘সর্বনাশ! চারটে বেজে গেছে! আমি যে আধঘণ্টা থাকব ভেবেছিলাম। আমি বেরোলাম।’ ‘একটু চা খেয়ে যান।’ ‘না না আর চা নয়। আর দেরি হলে ফিরতে পারব না,’ বলে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। নারায়ণ দেখলেন, তাড়াহুড়োয় যে দিকে যাবার কথা ঠিক তার উল্টো দিকের বাসে চড়ে বসলেন ভদ্রলোক। পরে অরিজিৎ জানতে পেরেছিলেন অমন সাধারণ দেখতে কিন্তু অলৌকিক প্রকৃতির বর্ণনা করতে পারা অন্যমনস্ক মানুষটির নাম ছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
নারায়ণের লেখার ভঙ্গিমাটিও চমৎকার। ছেলে অরিজিতের মনে পড়ে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে, বুকের নিচে বালিশ রেখে জার্মান মঁ ব্লাঁ, পেলিকান বা শেফার্ড পেন নিয়ে লেখালেখি করছেন বাবা। সংগত দিচ্ছে চা আর অবিরাম গোল্ডফ্লেক সিগারেট। ছোট ছোট মুক্তোর মতো অক্ষরে লম্বা ফুলস্ক্যাপ সাইজের কাগজের এক পিঠে লিখতে লিখতেই সৃষ্টি ‘উপনিবেশ’, ‘শিলালিপি’, ‘মহানন্দা’র মতো উপন্যাস। ‘হাড়’, ‘টোপ’, ‘ডিনার’-এর মতো অবিস্মরণীয় ছোটগল্প। ওই ভঙ্গিমাতেই সৃষ্টি হয়েছে টেনিদা চরিত্রের। আবার ‘সাহিত্য ও সাহিত্যিক’, ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’র মতো প্রবন্ধের বই, তাতেও কম যায় না নারায়ণের কলম। দ্বিতীয় বইটির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিফিলও পান তিনি। আসলে জীবন থেকেই লেখার উপাদান সংগ্রহ করে গিয়েছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, যাকে দেখে টেনিদা চরিত্রের সৃষ্টি, তিনিই জানিয়েছিলেন এমন কিছু কথা। একদিন আড্ডা চলছে। উপস্থিত প্রভাতকুমার ও নারায়ণ। এক সময় কথা প্রসঙ্গে প্রভাতকুমার জানালেন, ছেলেবেলায় রোগা চেহারায় তিনি ইয়াব্বড় চ্যাং ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন বিশ্বকর্মা পুজোয়। অমনি নারায়ণ বলেন, ‘অ্যাঁ, ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে আপনিও আকাশে উড়ে গেলেন!’ এই প্রসঙ্গ নিয়েই তৈরি হল ‘ঢাউস’। আড্ডা ছাড়া নারায়ণের আরও এক নেশা— ধর্মতলা আর শিয়ালদহ থেকে দুষ্প্রাপ্য নানা রেকর্ড সংগ্রহের। এই নেশাই হয়তো পরে কাজে লেগেছিল ‘রেকর্ড’ গল্পের বয়নে। আরও একবার। গরুমারার জঙ্গল দিয়ে গাড়িতে চলেছেন নারায়ণ এবং দুজন সংগীতশিল্পী। আলোচনা চলছে— হঠাৎ যদি বাঘ সামনে পড়ে, তা হলে কী হবে? যেই না বলা, অমনি রাস্তার পাশের জঙ্গল থেকে এক লাফে অন্যদিকে চলে গেলেন বাঘমামা। সেদিনের দুজন সংগীতশিল্পী ছিলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্র। এই প্রসঙ্গটাই খানিক অন্যভাবে এসেছে ‘চারমূর্তির অভিযান’-এ। ব্যক্তিজীবনে নারায়ণের আরও একটি শখ ছিল। তা হলো ভাষাশিক্ষার। স্ত্রীর বই নিয়ে নিজেই অত্যন্ত ভালোভাবে শিখেছিলেন ফরাসি ভাষা। পর্তুগিজ ভাষা-সাহিত্য নিয়েও আগ্রহ ছিল। যার ছাপ দেখা যায় ‘পদসঞ্চার’ উপন্যাসটিতে।