ঝরাপাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কিন্তু আজ ইগরের মাথায় ফুটবলের চিন্তা নেই। আরও অনেক জরুরি বিষয় ওর ভাবনায়। না ফাটা ল্যান্ডমাইন আর গোলা থেকে বাঁচার কায়দা শেখাল ইগর।
দোনেৎস্কের বন-জঙ্গল আর চাষের জমি এখন ভয়ংকর ল্যান্ডমাইনে ভরা। তার মধ্যে পুরনো আর নতুন দুই ধরনেরই আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৮০ বছর হলো। কিন্তু এখনো মাঝেমধ্যেই সেই সময়কার মাইন পাওয়া যায় এদিকটায়। তার ওপর আবার বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে চলতি যুদ্ধের হাজারো মাইন আর তাজা গোলা।
দুটি মোদ্দা কথা শিখিয়ে দিল ইগর। এক, ঘাসের ওপর বা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটা যাবে না। দুই, পড়ে থাকা কোনো কিছু মাটি থেকে তোলা যাবে না। নিজের হাত থেকে পড়ে যাওয়া জিনিস ছাড়া আর কী। খুবই সিরিয়াস মনে হচ্ছিল ইগরকে। এমনকি কথাগুলো সাশার মনে আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ওকে আবার সব বলিয়েও ছাড়ল সে।
যুদ্ধ তো একান্তই কামান-বন্দুকধারী বুঝদার সেনাসামন্তের কারবার। কিন্তু চকচকে ক্লাস্টার বোমা বা অদ্ভুতদর্শন গোলার ধোঁকার শিকার নিষ্পাপ শিশুরাই হয় বেশি।
ইগর চলে গেল। আমরাও ফিরে এলাম বাসায়। ইগরকে কেন নাস্তা করতে সঙ্গে আনলাম না জিজ্ঞেস করল মা। কথাটা নির্দোষ কৌতূহল নিয়েই তা স্পষ্ট। কিন্তু আমি না শোনার ভান করলাম। আজ আসলে আমার আর কথা বলারই মুড নেই।
আগের প্ল্যান মতোই বাবা সকালে ব্যাংক খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে গেল। তবে ফিরতে ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল তার। দেরির কারণও আছে। ফেরার পথে সাশার স্কুলে ঢু মেরে ওর কাগজপত্রও নিয়ে এসেছে বাবা। যেটা আগে করার কথা ছিল না। বাবার এত দেরি দেখে মা তো সেই রকম খেপে গিয়েছিল। তবে স্কুলের কাজের বিষয়টা জেনে আর কথা বাড়াল না।
কিন্তু ব্যাংক থেকে ফেরার পর থেকেই দেখি বাবা নিজে রাগে ফুঁসছে। দেশি টাকা ভাঙিয়ে কয়েক মাস আগেও যে ইউরো বা ডলার পাওয়া যেত, আজ তার সিকিভাগও পায়নি। মহাবিরক্তি নিয়ে বাবা বলল, ‘যুদ্ধ আমাকে এখনো না মারলেও ব্যাংকগুলো সে কাজ করে ফেলেছে।’
যাই হোক, দুপুরের খাবার শেষ হতেই আমরা গাড়িতে জিনিসপত্র তোলা শুরু করলাম। বাড়তি চাবি নিয়ে দাদু ভোরেই চলে এসেছিলেন। আমরা যেখানে যাচ্ছি সে জায়গাটা ১০০ কিলোমিটারও দূরে না। কিন্তু দাদু এমনভাবে গাড়ির অবস্থা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন, মনে হচ্ছিল গোটা ইউরোপ পাড়ি দিতে যাচ্ছি যেন! ইঞ্জিন অয়েল, কুল্যান্ট, বেল্ট, হোসপাইপ, ব্যাটারি, ব্রেক ফ্লুইড, উইন্ডশিল্ডের পানি, টায়ারের চাপ— একটাও দেখতে ভুললেন না। তবে এতক্ষণ ধরে ঠিক কী করছিলেন, দাদু তা নিজেও হয়তো জানেন না। আমার মনে হলো বিদায়ের বেদনা চাপা দিতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখছিলেন গাড়ির পেছনে লেগে।
কঠিন খোলসের নিচে সাবেক কমিউনিস্ট এই মানুষটা আসলে এক আবেগের খনি। কয়েক বছর ধরে শনিবার এলেই বিকালে আমাকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে যেতেন। হাঁটতে হাঁটতে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। পরিবেশ-প্রকৃতি থেকে অর্থনীতি, পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদের রাজনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ হেন বিষয় নেই, যা দাদু আর আমার আলাপে উঠে আসত না। কোনো সত্তর পেরোনো বুড়োর সঙ্গে আমার মতো পুঁচকে মেয়ের এ ধরনের ভাবগম্ভীর বিষয়ে আলাপ হতে পারে, তা অনেকের হয়তো বিশ্বাসই হবে না। কিন্তু দাদু সত্যিই আমার হিরো ছিলেন। ছিলেন কি? এখনো আছেন। ইগরের সঙ্গে ভাব হওয়ার পরেও শনিবারের বিকালটা তুলে রাখা ছিল দাদুর জন্যই।
দাদু আজ বাইরে আবেগ দেখাচ্ছেন না। কিন্তু আমি শিওর, সবাই চলে গেলে উনার বুকটা খালি হয়ে যাবে। আর যে কয়টা দিন বাঁচবেন সেই শূন্যতা আর পূরণ হবে না।
