পাঠ চক্র থেকে অভ্যুত্থান
সাহিত্যে জুলাই কতটা স্পন্দিত?

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও লড়াইয়ের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির আঙিনায়।
রাজনীতিতে যখনই গণতন্ত্রের পথ সংকুচিত বা বাধার সম্মুখীন হয়েছে, তখনই এ দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নতুন পথ দেখিয়েছে। অনেকে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকেই বেছে নিয়েছেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও লড়াইয়ের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির আঙিনায়। তবে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই মুক্ত সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চাকেও নানা সময়ে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। যে সুপ্ত সংস্কৃতিচর্চা থেকে অভ্যুত্থানের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল, উত্তর-অভ্যুত্থান পর্বে সমকালীন সাহিত্যে সেই জুলাই কতটা নির্মোহ ও নান্দনিকভাবে স্থান পেয়েছে— আজ সেই প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মোহ গবেষণা এখনো খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানও সাহিত্য, গবেষণায় অনালোচিত রয়ে গেছে।
তবে মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছিল। এর কারণ হিসেবে মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান অনেকটা হুট করেই হয়েছে এবং এ নিয়ে জনমনে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই নিয়ে নির্মোহ সাহিত্য রচনার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘১/১১-এর মতো অন্তর্বর্তী সরকার ও জুলাইয়ের ঘটনাবলি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণা হবে বলে আশা করি।’ এই লেখকের ‘হাসিনা’ নামে একটি বই গত বছর প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ‘অভ্যুত্থান’ নামে একটি অধ্যায়ে তিনি জুলাইয়ের দিনলিপি তুলে ধরেছেন।
জুলাই নিয়ে এ পর্যন্ত কতটি বই প্রকাশ হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় ১২৫টি বই প্রকাশ হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় সেই সংখ্যা কয়েকগুণ কমে যায়। এ ব্যাপারে প্রকাশকদের ভাষ্য, মানসম্পন্ন পাণ্ডুলিপির সংকটই এর প্রধান কারণ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি থেকেও জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণাধর্মী বই আসেনি। তবে একাডেমি থেকে গত দুই বছরে চারটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— সহুল আহমদ সম্পাদিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রবন্ধ’, হুমায়ূন শফিকের সম্পাদনায় ‘গণ-অভ্যুত্থানের গল্প’ এবং আবিদ আজমের সম্পাদনায় ‘গণ-অভ্যুত্থানের ছড়া’। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পরিকল্পনায় ছিল একটি কবিতা সংকলনও প্রকাশ করার। তবে সেটি এখনো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিভৃতে গড়ে ওঠা ছোট ছোট পাঠচক্রই আদতে ছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আঁতুড়ঘর। অভ্যুত্থানের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলামের লেখাতেও এই সত্যটি স্পষ্ট হয়েছে। ‘পাঠচক্র থেকে গণ-অভ্যুত্থানে’ শীর্ষক এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, “আমরা আড্ডা দিয়েছি, মাহফুজ ভাইয়ের (মাহফুজ আলম) সম্পাদনায় ‘কাঁটাতার’ নামে পত্রিকা বের করেছি। ওই সময় আমার ভেতরে একটি পরিবর্তন আসে। বুঝতে পারি, নতুনভাবে শুরু করতে হবে। আমরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিই। মাহফুজ ভাই, আসাদ ভাই (ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান) মিলে ‘পূর্বপক্ষ’ ও ‘রণপা’ নামে পত্রিকা বের করেন। পাশাপাশি চলে ‘গুরুবার আড্ডা’, ‘রসিক আড্ডা’ নামের পাঠচক্র এবং ‘ছয়চক্র’ নামের একটি অ্যাকাডেমিক আড্ডা। আরও ছিল ‘রাষ্ট্রকল্প লাইব্রেরি’। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এগুলো আদতে ছিল লড়াই।”
যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের ভিত কেঁপে উঠেছিল, সেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জুলাই কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে বেশ কিছু নাটকের মঞ্চায়ন হলেও নাটকগুলোর মুদ্রিত রূপ প্রকাশ পায়নি। শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা বিভাগ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা গ্রন্থ আসেনি। নাট্যকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহমান মৈশান আগামীর সময়কে বললেন, ‘অভ্যুত্থানের পর সৈয়দ জামিল আহমেদ মহাপরিচালকের দায়িত্ব যখন নিয়েছিলেন, তখন শিল্পকলা একাডেমি থেকে জাতীয় পর্যায়ে মুনীর চৌধুরী নাট্যোৎসব হয়েছিল। সেই উৎসবে অনেকগুলো নাটক মঞ্চে এসেছিল, যেগুলো জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ করে। কিন্তু সেগুলো সম্ভবত মুদ্রিত আকারে প্রকাশ হয়নি। শিল্পকলা একাডেমির উচিত, সেই নাটকগুলোর মুদ্রিত রূপ প্রকাশ করা।’
জুলাই-পরবর্তী সময়ে শাহমান মৈশানের রচনা ও নির্দেশনায় ‘লাল মজলুম’ নামে একটি থিয়েট্রিক্যাল পরিবেশনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেশ প্রশংসিত হয়। মৈশান জানালেন, এই পরিবেশনাটিরও কোনো মুদ্রিত রূপ নেই। তার ভাষায়, ‘থিয়েটার তো মঞ্চেই জন্মায়, মঞ্চেই তার পরিণতি।’
তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান, রাজপথের সংগ্রাম, দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে কিছু বই সমসাময়িক সাহিত্য ও গবেষণার পাতায় মলাটবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আসিফ নজরুলের ‘শেখ হাসিনার পতনকাল’, আলী রীয়াজের ‘আমিই রাষ্ট্র: বাংলাদেশ ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র’, নুরুল কবীরের ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও পূর্বাপর রাজনীতি সম্পর্কে আলাপচারিতা’, সালাহ উদ্দিন শুভ্রের ‘আজাদী’ ও ‘গণভবনের ভূত’, ইমরান মাহফুজের ‘নির্মম জুলাই ও গণঅভ্যুত্থানে আহত লেখক’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘জুলাই কালইডোস্কোপ’, মনজুর হোসেনের ‘জুলাইয়ের দেয়ালচিত্র দেশ সংস্কারের স্লোগান’ ও ‘জুলাই গ্রাফিতিতে বাংলাদেশ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)’, মো. কাওসার হাসানের ‘গ্রাফিতির ভাষায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ৩৬শে জুলাই’, ফাহমিদুল হকের ‘জুলাই জাগরণের দিনলিপি’, মুনতাসির বিল্লাহর ‘জুলাই বিপ্লবের দিনলিপি’, মেহেদী হাসানের ‘জুলাইয়ের দিনলিপি’ এবং আহম্মদ ফয়েজের ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের র্যাপসংগীত নিয়ে মিজানুর রহমান নাসিমের ‘র্যাপচার’।




