খাবারে সামান্য অসাবধানতায় বাড়ছে ২০০টিরও বেশি রোগের ঝুঁকি

সংগৃহীত ছবি
মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং শরীরকে ফিট রাখতে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের কোনো বিকল্প নেই। তবে আমাদের থালায় থাকা এই খাবারই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী কিংবা রাসায়নিকের খপ্পরে পড়ে এক নীরব ঘাতক হয়ে উঠতে পারে। অনিরাপদ খাবার ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের মতো ২০০টিরও বেশি ভয়ানক রোগ মানুষের শরীরে অনায়াসে বাঁধিয়ে দেয়। এই দূষিত খাবার রোগ ও অপুষ্টির এক মরণচক্র তৈরি করে, যার বলি মূলত হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা। খাদ্যের এই বৈশ্বিক সুরক্ষাবলয় আরও মজবুত করতে সরকার, উৎপাদক এবং সাধারণ ভোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ইদানীং বড্ড বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো রোগগুলো সাধারণত অত্যন্ত সংক্রামক হয় এবং দূষিত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে এই বিষ মানবদেহে প্রবেশ করে। ক্যামপাইলোব্যাকটার, ইটিইসি, শিগেলো এবং এসটিইসি-র মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াই প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষকে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, বমি এবং পেটব্যথায় নীল করে তুলছে। কাঁচা বা আধাসেদ্ধ মুরগির মাংস ও অপাস্তুরিত দুধ থেকে ক্যামপাইলোব্যাকটার সাধারণত মানুষের শরীরে ছড়ায়। কাঁচা ফলমূল ও সালাদ থেকে ইটিইসি এবং শিগেলো রোগ ছড়ানোর মস্ত বড় ঝুঁকি থাকে। ঠিক তেমনি, কাঁচা শাকসবজি, কাঁচা মাংস ও অপাস্তুরিত জুস খাওয়ার মাধ্যমে এসটিইসি ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে।
লিস্টেরিয়া নামের এক ভয়ানক ইনফেকশন গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত কিংবা নবজাতকের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়ে দেয়। এই রোগটি ফ্রিজের ঠান্ডা তাপমাত্রাতেও দিব্যি বেঁচে থাকে এবং অপাস্তুরিত দুগ্ধজাত খাবার থেকে এটি ছড়ায়। অন্যদিকে, দূষিত পানি বা বাসি খাবার থেকে ভিব্রিও কলেরি ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা তৈরি করে মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। কাঁচা সবজি এবং আধাসেদ্ধ সামুদ্রিক মাছ থেকে এই কলেরার জীবাণু মূলত ছড়ায়। অ্যান্টিবায়োটিকের মতো জরুরি ওষুধ পশু ও মানুষের শরীরে অতিরিক্ত এবং ভুল ব্যবহারের ফলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো এখন চরম প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এক মস্ত বড় অকার্যকর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নোরোভাইরাস নামের এক চেনা ভাইরাস খাবারে মিশে তীব্র বমি আর পেটব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হেপাটাইটিস এ ভাইরাস কাঁচা বা আধাসেদ্ধ সামুদ্রিক মাছ এবং ফ্রোজেন বেরি জাতীয় ফল থেকে মানুষের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে আধাসেদ্ধ মাংস থেকে হেপাটাইটিস ই ভাইরাস মানুষের লিভারের বারোটা বাজিয়ে দেয়।
পরজীবী বা প্যারাসাইটের আক্রমণও মানুষের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মস্ত বড় নীরব আতঙ্ক। এই পরজীবীগুলোর সবচেয়ে খতরনাক দিক হলো—এরা শরীরে ঢোকার পর কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করে বছরের পর বছর, এমনকি যুগ ধরে চুপচাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। ‘টেনিয়া সোলিয়াম’ নামের পরজীবী মানুষের শরীরে মৃগী রোগের মতো ভয়ানক ব্যাধি সৃষ্টি করে। মাছের মাধ্যমে ছড়ানো কিছু পরজীবী মানুষের পিত্তথলির ক্যান্সারের জন্য সরাসরি দায়ী থাকে। গর্ভাবস্থায় ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডি’ নামের পরজীবীর সংক্রমণ ঘটলে তা গর্ভের সন্তানের অপূরণীয় ক্ষতি করে। এছাড়া, দূষিত খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো ‘ট্রিপ্যানোসোমা ক্রুজি’ পরজীবী চ্যাগাস রোগের জন্ম দেয়, যা সাধারণ পোকার কামড়ের চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক হয়।
খাবারের ভেতর ‘প্রিওন’ নামের এক অদ্ভুত প্রোটিন কণা গরুর দেহে ‘ম্যাড কাউ’ রোগ তৈরি করে। এই সংক্রমিত গরুর মগজ, মাংস মানুষ খেলে তার মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষয় রোগ ভিসিজেডি দেখা দেয়।