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় চিরকালের স্বভাব লাজুক এবং আদ্যন্ত বিনয়ী। বাংলা সাহিত্যে এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন, সে কথাও যেমন তিনি মুখ ফুটে কাউকে বলতেন না, তেমনই কজনইবা জানে, তিনি ডক্টরেট হয়েও জীবনে কখনো নিজের নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি বসাননি। এমনকি লেখক-জীবন শুরুর সময়েও নিজের নাম প্রকাশেও ছিল সংকোচ। যে তারকনাথ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক পেলেন, লেখা ছাপাতে দেওয়ার সময় নিজের নামটিও বদলে দিয়ে লিখেছিলেন— নারায়ণ। ঠিক একইভাবে টেনিদা যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, ঘনাদার প্রসঙ্গে ঠিক তিনি টেনির মুখ দিয়ে বলিয়ে ছেড়েছেন, ‘কী বললি প্রেমেন মিত্তিরের ঘনাদা! কী যে বলিস! তাঁর পায়ের একটু ধুলো মাথায় দিতে পারলে বর্তে যেতুম রে।’ শুধু তাই নয়, লেখক-পুত্র অরিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানা যায়, একবার তাকে একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার কথাও উঠেছিল। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক মতবাদ ভিন্ন হওয়ার জন্য পুরস্কার কমিটিতে থাকা এক স্বনামধন্য সাহিত্যিক একপ্রকার জোর করেই নারায়ণের নাম খারিজ করে দিলেন। পুরো বিষয়টাই পরে জানতে পেরেছিলেন নারায়ণ কিন্তু জীবনে একবারের জন্যও সেই সাহিত্যিকের প্রতি কারও কাছে উষ্মা প্রকাশ করেননি। আজীবন নিজেকে যেমন ‘কমনম্যান’ বলতেন, বিশ্বাসও করতেন তেমনই। ১৯৬৫ সালে আকাশবাণীতে স্বরচিত কবিতা পাঠে তিনি পড়লেন— ‘আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস/নিয়ত তরঙ্গাঘাতে দিনে দিনে দিবে লুপ্ত করি/ ...এ বিশ্বেরে ভালবাসিয়াছি এ ভালোবাসাই সত্য এ জন্মের দান।’
ছাত্ররা যেমন মাস্টারমশাই বলতে অজ্ঞান। ছাত্রদেরও যেকোনো সমস্যায় তাদের স্যার সবার আগে। একবার ছাত্ররাজনীতি করা এক গরিব ঘরের ছেলের কলেজে ‘ফিস’ বাকি পড়ল অনেক টাকা। সে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার। ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে জানাতে ইউনিয়ন সেক্রেটারি জানাল, তারা মেরেকেটে সতেরো টাকা দিতে পারবে, তার বেশি সামর্থ্য নেই। ওতে কিছুই হবে না। শেষ উপায় নারায়ণ স্যার। তার কাছে গিয়েই পুরো ঘটনা জানাল ছাত্রটি। শোনামাত্র আর এতটুকু সময় নষ্ট না করে নারায়ণ ছেলেটিকে সঙ্গে করে সটান নিয়ে গেলেন কলেজ রেজিস্ট্রারের কাছে। তার অনুরোধে বকেয়া ‘ফিজ’ দুশো আটাত্তর থেকে নেমে এলো সোজা আঠাশ টাকায়। ওই টাকা দেওয়ারও ক্ষমতা নেই জানতেন নারায়ণ। সুতরাং সে-টাকা নিজেই মিটিয়ে দিলেন। ছাত্রটি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেল। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যাতে এমন সমস্যায় আবার না পড়ে তার জন্য একটি প্রাইভেট টিউশনও জুটিয়ে দিলেন তিনি। ওই ছাত্র আর কেউ নয়, পরবর্তীকালে যাকে বাংলা সাহিত্যজগৎ চিনবে কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত নামে। ছাত্রদের সঙ্গে একেবারে বন্ধুদের মতো মিশতেন নারায়ণ। এক বর্ষার দুপুরে অনার্স ক্লাসের ছেলেরা মিলে দরজা বন্ধ করে ‘আজি বরষণ মুখরিত’ গাইছে। সবার ওপরে চড়া গলায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গান তো চলছেই, সঙ্গে কাঠের বেঞ্চে উদ্দাম তবলার ঠেকা। দরজা খুলে ক্লাসে ঢুকলেন মাস্টারমশাই নারায়ণ। সঙ্গে সঙ্গে গোটা ক্লাস পাথর। সব চুপ। নারায়ণ বললেন, ‘কী হলো? গান থামল কেন? চলুক।’ ছাত্ররা তাতেও চুপ। নারায়ণ তখন সাফ জানালেন, গান শেষ না হলে তিনি কিছুতেই ক্লাস নেবেন না। অমিতাভ লিখছেন, ‘তাঁর নাছোড়বান্দা মেজাজ দেখে বহুকষ্টে ঠেলে ঠুলে সৌমিত্রকে তুলে দিলাম। অমন স্মার্ট ছোকরা; প্রায় কনডেমড সেলের আসামির মতো কাঁপা গলায় শেষ করল গানটি।’ তারপর রক্তকরবীর বিশুপাগলকে নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন নারায়ণ।