গাড়িতে মালপত্র তুলতে গিয়ে আমাদের জান বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। ভালো বড় সুটকেস ঘরে বেশি নেই। তাই বেশিরভাগ কাপড়চোপড় আর রান্নাঘরের জিনিস ঠেসে ভরা হয়েছে বড় বড় কালো ময়লা ফেলার ব্যাগে। বাসায় খুঁজে পাওয়া গেছে শুধু একটা সুটকেস আর একটা ডাফেল ব্যাগ। আর আছে যার যার ব্যাকপ্যাক। আগে ছুটিতে ক্রিমিয়া বেড়াতে যাওয়ার সময় এগুলোতেই হয়ে যেত। কিন্তু এখন তো ঘটনা অন্যরকম।
যাই হোক, গাড়ির ট্রাংকে প্রথমে ঢুকল সুটকেস এবং সেলাই মেশিনটা। তারপর ভরা হলো ডাফেল ব্যাগ আর ব্যাকপ্যাকগুলো। তারপর এলো ময়লা ফেলার বস্তাগুলোর পালা। কোনাকাঞ্চি যা খালি ছিল সেখানেই ঠেসে ঢোকানো হলো সেগুলো। নাছোড়বান্দা মার চেষ্টার শেষ নেই। রান্নার খালি হাড়িপাতিলের ভেতরেও ময়দা, চিনি বা লবণের মতো কিছু না কিছুর প্যাকেট ভরেছে। সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে গোঁজা হয়েছে আবার কাপড়চোপড়। মোদ্দা কথা, ট্রাংকের প্রতিটি ইঞ্চিই কাজে লাগিয়ে ছেড়েছেন মা।
সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করছিল বালিশ, লেপ আর শীতের পোশাকের মতো গাব্দাগোব্দা জিনিসগুলো। শেষমেষ বালিশ আর জ্যাকেট-সোয়েটারের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হলো লেপ। এতে পেছনের সিটটা আরও একটু উঁচু হয়ে গেল। টেলিভিশনটাকে দুটি বিছানার চাদরে মুড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো সিটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায়। চারপাশে ঠেসে বসানো বালিশগুলোই টিভিটাকে সামলে রাখল। মা পথের জন্য নেওয়া খাবারগুলো রাখল তার পায়ের কাছে।
সাশা, বেনিচকা আর আমি বসব পেছনের সিটে। মালপত্রের জন্য আমাদের মাথা নির্ঘাত ছাদে গিয়ে ঠেকবে! শীতের পোশাকগুলো পেছনের ডেকে গুঁজে দেওয়া হয়েছে। তাই পেছনের উইন্ডশিল্ড দিয়ে আর কিছু দেখা যাবে না। তার মানে কি, দোনেৎস্ককে একেবারেই ছেড়ে যাচ্ছি আমরা? আর পেছনে ফিরে তাকানোরও দরকার নেই? নাহ্, আমি মনে হয় একটু বেশি বেশিই ভাবছি!
বাবা গাড়ির সাইড মিররগুলো নেড়ে ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন। পেছনের উইন্ডশিল্ড জিনিসপত্রে ঢাকা পড়লেও মিরর দিয়ে অন্তত পাশের দৃশ্য দেখতে পারবে।
আশ্চর্য ব্যাপার, এত জিনিসপত্র সবই শেষ পর্যন্ত ধরে গেল গাড়িতে! এতেই শেষ না। দেখা গেল, এখনো গাড়ির ছাদটা খালি। মা তো মহাখুশি। এবার তাহলে তার প্রিয় ফ্রিজটার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বাবা অবশ্য প্রায় ধমক দিয়ে তার উৎসাহ নিভিয়ে দিলেন— ‘কী যে বলো তুমি! ফ্রিজটাকে ছাদে শুইয়ে রাখলে কম্প্রেসারের সব তেল কুলিং লাইনে চলে যাবে না? ভেতরে একবিন্দু ঠান্ডা হবে না আর। জিনিসটা স্রেফ একটা কাঠের বাক্স হয়ে যাবে।’
মা কোনো তর্কে গেলেন না। পদার্থবিদ্যা নিয়ে আলাপে তার কখনো বাবাকে চ্যালেঞ্জ করার কথাও না। তার শ্বশুরের মতো স্বামীটিও যে ইঞ্জিনিয়ার।
মা অবশ্য হাল ছাড়ার মানুষ না। ঠিক করলেন ফ্রিজ না হোক, ছাদে জাজিম দুটি বেঁধে নেবেন। এতক্ষণ বেশিরভাগ ভারী জিনিসপত্র বাবা একাই টানাটানি করছেন। কিন্তু তিন তলার ফ্ল্যাট থেকে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে জাজিম নামানোর জন্য তাকে দাদুর সাহায্য নিতেই হলো। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, গাড়িটার চেহারা হয়েছে মরু কাফেলার মালপত্রের বোঝায় কাহিল উটের মতো।
মালসামানা তোলার কাজ শেষ। এবার শুধু গাড়িতে উঠে বসা বাকি। তার আগে একটা কাজের জন্য ঘরে ফিরলাম সবাই। কাজটা আর কিছুই না, ঘরের ভেতর স্রেফ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। স্লাভদের একটা পুরনো রীতি এটা— সিয়েস্ত পেরেদ দারোগয়। দূরের পথে যাত্রা করার আগে খানিকক্ষণ নিশ্চুপ বসে থেকে মনটাকে গুছিয়ে নেওয়াই হচ্ছে সিয়েস্ত পেরেদ দারোগয়। সাধারণত এ সময় কিছু ফেলে যাওয়া হলো কি না, তা শেষবার দেখা আর শুভযাত্রার জন্য প্রার্থনা করে লোকে।
ভাবগম্ভীর পর্বটা শেষ হলে আমরা একে একে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলাম। মা বেরোলেন সবার শেষে। চোখভরা জল। বুকের ওপর ক্রুশচিহ্ন এঁকে মা দরজায় তালা দিলেন। তারপর চাবিটা তুলে দিল দাদুর হাতে।




