তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তম
শহীদ কাদরীর বাড়ি

শহীদ কাদরী (১৪ আগস্ট ১৯৪২ - ২৮ আগস্ট ২০১৬)
কীভাবে যেন দেখাই হয় না আর প্রিয় মানুষের সঙ্গে। অথচ আমরা বেঁচে আছি, একই সময়ে আছি, একই পৃথিবীতে আছি, তারপরও দেখা হয় না। তারপর যখন মানুষটা হারিয়ে যান, দেখা হওয়ার শেষ সম্ভাবনাও বিলুপ্ত হয় চিরকালের জন্য। এরকম হয়তো হয়ই। আমার শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা কখনো হয়নি এবং তিনি আর কোনোদিনও দেখা দেবেন না, কাউকেই। বাংলা কবিতার পাঠক হয়ে উঠলাম তো বয়ঃসন্ধিতেই, গ্রাম-মফস্বলের ঘর-বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছি তখন, হয়তো কলেজে পড়ি, জেলা শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে সময় কাটাই। উপন্যাস পড়ি বেশি, কিন্তু কীভাবে যেন কবিতার দিকে ঝুঁকে পড়লাম ধীরে ধীরে। শহীদ কাদরীর কবিতার সঙ্গেও আলাপ হলো, বোঝাপড়া শুরু হলো। এই বোঝাপড়া তো শহীদ কাদরীর সঙ্গেই, তাই না? জানলাম, এই কবি ঢাকায় থাকেন না, কবি থাকেন নিউ ইয়র্কে এবং কিছুদিন হয়তো জার্মানিতেও ছিলেন। ঢাকার পুরানা পল্টনে থাকতেন। পুরানা পল্টনে তো একটা বাড়ি ছিল বুদ্ধদেব বসুরও। তবে দেশভাগের আগেই তিনি জন্মেছিলেন কলকাতায়। তার মাত্র তিন-চারটা কবিতার বই, তাতেই তিনি পাকাপাকি হয়ে গেলেন বাংলা কবিতায়, বাংলা ভাষায়। ততদিনে আমিও ঢাকায় চলে এসেছি। পুরানা পল্টনেও যাই, কিন্তু শহীদ কাদরী তো বাড়িতে নেই। বাংলাদেশেই নেই, বাংলা ভাষায় আছেন। তার সময়ের কবিতার বন্ধুরা আছেন, শামসুর রাহমান আছেন, আল মাহমুদ আছেন, ফজল শাহাবুদ্দিন, সৈয়দ শামসুল হক, ওমর আলী আছেন। সৈয়দ হক, আল মাহমুদ বা শামসুর রাহমানের সঙ্গে তুমুল আলাপ-সালাপ চলল অনেক বছর। ওনাদের মুখেও কাদরী প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক বিছুই শোনা হলো, জানা হলো। দিনে দিনে প্রায় সবাই গত। শহীদ কাদরীও মারা গেলেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কবির লাশ আনা হলো ঢাকায়। ঠিক তার আগের দিনই আমি কলকাতা গেছি বলে কবির লাশের সঙ্গেও আমার দেখা হলো না। এর বহু বছর পর এক ঘরোয়া আড্ডার পানপাত্রের অনেকটাই জুড়ে বসেন কবি শহীদ কাদরী। তারই রেশ ধরে লিখছি এখন। যার সঙ্গে কখনো আমার দেখাই হয়নি, সেই কবির সঙ্গে একটু স্মৃতিচারণ করা যাক। কাদরী তখনো বেঁচে, আমি ঢাকায় তিনি আটলান্টার ওপারে। আমাকে ফোন করলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক আদনান সৈয়দ। বললেন, ‘আপনি একটু সময় দেবেন? আপনার কবিতার বইতে অটোগ্রাফ দেবেন।’ অটোগ্রাফ দেওয়ার আগে আদনান সৈয়দকে, তাকেও আমি প্রথম দেখছি সেদিন। বললাম, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় এসেছেন অটোগ্রাফ নিতে?’ তিনি বললেন, আমি একটি কবিতার বইয়ের তালিকা নিয়ে এসেছি, তালিকা করে দিয়েছেন কবি শহীদ কাদরী, বইয়ের ক্রেতাও তিনি, তার নামেই অটোগ্রাফ দিতে হবে।’ আমার কাছে ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য লাগছিল সেদিন। এর বহু বছর পর লালমাটিয়ার এক সন্ধ্যায় অভিনেতা শাহীন খান ও তার স্ত্রী শীলুর মুখোমুখি যখন আমরা কজন শিমুল, লোপা ও খোকন কীভাবে যেন সেই আড্ডাটা কাদরীর হয়ে উঠল। কথায় কথায় জানলাম, শাহীন খান ও শীলু যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন যেতেন কাদরীর বাসায়। ওখানে কাদরীর পড়ার টেবিলে বাংলা ভাষার বইপত্র। তার মধ্যে আছে আমার কবিতার বইও, সেই অটোগ্রাফ সংবলিত বই। খোকনও জানাল। খোকন যুক্তরাষ্ট্রে কাদরীর বাড়িতেও গেছে, দুজনের ভালো সম্পর্ক হয়েছে। দুই প্রজন্মের দুজন, শহীদ কাদরী ও আলফ্রেড খোকন। খোকনের বইও সংগ্রহ করেছেন কাদরী, যুক্তরাষ্ট্রে বসেই। কাদরী তার পছন্দমতো কবিতার বইয়ের তালিকা করে বইগুলো ঢাকা থেকে সংগ্রহ করতেন। