অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে গ্লুকোমা

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
গ্লুকোমা বড় কোনো লক্ষণ ছাড়াই চোখের মূল স্নায়ুর ক্ষতি করে অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে। এই রোগের ঝুঁকি, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিয়ে লিখেছেন ডা. রোখসান্দা রেহনুমা
শরীরের যেমন একটি স্বাভাবিক রক্তচাপের মাত্রা থাকে, চোখের ভেতরেরও নিজস্ব একটি স্বাভাবিক চাপ বা প্রেশার থাকে। চোখকে কর্মক্ষম ও চোখের আকৃতি স্বাভাবিক রাখার জন্যই এই প্রেশার জরুরি। সাধারণত এই মাত্রা ১০ থেকে ২২ মিলিমিটার (মার্কারি) পর্যন্ত স্বাভাবিক ধরা হয়। কিন্তু এই চাপের মাত্রা যখন বেড়ে যায়, তখন তা চোখের ভেতরে থাকা অপটিক নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় এই চাপ চলতে থাকলে চোখের সেই গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থাকেই গ্লুকোমা বলা হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে স্বাভাবিক চাপ সীমার মধ্যে থাকলেও অপটিক নার্ভের ক্ষতি হতে পারে। তাকে নরমাল টেনশন গ্লুকোমা বলা হয়।
গ্লুকোমার ধরন
চোখের প্রেশার স্বাভাবিক রাখার জন্য চোখের ভেতরের পানি চলাচলের পথের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে গ্লুকোমা দুই ধরনের হতে পারে।
ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা: এ ক্ষেত্রে চোখের ভেতরের পানি চলাচলের পথ খোলা থাকলেও বিভিন্ন কারণে পানির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে ধীরে ধীরে চোখের চাপ বাড়ে।
ক্লোজড অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা : এতে চোখের পানি বের হওয়ার পথ অনেক সরু হয়ে যায় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চোখের চাপ হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং এটি একটি জরুরি অবস্থা।
লক্ষণগুলো কেন ধরা পড়ে না?
গ্লুকোমার সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো এর প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী তেমন কোনো অসুবিধা টের পান না।
ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমাতে রোগী বুঝতেই পারে না যে তার চোখে কোনো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে সামান্য মাথাব্যথা বা চোখে হালকা ব্যথা হতে পারে। সাধারণত আমরা সামনে তাকালেও আশপাশের মানুষ বা জিনিস দেখতে পাই। কিন্তু গ্লুকোমা আক্রান্ত মানুষের চারপাশের দৃষ্টির পরিসীমা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। একদম শেষের দিকে শুধু সামনের অংশটুকু ছাড়া রোগী আর কিছুই দেখতে পায় না এবং চিকিৎসা না নিলে একসময় সেই অবশিষ্ট দৃষ্টিটুকুও চিরতরে হারিয়ে যায়।
অন্যদিকে, ক্লোজড অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমাতে ওপরের সমস্যাগুলোর সঙ্গে অনেক সময় রোগী চোখে তীব্র ব্যথা ও চোখ লাল নিয়ে আসেন। এটি একটি জরুরি অবস্থা। এ ক্ষেত্রে সুবিধা হলো রোগী দ্রুত ব্যথা নিয়ে ডাক্তারের কাছে চলে আসেন।
কিন্তু ওপেন অ্যাঙ্গেল বা নরমাল টেনশন গ্লুকোমার ক্ষেত্রে সমস্যা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়।
গ্লুকোমায় চোখের স্নায়ু যেটুকু নষ্ট হয়ে যায়, তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই যত দ্রুত রোগ ধরা পড়বে, তত ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু মানুষের গ্লুকোমা হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি। যেমন—
• পরিবারে বাবা, মা, ভাই, বোন বা অন্য কোনো আত্মীয়ের গ্লুকোমার ইতিহাস থাকলে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
• যাদের চোখে অনেক বেশি মাইনাস পাওয়ার বা অনেক বেশি প্লাস পাওয়ারের চশমা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও গ্লুকোমার আশঙ্কা থাকে।
• এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ থাকলে গ্লুকোমার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
• যাদের লিপিড প্রোফাইল বা কোলেস্টেরল বেশি।
• দীর্ঘ সময় অন্ধকারে টেলিভিশন দেখা বা মোবাইল ও কম্পিউটারের স্ক্রিন ব্যবহার করলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।
• কিছু জন্মগত বা কনজেনিটাল সমস্যার কারণেও এ রোগ হতে পারে।
কীভাবে রোগটি শনাক্ত করা হয়
গ্লুকোমা নির্ণয়ের জন্য শুধু চোখের চাপ মাপাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক প্রথমে রোগীর পারিবারিক ইতিহাস, চশমার পাওয়ার এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে জানতে চান। এরপর চোখের চাপ পরীক্ষা করা হয়। চোখের পানি চলাচলের পথ কেমন আছে এবং অপটিক নার্ভের অবস্থা কেমন, তাও পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনে ভিজ্যুয়াল ফিল্ড টেস্ট করে রোগীর দৃষ্টির পরিসীমা কতটা কমেছে, তা দেখা হয়।
গ্লকোমার চিকিৎসা কী?
গ্লুকোমার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো চোখের অপটিক নার্ভের যে অংশটুকু এখনো সুস্থ আছে, সেগুলো রক্ষা করা।
একবার স্নায়ুর যেটুকু নষ্ট হয়ে যায়, তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই যত দ্রুত রোগ ধরা পড়বে, তত ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
চিকিৎসার প্রথম ধাপ ওষুধ বা আই ড্রপ। এই ড্রপ চোখের চাপ কমিয়ে দৃষ্টিস্নায়ুকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। অনেক সময় একটি ড্রপ যথেষ্ট হয়। কারও ক্ষেত্রে দুই বা তিন ধরনের ড্রপ কিংবা একাধিক ওষুধের সমন্বয় ব্যবহার করতে হয়। রোগী ভালো থাকলে দীর্ঘদিন, এমনকি সারা জীবনও এই ড্রপ ব্যবহার করতে হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই ড্রপ বন্ধ করা উচিত নয়।
কখন লেজার বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়?
• ড্রপ দিয়ে চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে লেজার চিকিৎসার কথা ভাবা হয়।
• লেজারের মাধ্যমে চোখের পানি বের হওয়ার বিকল্প পথ তৈরি করে চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়।
• যদি লেজারেও কাঙ্ক্ষিত ফল না আসে, তাহলে ট্রাবেকুলেকটমি নামে পরিচিত গ্লুকোমার অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।
• কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চোখের ছানি অনেক বেশি পেকে গেলে পানি চলাচলের পথ সরু হয়ে যায়। তখন শুধু ছানি অপারেশন করলেও চোখের চাপ স্বাভাবিক হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে একই সঙ্গে ছানি অপারেশন এবং ট্রাবেকুলেকটমি করতে হতে পারে।
• অনেক সময় পানি চলাচলের পথ সচল করার জন্য বিশেষ ধরনের কিছু যন্ত্র অপারেশনের মাধ্যমে বসানো হয়।
• রোগ একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে গেলে, দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর সুযোগ না থাকলেও চোখের অতিরিক্ত চাপের কারণে তীব্র ব্যথা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যথা কমানোর জন্য ক্রায়োথেরাপি ব্যবহার করা হয়। এটি শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা।
লেখক: কনসালট্যান্ট, চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও সার্জন, বাংলাদেশ আই হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ঢাকা




