প্রিয় ৫ বই
- থ্রি কমরেডস — এরিখ মারিয়া রেমার্ক
- পথের পাঁচালী— বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- ওভারকোট— নিকোলাই গোগল
- ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট— ফিওদর দস্তয়ভস্কি
- খেলারাম খেলে যা— সৈয়দ শামসুল হক

আনোয়ারা সৈয়দ হক
বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিবিড়, একান্তই আত্মিক। সাহিত্যের ভুবনে যে কটি বই আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে, নাড়িয়ে দিয়েছে ভেতর থেকে, তাদের মধ্যে পাঁচটি বই নিয়ে কিছু বলা খুবই বিপজ্জনক। হয়তো কোনো প্রিয় বই বাদ পড়বে, আবার অনেক প্রিয় কোনো বইয়ের নাম স্মৃতির প্রতারণায় বলা হবে না। তবে পাঁচটি বইয়ের নাম বললে প্রথমেই আসে এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘থ্রি কমরেডস’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির পটভূমিতে তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব, প্রেম আর মৃত্যুর গল্প— এ যেন মানবিক সম্পর্কের এক মহাগাথা। রেমার্কের ভাষা এতটাই সরল অথচ গভীর যে, পড়তে পড়তে নিজেকেই আমি মাঝে মাঝে গল্পের ভেতরে হারিয়ে ফেলি। এরপর রাখা যায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’কে। অপু-দুর্গার শৈশব, নিশ্চিন্তপুরের পথ-ঘাট-মাঠ, সর্বজনীন দারিদ্র্যের মধ্যে প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্য— এ উপন্যাস যেন বাঙালির চিরন্তন জীবনের আখ্যান। বিভূতিভূষণের বর্ণনাভঙ্গি আমাকে প্রতিবার নতুন করে ভাবায়, কীভাবে এত সরলতার মধ্যেই এত গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলা যায়। তৃতীয় বইটি হলো নিকোলাই গোগলের ‘ওভারকোট’। একজন সামান্য কেরানি, তার জীর্ণ ওভারকোট আর সেটি ঘিরে তার জীবনের ট্র্যাজেডি— গোগল এই ক্ষুদ্র গল্পে সমাজের নিষ্ঠুরতা আর আমলাতন্ত্রের ফাঁদকে এমনভাবে ধরেছেন যে, গল্পটি শেষ হওয়ার পরও অনেকক্ষণ বুকের ওপর পাথরচাপা হয়ে বসে থাকে। চতুর্থ বই ফিওদর দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’। রাস্কলনিকভের অপরাধ ও তার মানসিক শাস্তির এ উপন্যাস শুধু একটি ক্রাইম থ্রিলার নয়, এটি মানুষের বিবেক, নৈতিকতা আর মুক্তির এক গভীর দর্শন। দস্তয়ভস্কির প্রতিটি চরিত্র যেন মনের অন্ধকার কুঠুরিতে আলো ফেলে।
আর শেষ বইটি একেবারে আমার, আমাদের— সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ আর এক তরুণের জীবনপথের উত্থান-পতন এক অসাধারণ গদ্যশৈলীতে রচিত এ উপন্যাস যেন আমাদেরই ইতিহাসের শিল্পিত দলিল। আমাদের সামাজিকতা-অসামাজিকতা আর যৌনমনস্তত্বর বিবেচনায়ও এ এক অসামান্য উপন্যাস। এটি পড়তে গেলে বারবার আমার মনে হয়, ভাষা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, যদি তা সৈয়দ শামসুল হকের হাতে পড়ে— ভাষার সম্ভাবনাগুলোকে একজন লেখক কীভাবে এতভাবে তুলে ধরতে পারেন, তা হক সাহেব দেখিয়েছেন।
এই পাঁচ বই— তিনটি দেশ-কাল-ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে আসা আর দুটি আমাদেরই মাটি-মানুষের গল্প— আমার সাহিত্যচেতনার পঞ্চভিত্তি। এদের প্রতিটি পৃষ্ঠা আমাকে শিখিয়েছে জীবন কাকে বলে, মানুষ কাকে বলে আর লেখালেখির নিগূঢ়তম শিল্পইবা কী!
শ্রুতিলিপি: শিমুল সালাহ্উদ্দিন