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের তরুণ কবি নব্বই দশকের কবিতার সঙ্গে বোঝাপাড়ার সাঁকো তৈরি করেছেন এভাবেও, বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরের কোনো দেশে থেকেও বাংলা কবিতার ধারা-পরম্বরার সঙ্গে থাকা যায়, অবাক লাগে। কাদরীর একসময়ের স্ত্রী ও ষাটের দশকের সুন্দরী কবি নাজমুননেসা পিয়ারীর কথা জানতাম বিভিন্ন জনের লেখায়। পিয়ারী দীর্ঘ সময় ধরে জার্মানিতেই থেকে গেলেন। জার্মানিতেই তখনকার সংবাদকর্মী ও পরবর্তী সময়ে অনেক বড় শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও কি গাঁট্টি বেঁধেছিলেন পিয়ারী? কক্সবাজারের দরিয়া নগরে, সমুদ্রের কিনারে দাঁড়িয়ে একদিন আমি পিয়ারীকেও সে প্রশ্ন করেছি। পিয়ারী বললেন, ‘কাদরী বা সুমন, দুজনেই অতীতে বিলীন। এখন তো তুমি আর আমি দুই প্রজন্ম মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আছি। সমুদ্র দেখছে, আমার সামনে নাজমুননেসা পিয়ারী, পিয়ারী বলতেই শহীদ কাদরী হাজির হলেন অদৃশ্যত। হ্যাঁ, কবি চলে যাওয়ার পরও তিনি ঠিক ওভাবে হাজির থাকেন আমাদের মধ্যে। কবিতাও কবির হাতে রচিত হতে হতে কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় গিয়ে পৌঁছায়। কবি ও কবিতার মধ্যে যে আন্তঃসম্পর্ক রচিত হতে থাকে, সেরকমই কি দুজন মানুষের সম্পর্ক শুরু হয় কোথা থেকে আর কোথায় গিয়ে পৌঁছায়? কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? কোথাও পৌঁছায় বটে, সেই জায়গার নাম কী? কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, না একটু থমকে যায়? তারপর আবারও চলতে থাকে, গতি হয়তো শ্লথ হয়। নাকি? আলোকচিত্রী নাসির আল মামুনের কাছে শহীদ কাদরীর অনেক কথা শুনেছি। সেসব স্মৃতি তাদের বিদেশের মাটিতে। যে কবি লিখলেন, প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই/শান্তি পাবে না পাবে না তার উপলব্ধি, যা কি না সেই ষাটের দশকেই রচিত, সেই কবিই তো আবার লিখলেন, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা।’ অর্থাৎ দ্বন্দ্ব থেকেই যাচ্ছে এই প্রতীচ্য তাড়িত প্রহেলিকাময় বাঙালির জীবনেও। নগরায়ণের পশ্চিমা চাপ এই দ্বন্দ্ব। আবার প্রেমেও চিরায়ত। বিদীর্ণ করবে কবীকে, করেছেও। বিনয় যেভাবে বললেন, ‘দেখেছি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে।’ অনেক লেখায় আছে কাদরী ও কাদরীর কবিতা নিয়ে। গবেষকরা লিখবেন। আমি একটি হাস্যলাস্য ঘটনার রেশ টেনে এ লেখা শেষ করব। সংবাদ সাময়িকীতে নিয়মিত প্রকাশ হতো সৈয়দ শামসুল হকের কলাম হৃৎকলমের টানে। এটা পরে তিনি লিখেছেন, ‘পল্টনে কাদরীর বাসায় আড্ডা হতো অনেক রাত পর্যন্ত। আড্ডা শেষে যে যার মতো চলে যেত। কাদরীর সঙ্গে কেউ হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিত, কেউ না করেও বিদায় নিত। শুধু একজনকে কাদরী বিদায় দিতেন কোলাকুলি করে। একদিন বলি, মাহমুদের সঙ্গে কোলাকুলি করে বিদায় দাও, খাতির কি বেশি? শহীদ কাদরী জানান, আরে নাহ। আল মাহমুদের সঙ্গে কোলাকুলি করার সময় আমি ওর কোমরে হাত বুলাই, দেখি কয়টা বই গুঁজে নিয়ে যাচ্ছে। সময়ের স্মার্ট কবি শহীদ কাদরী। দেশান্তরী কবি শহীদ কাদরী। তার কবিতা, ‘শহীদ কাদরী বাড়ি নেই’-এর মতো তিনি বাড়িতে তো থাকলেনই না, তার বাড়িই থাকল না। কলকাতা, ঢাকা, জার্মানি, নিউ ইয়র্ক— কোথায় তার বাড়ি? শহীদ কাদরীর বাড়ি বাংলা কবিতায়, বাংলা ভাষায়।