আমাদের চারপাশের পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া বিষাক্ত কেমিক্যাল মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী অসংক্রামক রোগ ও ক্যান্সার ডেকে আনে। মাটি ও পানির দূষণ কিংবা ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে খাবার রান্নার কারণে আর্সেনিক, সীসা, পারদ এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাবারের সাথে মিশে যায়। ২০২১ সালের এক পরিসংখ্যান দেখায় যে, খাবারে স্রেফ আর্সেনিক ও সীসার বিষক্রিয়ার কারণে দুনিয়াজুড়ে ১০ লাখ মানুষ হৃদরোগে এবং ১ লক্ষ ২৪ হাজার মানুষ ক্যান্সারে মারা গেছেন।
অজৈব আর্সেনিক মানুষের ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যান্সারের জন্য প্রধানত দায়ী। খাবারের সুন্দর রঙ ধরে রাখতে মসলায় ‘লেড ক্রোমেট’ বা সীসার ভেজাল মেশানো এবং রিসাইকেল করা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করার কারণে খাবারে সীসার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা শিশুদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী করে তুলছে। সামুদ্রিক শিকারী মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মানবদেহে ‘মিথাইল-পারদ’ প্রবেশ করে গর্ভের শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। ক্যাডমিয়াম নামের ধাতু মানুষের কিডনি রোগ ও হাড়ের ক্ষয় রোগের জন্য দায়ী, যা আগ্নেয়গিরির মাটি থেকে কোকো বিনের মতো ফসলে সহজে প্রবেশ করে।
এছাড়া, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, ওষুধের অবশিষ্টাংশ এবং রান্নার অতিরিক্ত তাপে তৈরি হওয়া কেমিক্যালও খাবারের পুষ্টিগুণ ধ্বংস করে দেয়। ভুট্টা, বাদাম ও ভোজ্যতেলে ‘অ্যাফলাটক্সিন’ নামের এক ছত্রাকজনিত বিষ পাওয়া যায়, যা হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত রোগীদের লিভার ক্যান্সার অনায়াসে বাঁধিয়ে দেয় এবং শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি পুরোপুরি রুখে দেয়। কলকারখানার বর্জ্য থেকে নির্গত ডাইঅক্সিন নামের বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রাণীদের চর্বির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বন্ধ্যাত্ব, হরমোনের সমস্যা ও ক্যান্সারের জন্ম দেয়।
খাবারের এই বিষক্রিয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা সঠিকভাবে মাপা বড্ড কঠিন কাজ। কারণ, অনেক সাধারণ রোগী লোকলজ্জা বা অসচেতনতার কারণে হাসপাতালে রিপোর্টই করেন না। তবে ২০২৬ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়েছেন এবং ১৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এই ক্ষতির সিংহভাগই সইতে হচ্ছে দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশের অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশুদের।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক অর্থনৈতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, অনিরাপদ খাবারের কারণে দরিদ্র দেশগুলোর কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে প্রতি বছর ৯ হাজার ৫২০ কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে এবং এর চিকিৎসায় খরচ হচ্ছে আরও ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে অনিরাপদ খাবারের কারণে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার!
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈরী আবহাওয়া এবং তাপমাত্রা দিন দিন চড়চড় করে বাড়ায় খাবারের মান ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। এক জায়গার দূষিত খাবার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আজ মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা তৈরি করছে। তাই এই মহামারী রুখতে ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে থালায় খাবার পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শতভাগ সততা ও সতর্কতা বজায় রাখা বড্ড প্রয়োজন।
সরকারকে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নমনীয় ও কঠোর খাদ্য সুরক্ষা আইন তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষ ও হোটেল ব্যবসায়ীদের রান্নাঘরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া ‘নিরাপদ খাদ্যের ৫টি চাবিকাঠি’ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। কৃষক ভাইদেরও ফসল ফলানোর সময় সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা বড্ড জরুরি। মনে রাখবেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল কোনো একক সংস্থার কাজ নয়, বরং এর সাথে যুক্ত রয়েছে আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব ও ‘ওয়ান হেলথ’ দৃষ্টিভঙ্গি।