শিক্ষক-জীবনের পাশাপাশি ছাত্রদের লেখালিখিতেও তিনি ছিলেন বিপুল উৎসাহী। কেউ কবিতা লিখেছে, সটান চলে গেল স্যারকে শোনাতে, কেউ গল্প লিখেও তাই। স্যারকে না পড়ালেই নয়। স্যারের পটলডাঙার বাড়িতে যখন তখন ছাত্রদের আসা-যাওয়া। হইহই আড্ডা। সে আড্ডায় ছাত্রদের মধ্যে রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, নির্মাল্য আচার্যের মতো তরুণ লেখক। আবার ম্যাট্রিকে প্রথম হওয়া গৌরমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। যেতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও। অতি ব্যস্ততাতেও নারায়ণের সবসময় হাসিমুখ। ছাত্রদের লেখা পড়েন। মতামত দেন। কোনো ছাত্র বেশ কিছুদিন লেখা না দেখালে নিজেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘লেখা হচ্ছে তো ঠিকঠাক? কী লিখছ দেখিয়ো।’ কলেজের ছাত্ররা ছিল নারায়ণের প্রাণ। আর সেই ভালোবাসা যে শুধু ছেলেদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ কিংবা ক্লাসে সুন্দর করে পড়ানোর মধ্যেই আটকে ছিল, তা নয়। একবারের কথা যেমন। সিটি কলেজে সেদিন নাইট শিফট চলছে। আকাশ মেঘে লালচে। হঠাৎই কলেজের মেন ইলেকট্রিক সুইচে আগুন লেগে গেল। সবাই আতঙ্কে ছোটাছুটি করে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসছে। এদিকে নারায়ণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। দেখে সহকর্মী অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী বললেন, ‘আরে শিগগির চলুন নেমে যাই।’ শুনে স্বভাবমিষ্ট নারায়ণ বেশ রেগে গিয়েই ধমক দিলেন জাহ্নবীকে, ‘ছেলেগুলোকে ফেলে আমরা নামব আগে,’ বলে পাঞ্জাবির পকেটে হাত পুরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ওপরের সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভিড় হালকা হলো। সব ছেলে নেমে গেল। তারপর তিনি নামলেন। এমন জনপ্রিয়তা কিন্তু এক দিনে হয়নি। এর জন্য পরীক্ষাও দিতে হয়েছে নারায়ণকে, হয়তোবা অজান্তেই।
মার্ক্সবাদে আমৃত্যু বিশ্বাসী নারায়ণকে পাওয়া যায় বাম-গণ আন্দোলনেও। কখনোবা জলপাইগুড়ির বন্যার সময় দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে শোভাযাত্রায় এগিয়ে আসেন সস্ত্রীক নারায়ণ। কনিষ্ঠ সাহিত্যিক ও ছাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চেয়ে দেখেন, কীভাবে এই দম্পতি চার ঘণ্টা ধরে হেঁটে সেই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন। মৃত্যুর তিন বছর আগে অসুস্থ নারায়ণবাবু সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্ত্রী আশাদেবীকে নিয়ে উত্তরবঙ্গের বন্যার পরে কলকাতার পথে শোভাযাত্রা করেছিলেন। উদ্দেশ্য, বন্যাপীড়িতদের সাহায্য করা। শ্যামবাজার থেকে মিছিল বেরিয়েছিল। সেদিন প্রচণ্ড রোদ। রোদের মধ্যেই ঘণ্টা চারেক হেঁটে ঘুরে নারায়ণবাবু শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
১৯৭০ সালের ৬ নভেম্বর (মতান্তরে ৭ নভেম্বর) মৃত্যু হলো নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি ‘সুনন্দ’ ছদ্মনামে ১৯৬৪-৭০ প্রতি সপ্তাহে দেশ পত্রিকায় লিখে গেছেন ‘সুনন্দর জার্নাল’, যেখানে এক সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অর্থাৎ কমনম্যানের অবস্থান থেকে তিনি সমকালকে দেখাতে চেয়েছেন। সুনন্দর জার্নাল তখন হইহই করে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। বাঙালি পাঠক প্রতি সংখ্যার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকেন কলামটি পড়বেন বলে। প্রতিটি কিস্তিই যেন নলেন গুড়ের রসে ডোবানো এক-একটি তীক্ষ্ণ তীর। তেমনই একটি সংখ্যায় পাড়ার কালীপুজো নিয়ে অসুস্থ শরীরে সুনন্দ লিখেছেন, ‘এই এক ঘণ্টার মধ্যে বার আষ্টেক শুনেছি, ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল’। অকালমৃত পান্নালাল ভট্টাচার্যের দুর্ভাগ্য (না না আমারই), এমন দরদ দিয়ে গাওয়া গানটিও আমার যমযন্ত্রণা হয়ে উঠেছে।’ ব্যঙ্গরসের লেখাটির শেষ লাইন পড়ে একটু চমকেই উঠেছিলেন পাঠক। নারায়ণ লিখছেন, ‘সুতরাং অসুস্থ শরীরে জার্নাল লিখতে লিখতে ভাবছি পরের সংখ্যায় ‘দেশ’-এ সুনন্দর জার্নালের পাতাটি যদি অদৃশ্য হয় আশা করি তাহলে আপনারা কেউই বিস্মিত হবেন না। জানবেন আরেকটি কমনম্যান বাঙালীর অবলুপ্তি বা আত্মবিসর্জন ঘটল।’ সেদিন অবশ্য সকলেই মুচকি হেসে ভেবেছিলেন, ধুস তাই আবার হয় নাকি! এও নিশ্চয়ই এক নারায়ণী রস। কিন্তু তারপর যখন আর সত্যিই প্রকাশ পেল না সুনন্দ, তত দিনে গোটা বাংলার মানুষ জেনে গিয়েছেন তাদের প্রিয় জার্নাল আর সত্যিই কোনোদিন প্রকাশ পাবে না। আজন্ম রসিক নারায়ণ এবার বড় বাস্তব রসিকতা করেছেন তার নিজের জীবনের সঙ্গেই! কী করে যে আগাম জেনে গিয়েছিলেন নিজের চলে যাওয়া! ওইদিন রাতের খাওয়া হয়েছে সবেমাত্র। পুত্র অরিজিৎ পাশের ঘরে বসে বাবারই দেওয়া শার্লক হোমসের গল্প পড়ছেন। এমন সময়ই মা আশাদেবীর চিৎকার, ‘বাবলু দ্যাখ, বাবা কেমন করছেন!’ বাবার ঘরে দৌড়ে গেলেন ছেলে। বাবাকে দেখেই ছুট দিলেন কাছে থাকা চিকিৎসক-সাহিত্যিক নীহাররঞ্জন গুপ্তের ‘উল্কা’ বাড়িতে। গেঞ্জি গায়েই এলেন কিরীটির স্রষ্টা। পরামর্শ দিলেন, ‘এখনই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।’ বেশ কয়েকটা বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরলেন অরিজিৎ। সব জায়গাতেই এক রা, ‘বেড নেই।’ পরে ভর্তি করানো হলো এসএসকেএমে। মাত্র একটা দিন। ৬ নভেম্বর (মতান্তরে ৭ নভেম্বর) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাঙালির প্রিয় সুনন্দ। বাঙালির কাছে খবরটা হাহাকারের মতো। কিন্তু সুনন্দর কাছেও কি এটা আকস্মিক ছিল? বোধ হয় না। তা না হলে কীভাবে ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘সুনন্দর জার্নাল’-এর শেষ জার্নাল ‘অসুস্থ শরীরের ভাবনা’য় সুনন্দ লিখবেন, ‘অসুস্থ শরীরে জার্নাল লিখতে লিখতে ভাবছি, পরের সংখ্যায় ‘সুনন্দের পাতাটি’ যদি না থাকে, তা হলে বুঝবেন, আর একটি কমনম্যান বাঙালির অবলুপ্তি বা আত্মবিসর্জন ঘটল।’
ফুলে ফুলে সাজানো ট্রাকে চড়ে নারায়ণ চলেছেন শেষ যাত্রায়। সঙ্গী অগণিত ছাত্রছাত্রী, সংবাদমাধ্যম, নানা পত্রিকা, সংস্কৃতি জগতের বহু বিশিষ্ট মানুষ। এমন মেঘলা আবহাওয়ায় আচমকা শোনা গেল, ‘জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে...’ নিজেকে সামলে কখন দরাজ কণ্ঠে গেয়ে উঠেছেন সুচিত্রা মিত্র। ‘শিলালিপি’র নায়কের শেষ চিহ্নটুকু যখন ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে গঙ্গার বুকে, সুচিত্রা মিত্র ভিজে গলায় গাইছেন— ‘তবু মনে রেখো...’। যে সৌমিত্রকে একদিন তিনি অনেক বড় অভিনেতা হবে বলে আশীর্বাদ করেছিলেন, সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে হয়তো সেদিন সেই ভিড়ের মধ্যেই ক্যাবলা হাবুল, প্যালারামও ছিল। কিশোর অবুঝ মন নিয়ে ভাবছিল এই এক্ষুনি বুঝি ‘ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক’ বলে একমুখ হাসি নিয়ে পালঙ্ক থেকে উঠে দাঁড়াবে তাদের বন্ধু। অপেক্ষা করছিল... কিন্তু আর কিছু হয়নি।
শহরজীবনের হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা সবাই এখন রামগরুড়ের ছানা হয়ে যাচ্ছি। হাসতে ভুলে গেছি, বলা ভালো, ভুলতে বাধ্য হয়েছি। বিশ্ব জুড়ে চাপিয়ে দেওয়া ইঁদুরদৌড়ে আমরা যখন হাঁসফাঁস করি তখনই তো তাদের নির্মল আনন্দের সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিব্রাম চক্কোত্তিরা এভাবেই এগিয়ে আসেন। তাদের অসামান্য রসসাহিত্যে অবগাহন করে আমরা আমাদের আয়ুকে আরও একটু বাড়িয়ে নিই। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায়— সাহিত্য কেবল মননশীলতার ব্যাপার নয়, তা একই সঙ্গে মানবিকতা, রসবোধ ও দায়বোধের সমন্বয়। মাস্টারমশাই থেকে টেনিদার জনক— এই দুই পরিচয়ের মিলনেই তিনি সম্পূর্ণ। আর সেই সম্পূর্ণতার জন্যই তিনি বাংলা সাহিত্যের চিরদিনের সম্পদ। আর সেজন্যই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় না পড়া থাকলে, আপনার বাংলা সাহিত্য পাঠ অসম্পূর্ণ।
ঋণস্বীকার
১. আমার কথা — নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
২. সমগ্র কিশোর সাহিত্য — নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা। প্রকাশকাল আগস্ট ১৯৯৬
৩. শ্রেষ্ঠ গল্প — নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। সম্পাদনা ও সংকলন- সজল আহমেদ, কবি প্রকাশনী, ঢাকা। প্রকাশকাল অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮
৪. উজাগর — নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা। সম্পাদক: উত্তম পুরকাইত। হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ। প্রকাশকাল ২০১৫
৫. ‘নানা রঙের নারায়ণ’ — অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। আনন্দবাজার অনলাইন, শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
৬. ‘মাস্টারমশাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়’ — জয়ন্ত সিংহ মহাপাত্র। আনন্দবাজার অনলাইন, শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২০
৭. ‘২০ নম্বর পটলডাঙা স্ট্রিট’ — বিনোদ ঘোষাল। আনন্দবাজার অনলাইন, শেষ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৬
৮. ঋণ: টেনিদা সমগ্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা, কোরক-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা, শঙ্কর দাশ, উজাগর (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা)








